জাতীয়
সংসদ কোনোভাবেই সংবিধানের বিধানবলীর পরিপন্থী কোন আইন প্রণয়ন করবে না। একই
সঙ্গে মৌলিক অধিকার পরিপন্থী আইন প্রণয়ন না করতে জাতীয় সংসদকে বারণ করেছে
হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অপরিসীম
ক্ষমতাবান নন। সংসদকে ভুলে গেলে চলবে না যে তাদের ক্ষমতা সংবিধানের বিধি
বিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ।
এই অভিমত দিয়ে হাইকোর্ট দায়মুক্তি অধ্যাদেশকে অবৈধ ও
বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে সোমবার ৫২ পৃষ্ঠার
এই রায় প্রকাশিত হয়। আদালত বলেছেন, আইনগত প্রতিকার পাওয়ার অধিকার সংবিধান
সকল নাগরিককে দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কোনো আদালতে প্রতিকার চাইতে এবং
কারও বিরুদ্ধে মামলা বা বিচার প্রার্থনা করতে পারবে না-এটা সংবিধানের মৌলিক
অধিকারের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই অভিযানের সময় যৌথ বাহিনীর কোনো
সদস্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা
প্রতিকার চেয়ে ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা করতে পারবে। মূল রায়টি লিখেছেন
বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। নিজস্ব অভিমত দিয়ে
রায়ে একমত পোষণ করেছেন কনিষ্ট বিচারক বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল। গত বছরের
১৩ সেপ্টেম্বর এই রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ
যথা-নির্বাহী বিভাগ, আইন সভা ও বিচার বিভাগ। এই তিনটি অঙ্গই সংবিধান দ্বারা
সৃষ্ট। অর্থাৎ তিনটি অঙ্গের কেউ সার্বভৌম নয়।
প্রত্যেকটি অঙ্গ সংবিধানের
বিধি বিধান সাপেক্ষে স্বাধীন। শ্রেষ্ঠত্ব শুধুমাত্র এই সংবিধানের।
সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব মানে জনগণের শ্রেষ্ঠত্ব। জনগণের অভিপ্রায় বা ইচ্ছার
প্রতিফলন এই সংবিধান। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গই সংবিধানের বিধি বিধান মেনে
চলতে বাধ্য। সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করে হাইকোর্টের রায়ে বলা
হয়, প্রজাতন্ত্রের সকল আইন প্রণয়নের ক্ষমতা শুধুমাত্র সংসদের এবং এই আইন
প্রণয়নের ব্যাপারে সংসদ স্বাধীন। এতদ্বসত্ত্বেও এই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে
সংসদের কিছু সুনিদ্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা আছে। অর্থাৎ সংসদকে আইন প্রণয়ন করতে
হবে সংবিধানের ‘বিধানবলী সাপেক্ষে’। জাতীয় সংসদ কোন ভাবেই সংবিধানের
বিধানবলীর পরিপন্থী কোন আইন প্রণয়ন করবে না। সংসদ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে
অপরিসীম ক্ষমতাবান নন। সংসদকে কখনই ভুল করা কিংবা ভুলে গেলে চলবে না যে
তাদের ক্ষমতা সংবিধানের অন্যান্য বিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ। কারণ সংবিধান
লিখিত। দেশের জনগণ সকলকেই এই সংবিধানের বিধি বিধান মোতাবেক চলার নির্দেশনা
দিয়েছে। রায়ে বলা হয়, যৌথ বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আইনের
উর্ধে্ব নয়। ইতমধ্যে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যে কেউ আইনের উর্ধে্ব নয়,
বরং সকলেই আইনের অধীন। যৌথ বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে যদি
কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন তাহলে তা বেআইনি, অসাংবিধানিক ও
নিন্দাযোগ্য। এ ধরনের কোন নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
রায়ে বলা হয়, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফজতে মৃত্যুর ঘটনা হচ্ছে মানবাধিকার
লংঘনের সবচেয়ে জঘন্য রূপ। সংবিধান অনুসারে একজন ভয়ঙ্কর অপরাধীরও আদালতের
কাছে বিচার চাওয়ার অধিকার আছে।
আমরা মনে করে যৌথ বাহিনী বা আইন শৃঙ্খলা
বাহিনীর সদস্যরা নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারে না। রায়ে বলা হয়, জাতীয়
সংসদকে সতর্ক থাকতে হবে যেন এ ধরনের সংবিধানের চেতনা-পরিপন্থী আইন যেন আর
প্রণীত না হয়ে যায়। ইচ্ছাধীন হত্যাকে দায়মুক্তি দিতে সংসদ কোনো আইন প্রণয়ন
করতে পারে না। আইনটি জন্মগতভাবে মৃত এবং এর কোনো আইনগত অস্তিত্ব নেই। তবে
মানুষের মৌলিক অধিকারের দিকে খেয়াল রেখে সংসদকে আইন পাশ করতে হবে। ২০১৫
সালের ১৩ সেপ্টেম্বর এ রায় দেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি
আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ। ৫২ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারপতি মইনুল ইসলাম
চৌধুরীর সঙ্গে একমত পোষণ করে কিছু নিজস্ব মতামত দিয়েছেন বিচারপতি
মো.আশরাফুল কামাল। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি
পর্যন্ত ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলে। ওই অভিযানের
কার্যক্রমকে দায়মুক্তি দিয়ে ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘যৌথ অভিযান
দায়মুক্তি আইন, ২০০৩’ জারি করা হয়। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের
আইনজীবী জেড আই খান পান্না ২০১২ সালের ১৪ জুন হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করেন।
এরপর আদালত রুল জারি করেন। সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ২০১৫ সালের ১৩
সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়।

No comments:
Post a Comment