Sunday, January 22, 2017

মেকিং আমেরিকা গ্রেট এগেইন!

শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায়, (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃস্টাল টাইম দুপুর ১২টা) ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। দেড় বছর আগে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার আগ্রহ ঘোষণার পর থেকে তিনি যে দু-তিনটি বিষয়কে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দিয়েছেন, তার একটি ছিল ‘মেকিং আমেরিকা গ্রেট এগেইন।’ গতকাল শপথ গ্রহণের পর তিনি যে বক্তৃতাটি দিয়েছেন, সেটিও তিনি শেষ করেছেন এ চারটি শব্দ দিয়ে, তিনি আমেরিকাকে আবার ‘গ্রেট’ বানাবেন। এ প্রসঙ্গে আমার মনে যে প্রশ্নটি গত দেড় বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে তা হল, গত বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই তো আমেরিকা যখন যেখানে যা করতে চেয়েছে করে চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন বিশ্বের দ্বিতীয় পরাশক্তি হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উঠে এলো, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোথাও কোথাও সোভিয়েত ইউনিয়নের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা সংযত আচরণও করেছে। ১৯৬২-তে কিউবার মিসাইল ক্রাইসিসের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন পিছু হটেছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন কেনেডির হুমকির মুখে। কিন্তু তখন প্রেসিডেন্ট কেনেডিকেও বেশ কিছু ছাড় দিতে হয়েছিল। ১৯৭১-এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি পাকিস্তানের মাতাল সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের পক্ষ নিল, তখন গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পক্ষের এ দেশটির বিপরীতে আমাদের শর্তহীন সমর্থন দিতে এগিয়ে এলো গণতন্ত্রবর্জিত সোভিয়েত ইউনিয়ন! তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সদ্যপ্রাপ্ত এক ‘জানী দোস্ত’ চীনও বঞ্চিত, শোষিত, নিপীড়িত, নিগৃহীত আমাদের সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিপরীতে অবস্থান নিল! তখন তো নিক্সন-কিসিঞ্জাররা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করল। তখনও এ দুই দেশ- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন নিজেদের স্বার্থকেই প্রাধান্য এবং অগ্রাধিকার দিয়েছে। দিয়েছে তার আগে, দিয়ে চলেছে তার পরও, দিয়ে যাচ্ছে এখনও।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে তাকালে তা মধ্য গগনের সূর্যের মতোই জ্বলজ্বল করে। তাদের তেলস্বার্থ, আধিপত্যের স্বার্থ সবকিছুরই ওপর। এখানে প্যালেস্টাইনিরা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। বস্তুত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ শক্তির অবক্ষয় এবং পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ উত্থান! ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই চিৎকার করুন না কেন, ১৯৯১-তে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফা হুমকি-হামলা থেকে সামরিক শক্তির ভয় দেখিয়ে সংযত করার তো আর কেউ থাকল না। তারপর এক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সশস্ত্র বাহিনী খাতে বাজেটে যেমন বরাদ্দ রাখে, তার বিশালত্ব এত বড় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরের আট-দশটি দেশ যেমন রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন, ভারত ইত্যাদি তাদের সম্মিলিত সামরিক বাজেট ব্যয়ও তার সমান নয়। প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ারের পর সামরিক বাজেট কমানোর পক্ষে কোনো প্রেসিডেন্ট তো কিছু বলেননি। বরং বলেছেন, আরও শক্তিশালী করবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে শুধু সামরিক শক্তিতে অদ্বিতীয়, তাও তো নয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় এ দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রেটিংয়ে উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহারে, খেলাধুলায়- এসব ক্ষেত্রেও তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার শীর্ষস্থানীয় দেশ। গণতন্ত্রের চর্চায়, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরে- যা মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে ওয়াশিংটন শহরে ঘটতে দেখলাম- এবং এমনকি চলে আসছে গত ২৪০ বছর ধরে- তাও তো দুনিয়ার জন্য অনুসরণীয়। আরও একটু পরিষ্কার করে বলা যায়, এ উদাহরণের বিপরীতে পশ্চিম আফ্রিকার অতি ছোট্ট একটি দেশ- গাম্বিয়ার প্রায় ২৫ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে যিনি, সেই বারো সাহেব, রাজত্ব করে আসছেন, কয়েক সপ্তাহ আগের এক নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও তিনি ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নন।
