Sunday, January 8, 2017

নজরদারিতে দেশী বিদেশী এয়ারলাইন্স

হঠাৎ করেই হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক এয়ারলাইন্সের যাত্রী নামধারীদের কাছ থেকে স্বর্ণের চালান উদ্ধার হচ্ছে। আর এসব ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে দেশী-বিদেশী এয়ারলাইন্সের কিছু লোকজন জড়িত থাকতে পারে বলে গোয়েন্দা সংস্থা ও ঢাকা কাস্টম হাউজ সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
যার কারণে প্রতিদিন বিভিন্ন দেশ থেকে ছেড়ে আসা ৪০টি এয়ারলাইন্সের বেশির ভাগই রামেজিংয়ের (পুরো বিমান তল্লাশি) আওতায় আনা হয়েছে। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শরীফ আহমেদ নামে এক যাত্রীর পেট থেকে ৬০ লাখ টাকা মূল্যের এক কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ১২ পিস স্বর্ণবার উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। গোয়েন্দারা বলছেন, পেট কেটে ¯¦র্ণ উদ্ধারের ভয় দেখালে যাত্রী নিজেই পায়ুপথ দিয়ে কৌশলে ¯¦র্ণগুলো বের করে দেন। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান সাংবাদিকদের বলেন, মালয়েশিয়া থেকে মালিন্দ্য এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে (ওডি-১৬২) ওই যাত্রী ঢাকায় আসেন। গ্রিন চ্যানেল অতিক্রমের সময় যাত্রী শরীফকে সন্দেহ হলে তাকে আটক করা হয়। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই তার কাছে স্বর্ণ থাকার কথা স্বীকার করছিলেন না। গোয়েন্দারা শরীফকে উত্তরার উইমেন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে পেটের এক্সরে করালে তার রেক্টামে তিনটি অস্বাভাবিক পোটলা ধরা পড়ে। কাস্টমস গোয়েন্দাদের উদ্যোগে চিকিৎসক পেট কেটে ¯¦র্ণ বের করার জন্য যাত্রীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলে তিনি অপারেশন ছাড়াই ¯¦র্ণ বের করে দিতে রাজি হন। যাত্রী শরীফের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং থানার ময়নামতি বাজারে। মালয়েশিয়ায় বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কনডম দিয়ে পায়ুপথে ¯¦র্ণ পাচারের কৌশল রপ্ত করেন তিনি। ২০১৬ সালে তিনি ১০ বার বিদেশ ভ্রমণ করেন।
সর্বশেষ ৩ জানুয়ারি ব্যবসার কাজে তিনি মালয়েশিয়া যান। বুধবার দেশে ফেরার পথে তিনি শাহজালালে ফ্লাইট অবতরণ করার ৩০ মিনিট আগে বাথরুমে গিয়ে স্বর্ণের বার মোড়ানো কনডমগুলো পায়ুপথে প্রবেশ করান। গতকাল বিমানবন্দর থানার ওসি নূরে আযম নয়া দিগন্তকে বলেন, যাত্রী শরীফকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তার একদিনের রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর করেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যাত্রী জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, স্বর্ণগুলোর মালিক তিনি নিজেই। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত যেসব স্বর্ণসহ যাত্রী আটকের মামলা হয়েছে তার মধ্যে কিছু ঘটনার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। সেগুলোর আমরা চার্জশিট দিয়েছি। এর আগে কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১০০ পিস স্বর্ণের বার উদ্ধার করেন ঢাকা কাস্টম হাউজ কর্তৃপক্ষ। চোরাচালানের মালামাল বহনের অভিযোগে কাস্টম আইনে ওই এয়ারক্রাফটটিও জব্দ করে কাস্টমস। পরে অবশ্য মুচলেকায় এয়ারলাইন্সের জিম্মায় এয়ারক্রাফটটি ছেড়ে দেয়া হয়। এর আগে দুবাই থেকে সিলেট হয়ে ঢাকাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১৬টি স্বর্ণের বার উদ্ধার হয়। যার দাম পৌনে এক কোটি টাকা।
দু’টি ঘটনায় কাস্টমসের পক্ষ থেকে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিমানবন্দরের একাধিক সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্যরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমান, কাতার, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ছেড়ে আসা ফ্লাইটে অনেক স্বর্ণ দেশে নিয়ে আসছে। এরপর এসব স্বর্ণ বায়তুল মোকাররম ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এসব ঘটনার সাথে দেশী-বিদেশী এয়ারলাইন্সের কিছু লোকজনের সম্পৃক্ততা ছাড়াও বিমান, সিভিল এভিয়েশনসহ বিভিন্ন সংস্থার কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গতকাল ঢাকা কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার আহসানুল কবিরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা এখন দেশী-বিদেশী প্রতিটি এয়ারলাইন্সেই নজরদারি করছি আমাদের নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪০টির মতো ফ্লাইট বিমানবন্দরে অবতরণ করছে।
আমরা চেষ্টা করছি বেশির ভাগ ফ্লাইটে রামেজিং অর্থাৎ পুরো বিমানে তল্লাশি করার। জনবল কম থাকায় প্রতিটি বিমানে তল্লাশি করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে দেশী-বিদেশী কোনো কোনো এয়ারলাইন্সের ওপর বেশি নজরদারি করা হচ্ছে সে ব্যাপারে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে গোয়েন্দা সংস্থা সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী এই মুহূর্তে গোয়েন্দাদের নজরদারিতে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, এয়ার এশিয়া, কাতার এয়ারওয়েজ, মালিন্দ্য, এমিরেটসসহ বেশকিছু এয়ারলাইন্স। অপর দিকে অভ্যন্তরীণ রুটের নভোএয়ার নজরদারিতে রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণ চোরাচালানকারী চক্রের সদস্যরা প্রথমে স্বর্ণের চালান চট্টগ্রামে আনছেন। পরে ওই চালান ডমেস্টিক এয়ারলাইন্সে পাঠাচ্ছেন। কোনো কোনো সময় বিমানের কানেকটিং ফ্লাইটের যাত্রী হিসেবে আসছেন। যার কারণে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে এখন এপিবিএনসহ বিভিন্ন সংস্থার নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

No comments:

Post a Comment