Saturday, January 28, 2017

মেয়ে হারিয়ে এখন পাগল প্রায়

যশোরের চৌগাছায় পিকনিক বাস দুর্ঘটনায় শিক্ষকসহ ৫ জন নিহতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মহিউদ্দীন খানকে আহ্বায়ক এবং সদস্য করা হয়েছে কেএম মামুনুজ্জামান ও চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নার্গিস পারভীনকে। বৃহস্পতিবার রাতে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মহিউদ্দীন খানের নেতৃত্বে চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও যশোর জেনারেল হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেওয়া হয়।
এ সময় তারা আহতদের খোঁজখবর নেন এবং উন্নত চিকিৎসা প্রদান করতে চিকিৎসকদের নির্দেশ দেন। এ ঘটনার ২ দিন পার হলেও নিহতের পরিবার ও এলাকাজুড়ে চলছে শোকের মাতন। রামকৃষ্ণপুর গ্রামে এখন ঘরে ঘরে কান্নার রোল। বেদনায় নীল হয়ে গেছেন গ্রাম্য মানুষেরা। আহতদের বেদনা সংক্রমিত হয়ে যেন প্রবাহিত হচ্ছে গোটা গ্রমের মানুষের শরীরে। বিশেষ করে নিহত বৃষ্টির মা শিল্পির ও সুমাইয়ার মা নাজমার মেয়ে হারনো বেদনায় পাগল প্রায়। তাদের কান্না মোটেই থামছে না।স্কুল শিক্ষার্থী নিহত বৃষ্টির মা শিল্পি খাতুন কাদছেন আর শুধুই বলছেন বৃষ্টি কই। বৃষ্টি কথন মা বলবে।বৃষ্টি কেন তুমি আসছো না। দুপুরের ভাত রাতের ভাত সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে। গত বুধবার রাত থেকে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন শিল্পি খাতুন। আর অবাক চিত্তে তাকিয়ে থাকছেন। বৃষ্টিরা ২ ভাই বোন। বড় ভাই যশোর মুসলিম এইড স্কুলে ডিপোলামা করছে। সংসারে অভাব অনাটনের কারনে ৮/১০ বছর আগে বিদেশ পাড়ি দেয় বৃষ্টির পিতা নাছির মল্লিখ। বৃষ্টি একমাত্র মেয়ে হওয়ায় পরিবারের সবার আদুরে ছিল।তাদের পরিবারের ইচ্ছা ছিল মেয়েকে উচ্চ শিক্ষা করিয়ে বিয়ে দেবেন। রা দুই বোন। ছোট বোন সামিরার বয়স মাত্র চার বছর। অপর শিক্ষাথী সুমাইয়ারা ২ বোন। সে ছিল পরিবারের সবার বড়। পিতা একজন কৃষক। অনেক কষ্ট করেই মেয়ে পড়াতেন কান্না জড়িত কন্ঠে বললেন সুমাইয়ার মা নাজমা আক্তার। তিনি মেয়ে হারানোর বেদনায় পাগল প্রায়। মাঝে মাঝে ভ’ল বকছেন। পিকনিকে যাবার আগে সুমাইয়া মা বলে চলে গেল আর তো কেউ মা বলছে না। সুমাইয়াকে নিয়ে মা নাজমা বেগমের ছিল আকাশছোঁয়া স্বপ্ন। স্কুলটি গ্রামে হলেও শখ করে তাকে একটি সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন বাবা মুদি দোকানি গিয়াস উদ্দিন। বাড়ির পাশের বাঁশবাগানের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা দিয়ে মেয়ে সাইকেল চালিয়ে যখন স্কুলে যেত মা এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকতেন।
শোকে পাথর হয়ে যাওয়া নাজমা বেগম এখনো অপলক তাকিয়ে আছেন বাঁশবাগানের সেই রাস্তায়। বিড় বিড় করে বয়ান করছেন মেয়ের সেই স্মৃতি। বুধবার রাত সাড়ে ১০টায় রামকৃষœপুর স্কুলের পিকনিকের (ময়মনসিংহ-ব-০০৫-০১০) বাস উল্টে ষিক্ষকসহ ৫ জন মারা যায়। নিহতরা হলেন ওই স্কুলর ৮ম শ্রেনীর ছাত্রী রামকৃষœপুর গ্রামের নাছির মল্লিকের মেয়ে বৃষ্টি, একই গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে ৮ম শ্রেনীর ছাত্রী সুমাইয়া(১৪) স্কুলর সহকারী শিক্ষক জহুরুল ইসলাম (৩৫)। তার বাড়ি মহেমপুর উপজেলার বেতবাড়িয়া গামে।এছাড়া চৌগাছা পৌর সভার মাঠ পাড়ায় সিরাজুল ইসলমের ছেলে বাসটির চালক মিলন (২৮),স্বরুপদাহ ইউনিয়নের দান বাক্্েরর সহিদুল ইসলামের ছেলে মিলন(২৪)। তিনি পেশায় পিকআপ চালক মারা গেছে। গুরুতর আহতরা স্কুল শির্র্ক্ষার্থী সাগর (১৪), আকলিমা খাতুন (১৫), অফিস সহকারী সত্য কুমার (৩৫), যোথি খাতুন (১৩), উর্মি খাতুন (১৪), অলিয়ার রহমান (১৫), সাথি খাতুন (১৪), শিক্ষক কামাল হোসেন (৪০), আজম আশরাফুল (৪২), মিলন (১৪), রোজিনা খাতুন (১৩), কল্পনা খাতুন (১৫), অনন্যা খাতুন (১৩), শিক্ষক কবির হোসেন (৩৭)। হকারী শিক্ষক সত্য বাবু,শিক্ষার্থী ইপা,জ্যোতি, ইতি, মিলন, রিক্তা,রুপালি, খাদিজা, অনন্যা,
