দেশের
বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নিরক্ষর মানুষদের অক্ষরজ্ঞান দেয়া এবং
তাদের স্বাক্ষরজ্ঞান করে তুলতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান
জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, প্রতিটি নেতাকর্মীকে সবার
আগে সুশিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। ছাত্রদের মূল রাজনীতি হবে লেখাপড়া। শিক্ষা হল
সবচেয়ে বড় সম্পত্তি। এটা কেউ হাইজ্যাক করে, লুট করে ও ছিনিয়ে নিতে পারে
না। দেশকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিতে যে আলোর যাত্রা শুরু হয়েছে যে যাত্রায়
শামিল হতে হবে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। মঙ্গলবার রাজধানীর ঐতিহাসিক
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত ছাত্রলীগের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান
অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব বথা বলেন। বাংলাদেশে সব অর্জনের সঙ্গে ছাত্রলীগ
জড়িত মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্রলীগ
অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ষড়যন্ত্রকারীরা একসময় ছাত্রলীগ ও মুজিব সৈনিককে
ধ্বংস করতে চেয়েছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, যে সংগঠন একটি আদর্শ ধারণ করে
চলে তাদের কেউ ধ্বংস করতে পারে না। শেখ হাসিনা বলেন, অশিক্ষিতদের হাতে
ক্ষমতা গেলে দেশের কী অবস্থা হয়, তা এ দেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।
শিক্ষা থাকলে শুধু নিজের জন্য নয়, দেশের মানুষকেও কিছু দেয়া যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন,
বঙ্গবন্ধু যেমন শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব
দিয়েছিলেন আমরাও তেমনি শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছি। আজ প্রতিটি শিক্ষার্থীর
হাতে বছরের শুরুতেই বই তুলে দিতে পেরেছি। তিনি বলেন, জিয়া ছিল মেট্রিক পাস,
আর জিয়ার স্ত্রী মেট্রিক ফেল। এ কারণে তারা চায়নি এ দেশের ছেলেমেয়েরা
শিক্ষিত হোক। খালেদা জিয়া যখন বলেছিল, আওয়ামী লীগকে দমন করার জন্য ছাত্রদলই
যথেষ্ট। তখন আমি ছাত্রদের হাতে বই ও কলম তুলে দিয়েছিলাম। ইংরেজি মাধ্যমে
পড়েও যখন জঙ্গি হয় তখন বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়- এমন মন্তব্য করে শেখ হাসিনা
বলেন, জঙ্গি হয়ে জীবন দিলে কি বেহেশত পাওয়া যায়? তারা কি বেহেশতে গিয়ে কোনো
খবর পাঠিয়েছে? এ পথে কেউ গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি
বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। যারা যুদ্ধাপরাধীদের মদদ দিয়েছে তারাও
রেহাই পাবে না। তাদেরও বিচার হবে বাংলার মাটিতে। জঙ্গিবাদ ও মাদকাসক্তির
সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানকে ঘিরে নেতাকর্মীদের পদভারে উৎসবমুখর হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের
আশপাশের এলাকা। বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা নিজ নিজ জেলার
নাম লেখা টিশার্ট ও ব্যাচ পরে অবস্থান নিয়েছিলেন দোয়েল চত্বর এলাকা থেকে
টিএসসি পর্যন্ত। বিকাল ৩টা ৩৫ মিনিটে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা। এরপর ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সঙ্গে নিয়ে জাতীয়
সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে জাতীয় ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলন,
শান্তির প্রতীক
পায়রা অবমুক্ত এবং বেলুন উড়িয়ে পুনর্মিলনীর উদ্বোধন ঘোষণা করেন
প্রধানমন্ত্রী। মঞ্চে উঠেই প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে উপস্থিত ছাত্রলীগের
সাবেক ও বর্তমান নেতাদের শুভেচ্ছা জানান। এরপর ছাত্রলীগের দলীয় সঙ্গীত
‘শিক্ষা শান্তি প্রগতির নামে মোরা মুজিবের সৈনিক, কাঁপিয়ে তুলব সারা চরাচর,
