Wednesday, January 4, 2017

বিমানে নারী বৈমানিককে নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড

বাংলাদেশ বিমানে এক নারী বৈমানিকের রুট ট্রেনিংয়ে রহস্যজনক ফেলের ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ওই নারী বৈমানিক রুট চেকের সময় তার প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেনের রোষানলের শিকার হয়েছেন। এই প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ নিলে ফল খারাপ হবে- এমন আশংকা প্রকাশ করার পরও তাকে বাধ্য করা হয় ওই ক্যাপ্টেনের অধীনে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে।
প্রশিক্ষণে ভালো করার পরও প্রশিক্ষক তাকে অন্যায়ভাবে ফেল করিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠে। নারী বৈমানিক এর প্রতিবাদ করলে তাকে মানসিক রোগী বলে অভিযুক্ত করে পাঠানো হয় মনোচিকিৎসকের কাছে। তাতেও থামেননি বিমানের ফ্লাইট পরিচালনা শাখার শীর্ষব্যক্তি ওই ক্যাপ্টেন। অন্যায়ভাবে নারী বৈমানিকের বেতন-ভাতাদি বন্ধ করে দেয়া হয়। নিরুপায় হয়ে ঘটনার শিকার নারী বৈমানিক কো-পাইলট ফারিয়াল আহমেদ বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে ৮ পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগে সুষ্ঠু বিচার ও তদন্ত দাবি করেন। ঘটনাটি এরই মধ্যে বিমান ম্যানেজমেন্ট, পরিচালনা পর্ষদ পেরিয়ে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়িয়েছে। এতে বিমানের টপ টু বটম- সবাই বিব্রত বোধ করছেন। তবে কেউ মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেন না। অভিযোগ আছে, এখন বিমানের ফ্লাইট অপারেশন শাখার একটি সিন্ডিকেট ওই নারী বৈমানিককে চাকুরিচ্যুত করার হুমকি দিচ্ছে। এমনকি তারা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়ার হুমকিও দিচ্ছে। ফ্লাইট অপারেশন শাখার এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, বিমানের এক প্রভাবশালী পাইলটের ভাই হচ্ছেন বিমান ম্যানেজমেন্টের শীর্ষ কর্মকর্তা। এ কারণে ম্যানেজমেন্টও ক্যাপ্টেন ফারিয়ালের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। বিমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন (অব.) মোসাদ্দিক আহম্মেদ বলেন, ফারিয়ালের বেতন বন্ধের নির্দেশ প্রত্যাহারের জন্য তিনি ফ্লাইট অপারেশন বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ফারিয়ালকে আবার অপারেশনে ফিরে আসতে হলে আগে ইন্সট্রাকটরের দেয়া ফেল রিপোর্ট মেনে নিতে হবে। এরপর তাকে দ্বিতীয় দফায় অপর একজন ইন্সট্রাকটের অধীনে রুট চেক ট্রেনিংয়ে পাঠানো হবে বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন যুগান্তরকে জানান, ঘটনাটি তিনি শুনেছেন। সোমবার বিকালে বিমানের এমডিকে ডেকে বিষয়টি জানতে চেয়েছেন। তিনি অবিলম্বে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি মনে করেন ম্যানেজমেন্টের কোনো সিদ্ধান্ত তার বিরুদ্ধে গেছে, তাহলে এর প্রতিকারের জন্য তিনি দরখান্ত কিংবা অভিযোগ জানাতেই পারেন।
এ কারণে তার বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেয়া অন্যায় ও মানবাধিকার লংঘন। