Thursday, January 12, 2017

আশা-নিরাশার দোলাচলে বিশ্ব

বিদায়ী বছরের সবচেয়ে বেদনাবিধুর ঘটনা ছিল আফ্রো-এশীয় আরব অঞ্চলের কয়েকটি দেশের হতভাগ্য শরণার্থীদের মানবেতর জীবনচিত্র। ব্যাঙের দিকে পাথর নিক্ষেপের খেলায়রত বালকের মতো বিশ্বরাজনীতির মোড়ল রাষ্ট্রগুলোর দখলতত্ত্বের (Hegemonic Stability Theory) প্রস্তরাঘাতে শরণার্থী সমস্যা জর্জরিত করেছে ওই অঞ্চলের একসময়কার অভিজাত নর-নারী, শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধার জীবন। ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে সদ্যবিবাহিতা যুবতীর স্বপ্নের সৌধ। কেড়ে নিয়েছে শিশুর পৃথিবীর আলো দেখার চিরায়ত অধিকার। শিশু আইলানের সাগরতীরে পড়ে থাকা নিথর দেহ, ধ্বংসস্তূপে ওমরানের ওপর রক্তাক্ত আঘাত বিশ্ববিবেককে জাগাতে পারেনি এতটুকু। ইউরোপ এদের ভাগ্য নিয়ে রাজনীতি করেছে, দুষ্টরা বাণিজ্য করেছে। বিশ্ব মোড়লরা আঞ্চলিক আধিপত্য রক্ষার ঢাল হিসেবে এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। জার্মানির অ্যাঞ্জেলা মার্কেল শরণার্থীদের জন্য ‘মুক্তদ্বার নীতি’ ঘোষণা করে স্বদেশ ও স্বঅঞ্চলে একঘরে হয়েছেন। তুরস্ক ইইউতে স্থান পাওয়ার রাজনীতি করেছে। আরব শেখ-রাজারা বিশ্বরাজনীতির তল্পিবাহক হিসেবে তৎপর থেকেছে।
আর ভাগ্যাহত শরণার্থীরা দলে দলে সাগর সমাধির ইতিহাস গড়েছে, আশ্রয় নিয়েছে সমুদ্রমাতার উদার কোলে। গত বছরের দ্বিতীয় বেদনাদায়ক ইস্যুটি ছিল বিশ্বব্যাপী নিষ্ঠুর সন্ত্রাসবাদের আঘাত। সন্ত্রাসের উৎস ও কারণ চিহ্নিত না করে, সন্ত্রাসীদের লালন-পালনকারীদের পরিচিত না করিয়ে এবং সন্ত্রাস দমনে গঠনমূলক ভূমিকা না নিয়ে বিশ্বরাজনীতির ক্রীড়ানকরা বৈশ্বিক স্ট্র্যাটেজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষায় বিশ্ব সন্ত্রাসকে উসকে দিয়েছে। আশির দশকে দুই পরাশক্তি আফগানিস্তানের সহজ-সরল মানুষের জনপদে পালাক্রমে দখলদারিত্ব বজায় রাখার যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে হিমালয়ের পাদদেশে যে সন্ত্রাসের বীজ বপন করেছিল, তা-ই যেন মহীরুহ হয়ে গত বছর বিশ্বকে আঘাতে তছনছ করে দিয়েছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন ফ্রন্ট গঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে বিশ্ব মোড়লদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তা পেয়ে ওই গ্রুপগুলো লক্ষ্যচ্যুত হয়ে নানাভাবে, নানা প্রকৃতিতে ও নানা অবয়বে বহুমুখী সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে বিশ্বরাজনীতিতে জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। মুজাহিদ, আল কায়দা, তালেবান, আন নুসরা, বোকো হারাম, হুজি, জেএমবি ইত্যাদি নানা নামে কায়েমি স্বার্থবাদীদের পক্ষে বিশ্বের বহু জনপদকে সন্ত্রাসের নরকে পরিণত করেছে। গত বছরের শেষ দিনগুলোয় দৈনিক পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ তাদের আরব মিত্র যেমন- সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, মিসর ইত্যাদি দেশের যোগসাজশে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের টিকিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র করছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক বৃহৎ শক্তিবর্গ নিজেদের স্বার্থে সন্ত্রাসের জন্ম দিচ্ছে, সন্ত্রাসীদের গড়ে তুলছে, আবার স্বার্থ-উদ্ধার শেষে বা এ পথে ব্যর্থ হলে ওই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এভাবে