সালমা ও সোনিয়া,মঘনা,অভিসহ ২১ জন বুধবার রাতে চৌগাছা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ রাতেই সেখান থেকে যশোর সদরে ৭ জনকে এবং ঢাকায় ৩ জনকে স্থানন্তর করা হয়। সবার অবস্থার উন্নতি হলেও ঢাকায় চিকিৎসাধীন নিহত সহকারী শিক্ষক জরুরুলের ছেলে (৫ম শ্রেনী) অভি ও শিক্ষার্থী ইপা এবং অফিস সহকারী সত্য কুমার বাবু এখনও খুবই আশঙ্কামুক্ত হয়নি। অভির ১টি পা কেঁটে ফেলা হয়েছে স্থাণীয়রা জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় নিহতদের রামকৃষœপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ জানাযায় অংশ নেন যশোর ২ আসনের সংসদ সদস্য এ্যাড.মনিরুল ইসলা মনির,বিভাগীয় অতিরিক্ত কমিশনার মোঃ ফারুক হোসেন,যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল আলিম,সচিব মোল্লা আমীর হোসেনের ,মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তশে রর উপ-পরিচালক টি এম জাকির হোসেন, সহকারী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম,জেলা শিক্ষা অফিসার আমিনূল ইসলাম টুকু,শিক্ষা বোর্ডের ইজ্ঞিনিয়ার কামাল হোসেন,চৌগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম হাবিবুর রহমান, পৌরসভার মেয়র নূরউদ্দিন আল মামুন হিমেল,জেলা পরিষদেও সদস্য দেওয়ান তৌহিদুর রহমান ও হবিবর রহমান হবি,অধ্যক্ষ ড.এম মোস্তানিছুর রহমানসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা,জনপ্রতিনিধি,হতাহতদের স্বজনসহ শত শত সাধারণ মানুষ। জানাযা পূর্ব নিহতদের স্বরনে শোক সভা হয়। এ সময় চৌগাছা শিক্ষক-কর্মচারী সমিতির নের্তৃবৃন্দ নিহত সহকারী শিক্ষক জহুরুল ইসলাম সমিতির নেয়া ৩ লাখ টাকা ঋন মওকুম ঘোষনা করে। একই সাথে সমিতির সঞ্চয় ফান্ড থেকে ৩১ হাজার টাকা,
সমিতির সভাপতি মিলন ব্যক্তিগত ভাবে ৫ হাজার টাকা এবং যশোর শিক্ষা বোর্ড স্কুল এন্ড কলেজ তহবিল থেকে ১৭ হাজার টাকা নিহতের পরিবারকে দেবার প্রতিশ্রুত দেয়।গাছায় পিকনিকের বাস উল্টে পাঁচজন নিহতের ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মহিউদ্দীন খানকে আহ্বায়ক এবং সদস্য করা হয়েছে কেএম মামুনুজ্জামান ও চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নার্গিস পারভীনকে। বৃহস্পতিবার রাতে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মহিউদ্দীন খানের নেতৃত্বে চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও যশোর জেনারেল হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেওয়া হয়। এ সময় তারা আহতদের খোঁজখবর নেন এবং উন্নত চিকিৎসা প্রদান করতে চিকিৎসকদের নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য যে ২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পিকনিক বাড়ি ফিরছিল। পিকনিকের এ বাসটি চৌগাছা-মহেশপুর সড়কের ঝাউতলা নামকস্থানে পৌছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৯ শিক্ষার্থী মারা যায়। এর তিন বছর পর চৌগাছায় আবারও পিকনিকের বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়লো।

No comments:

Post a Comment