মোরা কাঁপাব দিগবিদিক ছাত্রলীগ... জয় জয় ছাত্রলীগ’ গাওয়া হয়। আওয়ামী লীগ
সভাপতি এবং ছাত্রলীগের আজীবন সদস্য শেখ হাসিনা নিজেও গানে কণ্ঠ মেলান এবং
হাততালি দেন। ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক
প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট উপহার দেন। সংগঠনের সহ-সভাপতি নিশিতা ইকবাল নদী ও
চৈতালি হালদার চৈতী শেখ হাসিনাকে উত্তরীয় ও ব্যাচ পরিয়ে দেন। এরপর সৈয়দ
মিজানুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদ ঢাকা মহানগর উত্তর, বায়েজিদ আহমেদ ও
আসাদুজ্জামান দক্ষিণ এবং আবিদ আল হাসান ও মোতাহার হোসেন প্রিন্স ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট প্রদান করেন। বিকাল ৪টা ৫৫
মিনিটে বক্তব্য শুরু করে দীর্ঘ ৪০ মিনিট বক্তৃতা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা। অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমানের অধিকাংশ নেতাই উপস্থিত
ছিলেন। ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ
সম্পাদক জাকির হোসাইনের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ,
সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের সাধারণ
সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সভামঞ্চে সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে
উপস্থিত ছিলেন ইসমত কাদির গামা, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, খ ম
জাহাঙ্গীর, আবদুল মান্নান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, শাহে আলম,
অসীম কুমার উকিল, মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, ইকবালুর রহিম, একেএম এনামুল হক
শামীম, ইসহাক আলী খান পান্না, বাহাদুর বেপারী, অজয় কর খোকন, লিয়াকত শিকদার,
নজরুল ইসলাম বাবু, মাহমুদ হাসান রিপন, মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ও
বদিউজ্জামান সোহাগ। দীর্ঘদিন পর সংগঠনের সহকর্মীদের এক সঙ্গে পেয়ে আনন্দে
আত্মহারা হয়ে ওঠেন বর্তমান ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগের সাবেক
নেতাদের পেয়ে বর্তমান নেতারা সেলফি তুলতে মেতে ওঠেন। স্মৃতিচারণ করেন সেই
অতীতের আন্দোলন সংগ্রামের দিনগুলোর কথা। খারাপ খবরের শিরোনাম না হতে
ছাত্রলীগের শপথ : অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগকে খারাপ খবরের শিরোনাম না হওয়ার শপথ
করিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ওবায়দুল
কাদের। এ ছাড়া ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন ঘোষণা দেন
আগামীতে দুর্নাম হয় এমন কোনো কাজ ছাত্রলীগ করবে না। পাশাপাশি জনদুর্ভোগ
কমাতে শুক্র ও শনিবার ছাড়া অন্যান্য দিন র্যালি না করারও ঘোষণা দেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ছাত্রলীগের দু’একটা খারাপ কাজ সরকারের সব উন্নয়ন ম্লান
করে দিতে পারে। তাই ছাত্রলীগকে আজ শপথ নিতে হবে, খারাপ কাজের শিরোনাম হব
না। ছাত্রলীগকে সুনামের ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর
দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, পরিবর্তন শুরু হয়েছে। আজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের
কোথাও কোনো ব্যানার ফেস্টুন নেই। তিনি বলেন, নেত্রীর নির্দেশ, তাই আমাদের
সিদ্ধান্ত হল রাস্তা বন্ধ করে আর র্যালি হবে না। জনগণের যা সমস্যা হয়েছে
তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আগামীতে জনগণের ভোগান্তি হয় এমন কোনো কাজ আমরা
করব না। ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন ঘোষণা দেন, আগামীতে
ছাত্রলীগ শুক্র ও শনিবার ছাড়া অন্য দিনে আর কোনো র্যালি করবে না। ছাত্রলীগ
কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যাবে না। যারাই বিশৃংখলা করবে তাদের বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনি আমাদের মায়ের
মতো। ভুল করলে শাসন করবেন, কিন্তু দূরে ঠেলে দেবেন না।

No comments:
Post a Comment