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিষয়টি তিনি বিমান পর্যদ চেয়ারম্যান ও বিমান এমডিকে জানিয়েছেন বলেও জানান। বিমান প্রশাসন বিভাগের এক কর্মকর্তা ফারিয়ালের দেয়া অভিযোগের বরাত দিয়ে যুগান্তরকে জানান, ফারিয়ালের রুট চেকের প্রশিক্ষক ছিলেন বিমানের চুক্তিভিত্তিক বৈমানিক ক্যাপ্টেন ইন্সট্রাকটর কামরুল হাসান জোয়ারদার। তার বিরুদ্ধে এর আগেও অসংখ্য অভিযোগ বিমানে ফাইলবন্দি হয়ে আছে। ফ্লাইট অপারেশন শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে নানা অভিযোগে ক্যাপ্টেন জোয়ারদারকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর বিরুদ্ধে তিনি আদালতে মামলা করেন। মামলায় জয়ী হয়ে ২০১১ সালে আবার বিমানে যোগ দেন ক্যাপ্টেন জোয়ারদার। এরপর ২০১৩ সালে তিনি অবসরে যান। ওই সময় তিনি চুক্তিভিত্তিক চাকরির চেষ্টা করেও বিমানে আর যোগদান করতে পারেননি। জানা গেছে, ২০১৪ সালে তিনি বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন মাহবুরের সহযোগিতায় বিমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। বিমানের আইন অনুযায়ী চুক্তিভিত্তিক কোনো পাইলট ইন্সট্রাকটর হতে পারেন না। কিন্তু বাপার প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তাকে ইন্সট্রাকটর হিসেবে নিয়োগ দেয় বিমান ম্যানেজমেন্ট। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন জোয়ারদার যুগান্তরকে বলেন, রুট চেকে পাস করার জন্য যেসব শর্ত পূরণ করতে হয়, কো-পাইলট ফারিয়াল কোনোটিই পূরণ করতে পারেননি। তিনি ফেল করেছেন। এখানে কোনো ধরনের খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন গ্রাউন্ডেট থাকার কারণে তিনি কো-পাইলট হিসেবে আনফিট ছিলেন। ককপিটে বসেই তিনি অসংলগ্ন আচরণ করেন। একটি যাত্রীবাহী ফ্লাইটে ওই রুট চেকের পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল। ওই ফ্লাইটে তাকে পাইলটের আসনে বসিয়ে বলা হয়েছিল বিমান চালানোর জন্য। কিন্তু ফারিয়াল কোনো কমান্ডই সঠিকভাবে দিতে পারেননি। রোষানলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিমানে ফ্লাইট ডাটা মনিটরিং করার জন্য ব্ল্যাকবক্স আছে, তা পরীক্ষা করলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। দুই দফায় তাকে মানসিক ডাক্তারের কাছে পাঠানোর সুপারিশ কেন করেছেন জানতে চাইলে জোয়ারদার বলেন, এটা ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত, বিমানের চিফ মেডিকেল অফিসার (সিএমও) জানেন। এ নিয়ে আমি কোনো সুপারিশ করিনি। এ প্রসঙ্গে বিমানের সিএমও ডাক্তার তাসলিমা বলেন, কো-পাইলট ফারিয়ালকে মানসিক ডাক্তারের কাছে পাঠানো বিমানের নিয়মিত কাজের একটি অংশ। নিয়ম অনুযায়ী কোনো প্রার্থী প্রথম দফায় মেডিকেল পরীক্ষায় ফিট প্রমাণিত হলে দ্বিতীয় দফায় মেডিকেল করাতে হলে পরিচালকের (হেলথ) অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে সিএমও বলেন, আইন অনুযায়ী যা যা করার দরকার সব করা হয়েছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত : পাইলটদের অপারেশন ম্যানুয়াল অনুযায়ী, ট্রেনিং পাইলট তার পছন্দের যে কোনো ইন্সট্রাকটরের অধীনে রুট চেক পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পান। বর্তমানে বিমানে ৫ জন ইন্সট্রাকটর পাইলট আছেন। সে অনুযায়ী ফারিয়াল বিমান ম্যানজেমেন্টকে জানান, ক্যাপ্টেন জোয়ারদার ছাড়া বাকি যে কোনো ৪ জন ইন্সট্রাকটরের অধীনে তিনি রুট চেক পরীক্ষা দিতে আগ্রহী। কিন্তু অভিযোগ আছে, বিমানের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের একটি সিন্ডিকেট ফারিয়ালের এ আবেদন অগ্রাহ্য করে ইন্সট্রাকটর জোয়ারদারকেই তার ট্রেনিং পরীক্ষক নিয়োগ দেয়। এদিকে পরীক্ষার আগে ক্যাপ্টেন জোয়ারদার জানতে পারেন ফারিয়াল তার অধীনে পরীক্ষা দিতে রাজি নন। ধারণা করা হচ্ছে, এতেই ক্ষুব্ধ হন জোয়ারদার। যার কারণে রুট চেক শেষে ফারিয়াল জানতে পারেন তিনি ফেল করেছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে ফার্স্ট অফিসার ফারিয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। শুধু জানান, তার অভিযোগ বিমানের কাছে লিখিতভাবে দেয়া হয়েছে।

No comments:

Post a Comment