ইলেকশনে যিনি বিজয়ী হয়েছেন সেই আদামা বারো বাধ্য হয়েছেন শপথ নিতে গাম্বিয়ার তিন পাশ ঘিরে রাখা দেশ সেনেগালের রাজধানী ডাক্কারে অবস্থিত গাম্বিয়া অ্যাম্বেসিতে। এ বিজয়ী প্রেসিডেন্টের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট ‘ইকওয়াস’-এর সরকারগুলো। পরাজিত প্রেসিডেন্টকে তার প্রাসাদ থেকে তাড়াতে এ জোটের কয়েকটি দেশ সৈন্যবাহিনীও পাঠিয়েছে গাম্বিয়ায়!!! আরও উদাহরণ, কাতারের বর্তমান আমীর তার বিদেশ সফররত বাবাকে দেশে ফিরতে না দিয়ে নিজেই ক্ষমতায় বসেন কয়েক বছর আগে। আরব দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ মিসরে কী ঘটছে? হয় সামরিক বাহিনী, না হয় মুসলিম ব্রাদারহুড! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা যতই নিন্দা করি, বাংলাদেশসহ দুনিয়ার অনেক দেশের মানুষজন একটু সুযোগ পেলেই এই দেশটির নাগরিক হতে চায়। এ দেশটি নাগরিকত্ব দেয়ার আগে যে ‘গ্রিন কার্ড’ দিয়ে থাকে তাকে আমাদের মতো দেশগুলোতে তাকে ‘গিফট অব গড’ হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তো এ দেশটিতে এক কোটি দশ লাখ অবৈধ বিদেশী থাকতে পারছে। এমন উদারতার বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের কারণেই তো আমাদের দেশ থেকে যাওয়া অবৈধ বাংলাদেশীদের কী হবে, তা নিয়ে দেশের এবং ওখানকার লাখ লাখ বাংলাদেশী বিনিদ্র রজনী যাপন করছে।
দুই আমার মনে হয়, ভালো-মন্দ মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও অদ্বিতীয়। তারপরও যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘গ্রেট’ বানাবেন বলে ঘোষণা দিতে থাকেন, তখন অনেকের মতো আমারও ভয় হয়। তিনি কি দুনিয়াটাকে ওলটপালট করে দেবেন?? তিনি কি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের দুনিয়াটাকে গ্রাহ্য করছেন না?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কতগুলো অঞ্চলে একটির পর একটি কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এ জন্য তিনি দুষছেন বিশেষ করে চীন এবং মেক্সিকোকে। তার দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাকরিগুলো চীন এবং মেক্সিকোতে চলে যাচ্ছে, একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; এসব কলকারখানায় যেসব পণ্য উৎপাদিত হতো তা এখন উৎপাদিত হচ্ছে চীন এবং মেক্সিকোর নতুন নতুন কারখানায়। আর যুক্তরাষ্ট্রকে এসব পণ্য এখন আমদানি করে আনতে হচ্ছে চীনসহ কতগুলো দেশ থেকে। কিন্তু এ সফল ব্যবসায়ী এই কথাটি বলছেন না যে- এসব দেশের পণ্য সস্তায় পাওয়া যায় বলেই তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা এসব পণ্য কিনে থাকে। এত বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লালিত ‘ক্যাপিটালিজম’-এর এটি তো একটি শক্ত ভিত্তি। ‘ক্যাপিটালিজম’-এ প্রতিযোগিতায় যেটি থাকবে, তারই তো সমৃদ্ধি ঘটবে; যেমন ঘটেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের, তার ব্যবসায়-বাণিজ্যে, কোথাও কোথাও তিনি ‘ফেল’ মেরেছেন, দেউলিয়া হয়েছেন। আবার সাহস শক্তি ও সম্পদ জোগাড় করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেনও; ব্যর্থতার পর সফলতাও পেয়েছেন। এখন দেশ-বিদেশে তার মালিকানায় আছে বিভিন্ন ধরন ও চরিত্রের প্রায় ১৩০টি কোম্পানি। একদিকে তার দেশের এতগুলো কোম্পানি বন্ধ হয়ে গিয়েছে,
