Wednesday, January 4, 2017

১৬ ঘণ্টার চেষ্টায় ডিসিসি মার্কেটের আগুন নিয়ন্ত্রণে

ভয়াবহ আগুনে পুড়ল রাজধানীর গুলশান-১ এর ডিসিসি মার্কেট। মার্কেটের তিন শতাধিক দোকান সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও দুই শতাধিক। ধসে পড়েছে মার্কেটের একটি তিনতলা ভবন। সোমবার রাত ২টার দিকে মার্কেটের কাঁচাবাজার থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে। নৌবাহিনীর কয়েকটি ইউনিট ও ব্যবসায়ীদের সহায়তা নিয়ে ২৩টি ইউনিট ব্যবহার করে প্রায় ১৬ ঘণ্টার চেষ্টায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। আগুনে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। দোকানপ্রতি কোটি টাকারও বেশি মালামাল পুড়ে যাওয়ার দাবি করেছেন তারা। আর ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা বলছেন, এ ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। চোখের সামনে সব নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি অধিকাংশ ব্যবসায়ী। আগুন নেভাতে দমকল কর্মীদের দেরি ও গাফিলতিতে ক্ষুব্ধ তারা।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, নাশকতামূলকভাবেই এ আগুন দেয়া হয়েছে। আর ফায়ার সার্ভিস তৎপর হলে ক্ষয়ক্ষতি এত ভয়াবহ হতো না। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক। তিনি দাবি করেছেন, নাশকতার শংকা ৯৯ শতাংশই নেই। বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেই আগুন লেগেছে। আল্লাহর অসীম রহমত, এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি বা চাপা পড়েনি। এদিকে এটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত নাশকতা তা খতিয়ে দেখতে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। মার্কেটের রাতের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মতিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, রাত ২টার দিকে বিকট শব্দ হয়। পরে মার্কেটের পূর্বপাশে ট্রান্সফরমারে আগুন জ্বলতে দেখি। মুহূর্তেই কাঁচাবাজারে আগুন লাগে। শুরুতে নিজেরা মার্কেটের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। না পেরে এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেখে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিই। রাত ৩টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ২টি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভাতে কাজ শুরু করে। তবে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, রাত আড়াইটার দিকে খবর পেয়ে দ্রুত বিভিন্ন স্টেশন থেকে ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে আসে। পরে আগুনের ভয়াবহতা বিবেচনা করে ইউনিট বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২৩টি ইউনিট চেষ্টা করে।
সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের একজন আবদুল কাদের। গিফট গ্যালারির এ স্বত্বাধিকারী যুগান্তরকে বলেন, আগুনের খবর পেয়ে ছুটে আসি। এসে দেখি ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। পানি ছিটানো শুরু করার একটু পরই দেখি তাদের পানি শেষ। এর কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকটি ইউনিট এলেও তাদের তেমন তৎপর দেখিনি। ফায়ার সার্ভিস কর্র্মীদের গা-ছাড়া ভাবের কারণেই আগুন আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক খোরশেদ আলম যুগান্তরকে বলেন, মার্কেটের পাশে কয়েকটি পুকুর রয়েছে। গুলশান লেকও বেশি দূরে নয়। সেখান থেকেও লাইন টেনে এখানে পানি আনা সম্ভব ছিল। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তা না করে তাদের গাড়িতে করে পানি আনতে থাকে। পাশের দুয়েকটি বাড়ি থেকেও পানি আনে। এতে অল্প করে আনা পানি মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের এ নিয়ে বললে তারা আমাদের বলেন, পানির অভাবে কাজ করা যাচ্ছে না। ভিআইপি জুয়েলারির মালিক শাহ আলম অভিযোগ করেন, অনেকগুলো ইউনিট এলেও অনেক ইউনিট ও কর্মী প্রায় বসে ছিল। এত ইউনিট আনা হয়েছিল মিডিয়াকে দেখানোর জন্য। এ আগুন যে নাশকতার জন্য লাগানো হয়েছে তাদের আচরণেও তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আগুন নেভাতে এত দেরি হল কেন? জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, এখানে ফেব্রিক ও কসমেটিক আইটেমসহ অনেক দাহ্য পদার্থ ছিল। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নেভাতেও সময় লাগে। মার্কেটের অবকাঠামোর কারণেও আগুন নেভাতে সময় লেগেছে। মার্কেটের ভেতরে পানির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল খুবই দুর্বল। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মার্কেটের সামনে দেখা গেছে, তিন তলা ভবন পুরোটাই ধসে পড়েছে। ওই ভবনের নিচতলায় ছিল কাঁচাবাজার। ওপরের তলাগুলোতে ছিল কসমেটিকস, গিফট ও ইলেকট্রনিক্সের দোকান। এ ভবনে ছিল তিন শতাধিক দোকান। ভবনের সামনে তখন আহাজারি করছিলেন ব্যবসায়ীরা। উৎসুক জনতা ভিড় করছিল রাস্তায়। তাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল পুলিশ। পাশে গিয়ে দেখা যায়, পাশের দোতলা ভবনেও আগুন জ্বলছে। ওই ভবনে প্রায় দু’শ দোকান রয়েছে। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা দোকানের মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। এ ভবনের ব্যবসায়ীরা জানান, রাতে খবর পেয়েই তারা ছুটে আসেন। তারপরও মালামাল ঠিমমতো বের করা যায়নি। ব্যবসায়ী আবদুল কাদের যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আমার ৪টি দোকান ছিল। সব পুড়ে গেছে। নগদ ২০ লাখ টাকা ছিল ক্যাশে।
