২০
জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ
করেছেন। তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রথাগত জৌলুস ছিল। কিন্তু সেইসঙ্গে ছিল
ওয়াশিংটন এবং আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তার প্রেসিডেন্সির বিরুদ্ধে ব্যাপক
বিক্ষোভ। এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ব্যাপার।
তাছাড়া শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল,
তাতে অংশগ্রহণকারী
জনগণের মধ্যে আফ্রিকান আমেরিকানদের সামান্য উপস্থিতি বা প্রায় অনুপস্থিতি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার শপথবাক্য পাঠ করার পর যে ভাষণ দিয়েছেন তা
অনেকাংশেই উদ্ভট। তার মধ্যে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বলে তিনি
স্পষ্ট ভাষায় যা বলেছেন তা হল, তার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের প্রশাসনের
আমলে আমেরিকা ফার্স্ট ছিল না! অর্থাৎ আমেরিকা ছিল সেকেন্ড, থার্ড, ফোর্থ বা
আরও নিচে! এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, এতদিন আমেরিকার স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে
অন্য দেশের স্বার্থই বড় করে দেখা হয়েছে!! এর ফলে অন্য দেশের অনেক উন্নতি
হয়েছে। তাদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে!!! আমেরিকার ধনসম্পদ লুটপাট হয়ে বাইরে
গেছে এবং তার দেশ ক্রমশ সম্পদহীন হয়েছে!!!! অর্থাৎ আমেরিকা অন্য দেশে
লুটপাট করেনি, তাদের স্বার্থের কোনো ক্ষতি করেনি। ক্ষতি হয়েছে আমেরিকার।
তিনি সে ক্ষতি পূরণ করে এখন থেকে এমন নীতি ও আদর্শের দ্বারা পরিচালিত হবেন
যাতে আমেরিকা তার পূর্ব গৌরবে প্রতিষ্ঠিত হবে, আমেরিকা আবার ধন-সম্পদের
অধিকারী হয়ে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত হবে। এই বক্তব্যকে উদ্ভট ছাড়া
আর কী বলা যেতে পারে? কারণ আমেরিকায় যিনিই প্রেসিডেন্ট থাকুন, তার আমলে
আমেরিকা অন্য দেশের স্বার্থ রক্ষা করে আমেরিকার স্বার্থ ক্ষুণ করেছেন এমন
বক্তব্য উন্মাদতুল্যই বটে। আগের কথা বাদ দিলেও তার পূর্ববর্তী বুড়ো বুশ
থেকে বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামার শাসনকালে বিশ্বের
অন্যান্য দেশকে ধ্বংস করে আমেরিকা যেভাবে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করেছে তার
দৃষ্টান্ত কমই আছে। বুড়ো বুশের আমলে প্রথম ইরাকের ওপর হামলা করা হয়, বিল
ক্লিনটন সেই নীতির ওপর দাঁড়িয়েই সুদান ও আফগানিস্তানে বড় আকারে মিসাইল
হামলা করেন। এ ছাড়া অনেক অপকীর্তি তার আছে। জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে
মধ্যপ্রাচ্যে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় সেটা কারও অজানা নয়। তিনি আফগানিস্তান
আক্রমণ করে দেশটির সরকার উচ্ছেদ করে তা সরাসরি দখল করেন। তারপর ইরাকে
গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে- এ মিথ্যা অজুহাত খাড়া করে তিনি ইরাক আক্রমণ ও দখল
করেন। সাদ্দাম হোসেন ডিক্টেটর হলেও তার আমলে ইরাকে যে স্থিত শাসন ও সমাজ
ছিল,
তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে তিনি দেশটি ছারখার করেন, যার ফলে এখন পর্যন্ত
ইরাকের জনগণের জীবন বিপর্যস্তই আছে। বারাক ওবামা লিবিয়ার ওপর হামলা চালিয়ে
দেশটির অর্থনীতি ও সমাজজীবন ধ্বংস করেন। এর সবই তারা করেন মধ্যপ্রাচ্যের
দেশগুলোর স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের তেলের স্বার্থ উদ্ধার এবং
মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভুত্ব আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে। প্রেসিডেন্ট
ট্রাম্প তার ভাষণে দুনিয়ার মুসলমানদের ধর্মীয় সন্ত্রাস নির্মূল করার
প্রতিজ্ঞা করলেও ওবামার আমলে তারা ইসলামিক স্টেটের জন্মদান করেন। তার আগে
তারা জন্ম দেন ওসামা বিন লাদেনের। অর্থাৎ তাদের দ্বারাই মধ্যপ্রাচ্যে এবং
অন্যান্য দেশে ‘ইসলামিক সন্ত্রাস’ নামে কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু হয় ও
ব্যাপকতা লাভ করে। ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের
খুঁটি হিসেবে তারা আরও শক্তিশালী করেন। বারাক ওবামাও একটি নীতি অনুসরণ করে
সিরিয়ার সরকারবিরোধী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে
সেখানে গৃহযুদ্ধ বাধান, যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে। এর ফলে সিরিয়ায় এটি
স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা ও সমাজ বিপজ্জনকভাবে ধ্বংস হয়েছে। লাখ লাখ নিরীহ