অথচ তার বিপরীতে তার নিজের এতগুলো নতুন নতুন কোম্পানি গড়ে উঠছে! যে ‘গ্লোবালাইজেশন’ এবং ‘লিবারাইজেশনের’ কথা বলে গত ৩০ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ‘ক্যাপিটালিস্ট’ দেশগুলোর ‘ক্যাপিটালিস্ট’রা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এমন বাড়িয়ে ফেলেছে, তার প্রতিবাদ এবং প্রতিক্রিয়ায় দুনিয়ার এক নম্বর পুঁজিবাজার ওয়াল স্ট্রিটে চার বছর আগে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ, সভা সমিতি, মিছিল মিটিং করল। ডাভোসে সদ্য সমাপ্ত জাম্বুরির ঠিক আগে আগে অক্সফাম তার একটি প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, বিশ্বের অর্ধেক মানুষজনের যে সম্পদ- একই পরিমাণের সম্পদ আছে বিশ্বের মাত্র আটজন শীর্ষ ধনীর। তার মধ্যে ছয়জনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, একজন মেক্সিকোর এবং অন্যজন স্পেনের। এ দেশগুলোতে একটি ঘৃণ্য প্রবণতা দিন দিন জোরালো হচ্ছে- কোম্পানি ‘লস’ দিলেও কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা বছর বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বাড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এ প্রবণতার বিরুদ্ধে বা নিন্দায় কখনও একটি বাক্যও উচ্চারণ করেছেন, মনে করতে পারছি না। তিনি বরং ঘোষণা দিয়েছেন তিনি নোংরা বিত্তশালীদের ট্যাক্সের হার কমাবেন। তাহলে নাকি তারা বেশি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী এবং উৎসাহিত হবে।
তিন ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোকে একটি পুরনো অচল সামরিক জোট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি এ জোটটিতে আমেরিকার ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার অপচয়ের পক্ষে নেন। আমিও নই। সোভিয়েত ইউনিয়নকে মোকাবেলা করতে যখন ৬০-৭০ বছর আগে আমেরিকার নেতৃত্বেই পশ্চিম ইউরোপের কতগুলো দেশ নিয়ে এ সামরিক জোটটি সৃষ্টি করা হয়েছিল। তখন কমিউনিজমের প্রসারের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আমেরিকাই সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ও সক্রিয় ছিল। এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই, কমিউনিজমের প্রতি মানুষজনের আগ্রহ ও উৎসাহও কমে গিয়েছে।
সুতরাং ন্যাটোর এখন কাজটা কী?
কিন্তু ন্যাটোর ভূমিকা খাটো করে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি দুনিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথা কিছু বলতেন, নতুন কোনো ‘ভিশন’-এর উল্লেখ করতেন, দুনিয়ার কোটি কোটি অবহেলিত ক্ষুধার্ত চিকিৎসাসেবাবঞ্চিত মানুষজন কিছুটা ভরসা পেত। কিন্তু দুনিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ সামরিক ব্যক্তিটির এই কমান্ডার ইনচিফ এ বিষয়ে একটি হরফও উচ্চারণ করেননি। বরং উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে আমদানি কমিয়ে বা বন্ধ করে দিয়ে এ দেশগুলোকে নতুন বিপদের মুখে তিনি ফেলেছেন বলেই তো আশংকা হয়। এগারো মিলিয়ন অবৈধ অধিবাসীকে তাড়িয়ে দিয়ে কত মিলিয়ন মানুষকে তিনি ঝুঁকিতে ফেলে দিতে চাইছেন, সেই উপলব্ধিবোধ তার কোনো বক্তৃতার কোথায়ও দেখিনি। অথচ এ দেশটিই তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপকে মার্শাল ল্যাবের আওতায় পুনর্গঠনে প্রবল ভূমিকা রাখল। এ দেশেরই নেতানেত্রীরা সেই জর্জ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে টমাস জেফারসন, আব্রাহাম লিংকন, ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট, জন কেনেডি, জিমি কার্টার, বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা, থিওডোর রুজভেল্ট, মার্টিন লুথার কিং এবং এমন আরও অনেকেই মানবতার পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন, দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের কাছে অবিস্মরণীয় ব্যক্তি হিসেবে নন্দিত হয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান এবং বারাক ওবামার বিদায়- দু’জনই প্রেসিডেন্ট। প্রথমজনের শপথ গ্রহণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে ওয়াশিংটনসহ দুনিয়ার কতগুলো শহরে। প্রতিবাদে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের ৫০ জন সদস্য শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন। এমনটি আগের কোনো শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ঘটেনি,