সকালে ব্যাংকে টাকাগুলো জমা দেয়ার কথা ছিল। সব পুড়ে গেছে। আগুন আমাকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগুনে শুধু আমি একাই নিঃস্ব হইনি। বেকার হয়েছে আমার ২০ কর্মচারীও।’ তিনি অভিযোগ করেন, এটা পরিকল্পিত নাশকতা। দোকান মালিকদের উচ্ছেদ করতেই পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘গত বছর আমাদের নোটিশ (ছেড়ে দেয়ার) দেয়া হয়েছিল। সমাধান হয়নি। ৪টি মামলাও চলছে মালিক সমিতির সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের। এখন আমাদের উচ্ছেদ করতেই এ আগুন দেয়া হয়েছে।’ সকাল ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। এটি নাশকতা কিনা? জবাবে মেয়র বলেন, নাশকতা নয়, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেই আগুন লেগেছে। ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মেয়র বলেন, এটা এখনি বলার সময় হয়নি। ঘণ্টা খানেক পর তিনি চলে যান। এরপর দুপুর ২টার দিকে আবারও ঘটনাস্থলে আসেন আনিসুল হক। এ সময় এ জমি নিয়ে দোকান মালিকদের সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের মামলা নিয়ে জানতে চাইলে মেয়র কোনো মন্তব্য করেননি। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে আগুনের ঘটনাটি তদারক করছেন। কীভাবে আগুন লেগেছে,
কেন আগুন নেভাতে দেরি হচ্ছে- এ প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, তদন্ত করে আগুন লাগার কারণ খুঁজে বের করা হবে। দেশের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ততটা উন্নত নয়, যে কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। দুপুর ১২টার দিকে গুলশানে আসেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি উৎসুক জনতার ভিড় কমিয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের কাজ করার সুযোগ করে দিতে পুলিশকে নির্দেশ দেন। আধা ঘণ্টা পর সেখানে আসেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। তখনও ভেতরে দাউদাউ করে জ্বলছিল আগুন। রিয়াজুল হক বলেন, এটি দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত নাশকতা- তা খতিয়ে দেখতে সব পক্ষকে নিয়ে তদন্ত কমিটি করতে হবে। তদন্তের ভার শুধু ফায়ার সার্ভিসকে দিলে হবে না। মালিক সমিতি, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বয়ে কমিটি করতে হবে। এ ছাড়া এসব স্থাপনার অগ্নিনিরাপত্তা ঠিক আছে কিনা, সরকারের সংশ্লিষ্ট যেসব বিভাগ এ বিষয়টি দেখভালের কথা ছিল তারা ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে। আগুনের ঘটনায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের পুনর্বাসনের দাবি জানান মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান। বেলা ১টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য রহমত উল্লাহ। পরিস্থিতি দেখে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি সাংবাদিকদের জানান, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ভবন নির্মাণ করে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বাসন করা হবে। ডিসিসি কাঁচাবাজার মার্কেট সমিতির সভাপতি শের মোহাম্মদ যুগান্তরকে জানান, সাত বিঘা জমির ওপর এ মার্কেটের পাকা অংশটি আছে ১৯৬২-৬৩ সাল থেকে। ১৯৮৩ সালে সিটি কর্পোরেশন কাঁচা মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেয়। ২০০০ সালে মার্কেটের দুটি পিলার ফেটে গেলে ভনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। পরে মেরামত করে চলছিল মার্কেটটি। ২০০৩ সালে তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে এ মার্কেটের জায়গায় ১৮ তলা গুলশান ট্রেড সেন্টার নির্মাণের দরপত্র দেন। তবে নানা কারণে নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। শের মোহাম্মদ আরও বলেন, আগুনের ঘটনায় অন্তত হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তদন্ত কমিটি : ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রি. জেনারেল আলী আহমেদ খান যুগান্তরকে বলেন, কমিটির প্রধান করা হয়েছে পরিচালক কর্নেল মোশারফ হোসেনকে। সদস্য সচিব করা হয়েছে সহকারী পরিচালক মাসুদুর রহমান আকন্দকে। অন্য সদস্যরা হলেন : উপসহকারী পরিচালক (জোন-৬) সালেহ উদ্দিন, তেজগাঁও স্টেশনের সিনিয়র অফিসার তানহারুল ইসলাম ও ওয়্যার হাউস পরিদর্শক শরিফুল ইসলাম।

No comments:

Post a Comment