বড় শক্তিগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় বৈশ্বিক সন্ত্রাস পৃথিবীকে রক্তাক্ত প্রান্তরে পরিণত করেছে। গত বছরের আরেকটি মর্মন্তুদ আন্তর্জাতিক ইস্যু হল বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্দয় নিপীড়ন। বিশেষ করে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চলে বিশ্বের নানা প্রান্তে। চীনের উইঘুর মুসলিম, ফিলিপাইনের মরো মুসলিম, মিন্দানওয়ের প্রতিবাদী মুসলিম, মিয়ানমারের রাখাইন মুসলিমদের ওপর জাতিগত নিধন প্রক্রিয়া শুরু করে ওইসব দেশের সরকারগুলো। সর্বব্যাপী বৈশ্বিক নিন্দা ও প্রতিবাদ সত্ত্বেও মিয়ানমারের গণতন্ত্রকন্যাখ্যাত অং সান সু চির দেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর বর্বরোচিত অত্যাচার মানব সভ্যতার ইতিহাসে নজিরবিহীন কলংকের অধ্যায় সংযোজন করেছে। মিয়ানমারের বর্বর সৈন্য ও উদ্ধত বৌদ্ধরা মিলে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে, মায়ের কোল থেকে দুগ্ধপানরত শিশুকে কেড়ে নিয়ে জ্বলন্ত আগুনে ছুড়ে দিয়ে, পিতা-পুত্র, ভ্রাতা-বোন, মা-দাদি-নানীর সামনে যুবতী ও কিশোরীদের ধর্ষণ করে জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়। অথচ বিশ্বসম্প্রদায় এর কোনো বিচার না করে কেবল নিন্দাবাণীর ঝড় তুলে এ কলংকময় অধ্যায়কে আরও কলংকিত করেছে। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক ব্যবস্থায় শান্তি প্রতিষ্ঠার যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল তা ক্ষীণ হতে থাকে এবং ২০১৬ সালের কয়েকটি ঘটনা সেই সম্ভাবনাকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেয়। যুক্তরাজ্যবাসী ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যেতে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিলে ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির বদৌলতে গড়ে ওঠা ইউরোপীয় ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। জার্মানরা জেক্সিট, ফরাসীয় ফ্রেক্সিট, ডাচরা নেক্সিট এবং অন্যরাও এমন ভোটাভুটিতে আগ্রহ প্রকাশ করে ইউরোপীয় সংহতি তত্ত্বের মূলে আঘাত হানে। সম্ভবত হ্যাস, মিত্রানি প্রমুখ সংহতি তাত্ত্বিকের তথ্য ও তত্ত্বের অসারতা প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হয় গত বছর।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সব জরিপ এবং বিশ্ব জনমতের বিপরীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী জয়। এ ঘটনার বিরুদ্ধে মার্কিনিদের প্রতিবাদ দেখে একপর্যায় মনে হয়েছিল, ১৭৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতাই বুঝি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া আমেরিকার ফেডারেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আন্দোলন শুরু করে। বড় বড় রাজ্যগুলোর তরুণ-তরুণীরা রাস্তায় নেমে পড়ে একই দাবিতে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের আমেজ নিয়ে। নির্বাচন-পরবর্তী ঘটনাবলি যুক্তরাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও নেতৃত্বের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। বিশ্বব্যবস্থার ব্যাস্টিক তাত্ত্বিক যেমন- ফুকুইয়ামা, হ্যান্টিংটন, কুপচান প্রমুখ বিশ্লেষকের তত্ত্ব নতুনভাবে অধ্যয়ন করার তাগিদ সৃষ্টি করে ২০১৬। আমেরিকা কি সত্যিই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে? এমন প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণে বিশ্ব ব্যস্ত থাকবে ২০১৭-এর শুরু থেকেই। বিশ্বব্যবস্থার ব্যাস্টিক ও সামষ্টিক জনবিন্যাসের আরেকটি প্রেক্ষিত তৈরি হয় গত বছরের শেষদিকে। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয় সিরিয়ার ভূমিতে। অর্থাৎ সিরিয়ার মাটিতে কবর খোঁড়া হয় পাশ্চাত্যের এবং সেই খননকার্য নিখুঁতভাবে পরিচালনা করে প্রাচ্যের রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল সমস্যা সমাধানের নেতৃত্ব সিংহ-গর্জনে হাতে তুলে নেয়া এ তিনটি রাষ্ট্র। এর সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতিতে যে শক্তিবলয়ের নবজন্ম হল, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখবে বলে এ মুহূর্তে অনুমান করা যায়। এ ছাড়া বৈশ্বিক রণকৌশলগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট বার্তা ছড়িয়েছে ২০১৬ সালের শেষ দিনগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশটির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও সম্প্রসারিত অস্ত্রায়নের নীতির কথা বলেছেন। রাশিয়াও ইতিমধ্যে দ্বিগুণের মতো রকেট উৎপাদন করা শুরু করেছে। জাতিসংঘে উত্থাপিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা নিরস্ত্রীকরণ প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বৃহৎ শক্তিগুলো। এমন এক অবস্থায় পৃথিবীর নিরাপত্তায় অশনিসংকেত শোনা যাচ্ছে।
তবে রাশিয়া ট্রাম্পের আমলে মার্কিন বৈরিতা ছেড়ে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হবে বলেও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প ইসরাইলকে উসকে দিচ্ছে ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে বসতিস্থাপনের সন্ত্রাস চালাতে, যা রাশিয়ার নীতিবিরুদ্ধ। অর্থাৎ বিশ্ব একটি অনিশ্চিত ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয়েছে গত বছরই। ব্রেক্সিট এবং ট্রাম ফোবিয়ার কারণে বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বর্তমান সময়টিকে পৃথিবীর জন্য বিপজ্জনক হিসেবে অভিহিত করেছেন। জাতিগত দেয়াল, দেশগত বিভেদ ভেঙে ফেলে সৃজনশীল ও বিশ্বময় নেতৃত্বের বিকাশ ঘটিয়ে বিশ্বকে বাসযোগ্য করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ২০১৬ সাল একটি সুখের ডালিও উপহার দিয়েছে, যেখানে রংতুলি দিয়ে বিশ্বশান্তি-কাঠামো তৈরি করা যায়। চিরবৈরী কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সম্পর্ক তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ১৯২৮ সালের পর ৮৮ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওবামা কিউবা সফর করেছেন। কাস্ত্রোর প্রয়াণের আগেই কিউবায় ফিরে আসে মার্কিন প্রমোদতরী, উড়তে থাকে দু’দেশের মধ্য দিয়ে উভয়ের উড়োজাহাজ, গড়ে উঠে উভয়ের দূতাবাস। কিউবার সাইকেল, ট্যাক্সি ও গাড়িতে ওড়ানো শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। ২০১৭ সালে আমরা শান্তিকামী বিশ্ববাসী আশা করছি, বিশ্বনেতারা এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবেন। পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে ২০১৬ সালে সম্পাদিত পরিবেশ চুক্তিগুলোর বাস্তবায়নে বিশ্ব ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগোবে।
মুহাম্মদ রুহুল আমীন : প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
mramin68@yahoo.com

No comments:

Post a Comment