এর বিপরীতে বারাক ওবামাকে বিদায় দিতে গিয়ে অনেকের চোখে ছিল পানি। গত সপ্তাহে শিকাগো শহরে বারাক ওবামা তার বিদায়ী ভাষণ দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। যার হাতে আণবিক যুদ্ধ ঘোষণার বোতাম থাকে, তার চোখে পানি, এমন আবেগপ্রবণ হওয়াটা একেবারেই মানানসই নয়। কিন্তু তবুও ওবামার চোখে পানি। চোখে তখন পানি আমারও। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম বক্তৃতাগুলোর একটিতে মার্টিন লুথার কিং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে ব্ল্যাক আমেরিকানদের অধিকার আদায়ের পুরো ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ শিরোনামের একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন ১৯৬৪-তে। সেদিন ফেসবুকে দু’জন ব্ল্যাক আমেরিকানের দুটি ছবি পাশাপাশি দেখলাম। প্রথমটি মার্টিন লুথার কিংয়ের, নিচে লেখা ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম। পাশে বারাক ওবামার ছবি; নিচে লেখা, ‘আই অ্যাম দি ড্রিম’। আমেরিকার ব্ল্যাক সম্প্রদায়ের একজন বারাক ওবামা দুনিয়ার অত্যাচারিত, নির্যাতিতদের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাই তার কান্না, আবার তার জন্য কান্না। আবার তা করি এই ব্ল্যাকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকান হোয়াইটদের ‘ব্যাকল্যাস’ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথে এমন সমর্থন ও সাফল্য।
চার ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানায় প্যালেস্টাইনিদের কী হবে? তিনি ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন দূতাবাসটি ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেবেন। তাহলে তো প্যালেস্টাইনিদের তিনি আর একটি আছাড় দিলেন। প্যালেস্টাইনিরা তো বটেই, আমরাও মনে করি জেরুজালেম মুসলমানদের জন্য অতি পবিত্র একটি শহর। এটি প্যালেস্টাইনিদের অধিকারেই থাকবে। দুনিয়ার কোনো দেশেরই দূতাবাস এখন জেরুজালেমে নেই বলে আমার ধারণা। জেরুজালেমে দূতাবাস নিয়ে গেলে তিনি কি দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষ এবং মুসলমানদের আর একটি ধাক্কা দিলেন না? তিনি উগ্রবাদী ইসলামী জঙ্গিদের দুনিয়া থেকে উৎখাত করবেন, বলেছেন তার উদ্বোধনী বক্তৃতায়। কিন্তু জেরুজালেমের দূতাবাস স্থানান্তরিত করাটা কি উগ্রবাদ নির্মূলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে?
তিনি উগ্রবাদ নির্মূল করবেন। কিন্তু কথা বলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে! কথা বলেননি দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো নেতার সঙ্গে, তাও কি সঙ্গতিপূর্ণ হল?
তিনি কথা বলেছেন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করতে চাইছেন চীনের বিরুদ্ধে। অথচ তার মতোই আর এক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ৭১-এ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের দোহাই দিয়ে আমাদের দেশে গণহত্যায় ইয়াহিয়া খানের দোসর হয়েছিলেন। দোসর হয়েছিল তখন এ চীনও। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এই নীতি সব আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যথাসাধ্য অনুসরণ করে গিয়েছেন। তিনিও তা করবেন, ঘোষণা দিয়েছেন। এখানে নতুনত্বটা কী? মনে হচ্ছে, তিনি দুনিয়ার বিরুদ্ধে কোনো না কোনো কারণে আগ্রাসন চালাবেন। এ জন্য কোনো মিত্র লাগবে না তার? নাকি, একমাত্র দেশ রাশিয়া তার পক্ষে থাকলে তার আর কাউকে লাগবে না, তাই কি তিনি ভাবছেন?
হতে পারে তিনি যে আমেরিকাকে ‘গ্রেট’ বানাবেন বলে বারবার ঘোষণা দিয়ে চলেছেন, তার কারণ এই যে, রাশিয়ানরাও এখন ‘হ্যাকিং’ করে আমেরিকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে, রাশিয়া এত দূর এগিয়ে গিয়েছে এবং রাশিয়ার তুলনায় আমেরিকা এত পিছিয়ে পড়েছে, সুতরাং আমেরিকাকে গ্রেট বানাতেই হবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই ৫০-৬০ বছর আগে একবার আমেরিকাকে পেছনে ফেলে এবং দারুণ লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল, মহাকাশ অভিযানে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন মহাশূন্যে প্রথম নভোযান পাঠিয়েছিল, প্রথম একটি প্রাণী পাঠিয়েছিল, প্রথম একজন মহিলাকে পাঠিয়েছিল, প্রথম একজন মানুষ- ইউরি গ্যাগরিনকে পাঠিয়েছিল। সেই লজ্জা এখন বোধহয় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। কিন্তু ‘মেকিং আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ রাশিয়াকে একমাত্র দৃশ্যমান মিত্র হিসেবে নিয়ে? বুঝতে বা মেলাতে পারছি না। মনে হচ্ছে, আমাদের আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।
‘শিউলীতলা’, উত্তরা, শনিবার, ২১ জানুয়ারি ২০১৭
মহিউদ্দিন আহমদ : সাবেক সচিব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; কলাম, লেখক
mohiuddinahmed1944@yahoo.com

No comments:

Post a Comment