মানুষ সিরিয়া ছেড়ে তুরস্ক, জর্ডান, পাকিস্তান থেকে নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে
শরণার্থী হয়েছেন। এককথায়, ট্রাম্পের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টরা সবাই
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ওপর দাঁড়িয়েই নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অন্য
দেশের ওপর চড়াও হয়ে সেখানকার জনগণের জীবন বিপর্যস্ত ও ধ্বংস করেছেন। এর
পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান এক অতি হাস্যকর ব্যাপার
ছাড়া আর কিছুই নয়। আমেরিকায় বর্তমানে যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে তার
জন্য তাদের এসব সামরিক তৎপরতা কতখানি দায়ী এর কোনো হিসাব ট্রাম্পের কাছে
নেই। সেদিকে তাকানোর কোনো প্রয়োজন ট্রাম্পের নেই। একটি সাম্রাজ্যবাদী দেশ
হিসেবে আমেরিকার সূর্য এখন অস্তমিত হতে থাকার কারণে যেভাবে ঢলে পড়েছে তার
জন্য তিনি তার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের দায়ী করে যাই বলুন,
আমেরিকার
অস্তগামী অবস্থা রোধের কোনো ক্ষমতা ট্রাম্প বা অন্য কারও নেই। উপরন্তু তার
এক প্রকার স্বীকৃতিই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর স্লোগান ‘আমেরিকা
ফার্স্ট’-এর মধ্যে আছে। যেসব ঐতিহাসিক কারণে আজ আমেরিকার সূর্য অস্তমিত হতে
শুরু করছে, সে কারণ রোধ করার ক্ষমতা ট্রাম্প বা অন্য কোনো ব্যক্তির নেই। এ
বিষয়ে ট্রাম্পের কোনো ধারণা আছে বলে মনে হয় না। তিনি যে বুদ্ধি নিয়ে
ব্যবসায় সাফল্য অর্জন করেছেন সে বুদ্ধি দিয়ে এই ঐতিহাসিক সত্যের উপলব্ধি যে
সম্ভব নয়, এটা বলাই বাহুল্য। কাজেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান দিয়ে তিনি
এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে সাময়িকভাবে যতই উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা
করুন, এর পরিণতির মুখোমুখি তাকে হতেই হবে। বর্তমানে আমেরিকা যে অর্থনৈতিক
সংকটের মধ্যে পতিত হয়েছে, তার থেকে উদ্ধারের প্রধান উপায় হিসেবে তিনি
বাণিজ্য ক্ষেত্রে সংরক্ষণ (Protectionist) নীতি অনুসরণ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশ্বের বর্তমান অবস্থায় এ ঘোষণাও এক ধরনের আহাম্মকির পরিচায়ক। কারণ বিশ্ব
সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি এখন যেভাবে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে
বাঁধা পড়েছে, তার থেকে আমেরিকার অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করে সংরক্ষণ নীতি
অনুসরণ করে আমেরিকার সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করা এক অসম্ভব ব্যাপার। ট্রাম্পের এ
বক্তব্যকে বাগাড়ম্বর হিসেবে ধরে না নিয়ে যদি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া যায় এবং
তিনি যদি এই নীতির ওপর মার্কিন অর্থনীতিকে দাঁড় করাতে চান, সেটা আমেরিকার
অর্থনীতিতে বড় রকম বিপর্যয় সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই হবে না। এ প্রসঙ্গে
মনে রাখা দরকার যে, সংরক্ষণ নীতি অনুসরণ শুধু আমেরিকাই করতে পারে না, অন্য
দেশও আমেরিকার বিরুদ্ধে তা অনুসরণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে,
জাপানের সঙ্গে, ইউরোপের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সম্পর্ক
এখন অবিচ্ছেদ্য। চীন হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব থেকে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ
বাণিজ্যিক অংশীদার। চীনের বিরুদ্ধে সংরক্ষণ নীতি অনুসরণ করে আমেরিকা লাভবান
হবে, এটা মনে করার থেকে অবাস্তব ও উদ্ভট চিন্তা আর কী হতে পারে?
চীনের
ক্ষেত্রে যা বড় সত্য, অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও তাই। কারণ আমেরিকা সংরক্ষণ
নীতির দ্বারা যদি অন্য দেশের স্বার্থের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে অন্য
দেশও সংরক্ষণ নীতি অনুসরণ করে আমেরিকাকে আঘাত করার ব্যাপারে পিছিয়ে থাকবে
না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যে যেসব নীতি ঘোষণা করছেন, তা নিয়ে অনেক
বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু তিনি বাহাদুরি দেখানোর উদ্দেশ্যে
যেসব ঘোষণা করছেন তা যদি তিনি সত্যি সত্যি কার্যকর করতে দাঁড়ান, তাহলে তার
দ্বারা আমেরিকার ক্ষতি বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না। সেই সঙ্গে এটা
তারও ভরাডুবির কারণ হবে। ২১.০১.২০১৭
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

No comments:
Post a Comment