Sunday, January 22, 2017

ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে নজিরবিহীন সহিংসতা

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের দিন যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও সহিংসতা হয়েছে। গাড়ি ভাংচুর, দোকানপাটে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ওয়াশিংটনের রাজপথ। বিক্ষোভকারীদের হামলায় অন্তত ডজনখানেক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পবিরোধী প্রতিবাদকারীদের ওপর পিপার স্প্রে ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছেন পুলিশ সদস্যরা। সহিংসতার অভিযোগে দুই শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। খবর এএফপি ও রয়টার্সের।
ওয়াশিংটন মেট্রোপলিটন পুলিশের অস্থায়ী প্রধান পিটার নিউশাম টুইটারে এক ভিডিও বার্তায় জানান, বেশিরভাগ বিক্ষোভকারীই রাস্তায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানান। তবে একটি গ্রুপ হঠাৎ সহিংস হয়ে উঠে। তাদের অধিকাংশই আপাদমস্তক কালো পোশাক পরা ছিল। এ গ্রুপ হঠাৎ দাঙ্গা পোশাকের পুলিশের দিকে বোতল ও ঢিল ছোড়ে। এ সময় তাদের দমনে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে। একই সময়ে বিক্ষোভকারীদের মাথার ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার চক্কর দিতে থাকে। এরই একপর্যায়ে প্রতিবাদকারীরা একটি পুলিশ ভ্যানের জানালা দিয়ে কিছু একটা ছুড়ে মারে। পুলিশের গাড়িটি দ্রুতবেগে ঘুরে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে চলে গেলে দাঙ্গাকারীরা উল্লাস প্রকাশ করে। এর আগে তারা ফুটপাতের পাথর তুলে এবং বেসবল ব্যাট দিয়ে মার্কিন পুঁজিবাদের প্রতীক ব্যাংক অব আমেরিকার একটি শাখার ও ম্যাকডোনাল্ডসের একটি বিক্রয় কেন্দ্রের জানালা ভাংচুর করে। এ সময় একটি কালো লিমুজিনসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। ডাস্টবিনের ঝুড়ি রাস্তার মাঝখানে এনে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান লেখা একটি লাল ক্যাপ আগুনে নিক্ষেপ করে। পুলিশ জানিয়েছে, সহিংসতা দমনে তারা পিপার স্প্রে ও অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করেছে। মেট্রোপলিটন পুলিশ বিভাগের তথ্যমতে, অন্তত ২১৭ জনকে সহিংস বিক্ষোভের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। এক সংবাদ সম্মেলনে নিউশাম জানান, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ওয়াশিংটনে ছয় পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিক্ষোভকারীদের ছোড়া ঢিলে তিনজন মাথায় আঘাত পেয়েছেন। তবে তাদের আঘাত গুরুতর নয়। গ্রেফতারকৃতদের আদালতে হাজির করা হবে বলে জানান নিউশাম। ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের দিন ওয়াশিংটনে সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন।
নিরাপত্তা বাহিনী অভিষেক অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন রাখতে নগরীর বিভিন্ন স্থানের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। শপথ গ্রহণ ও স্বাগত কুচকাওয়াজের পর হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পথে রাস্তার দু’দিকে দুই ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। একদিকে, ট্রাম্পবিরোধীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন, বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে তারা প্রতিবাদ জানান। অপরদিকে, ট্রাম্প সমর্থকরা তাকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। এ দু’পক্ষ বেশ কয়েকবার মুখোমুখি অবস্থানে এলেও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ছাড়া বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ওয়াশিংটনের ডেমোক্রেট দলীয় মেয়র ?মুরিয়েল বউজারসহ ডেমোক্রেট দলীয় নেতারা এসব সহিংসতার নিন্দা করেছেন। ট্রাম্পের অভিষেক উপলক্ষে ওয়াশিংটনের প্রায় ৭ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস, ওয়াশিংটন পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃংখলা বাহিনীর প্রায় ২৮ হাজার কর্মকর্তা নিয়োজিত ছিলেন। এদিকে রাজধানী ছাড়াও সানফ্রান্সিসকো, শিকাগো ও নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারের সামনেও নতুন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেন হাজারও মানুষ। সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছেন হলিউড তারকাসহ অনেকে। নিউইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাসিও, অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো ও অ্যালেক বল্ডউইন, অস্কারজয়ী তথ্যচিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর এবং সঙ্গীতশিল্পী শের উইলিয়ামসও বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন। নতুন প্রেসিডেন্টের শপথের সময় এমন বিক্ষোভের ঘটনা দেশটির ইতিহাসে বিরল।
বিশ্বজুড়ে উইমেন মার্চ : পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথের পরদিন শনিবার ওয়াশিংটন ও বিশ্বের বিভিন্ন শহরে নারীদের উদ্যোগে উইমেন মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। উইমেনস মার্চ গ্লোবাল নামের আন্তর্জাতিক একটি সংগঠনের উদ্যোগে বিশ্বের সাত মহাদেশের অন্তত ১৬১ শহরে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। নারীদের প্রতি সহিংস দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নয়, একেবারে সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে বিতর্কিত এ মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে। প্রচারণার সময় থেকে শুরু করে এমন বহু অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। নারীদের নেতৃত্বে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হলেও যে কোনো লিঙ্গের মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে মিছিলগুলোতে। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, শুধু ওয়াশিংটনেই পাঁচ লাখ মানুষের উপস্থিতি আশা করছে আয়োজকরা। ইংল্যান্ডে মার্কিন দূতাবাসের বাইরে ট্রাম্পবিরোধী মিছিল-সমাবেশ করেন কয়েক হাজার মানুষ। মেক্সিকো সিটিতে ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন অনেকেই। আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ারসে বের করা হয় ট্রাম্পবিরোধী র‌্যালি। বিক্ষোভ হয়েছে স্পেনের মাদ্রিদেও। ট্রাম্পবিরোধী ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে কয়েকশ’ মানুষ শহরটির রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। জার্মানিতেও ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ হয়। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে কয়েকশ’ নারী ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় তারা যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ট্রাম্পের যে কোনো অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেকের প্রতিবাদ এবং ফিলিপাইন থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেয়ার দাবিতে ম্যানিলায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন কয়েকশ’ মানুষ।

No comments:

Post a Comment