Tuesday, January 24, 2017

অপরিণামদর্শীরা কি শুধু এনসিটিবির চার দেয়ালেই বাস করেন?

জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় এ দেশে মাধ্যমিক ও নিন্ম মাধ্যমিক পর্যায়ের সব পাঠ্যপুস্তকের প্রকাশক এনসিটিবি। সরকারের এ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটি পুস্তক প্রকাশের সব আয়োজন করে থাকে। পুস্তকের কারিকুলাম তৈরি এবং পুস্তক রচনা ও সম্পাদনার জন্য লেখক এবং সম্পাদক তথা সম্পাদকমণ্ডলী নির্বাচন, রচনা ও সম্পাদনার তত্ত্বাবধান ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদান, মুদ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালনসহ সবকিছুর মূল দায়িত্ব এনসিটিবির। এনসিটিবিতে আছেন পদাধিকার বলে সম্পাদক, বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা। তারা পুস্তক প্রণয়ন ও সম্পাদনার কমিটিগুলোর সঙ্গে যুক্ত থেকে সার্বিক সহযোগিতা করে থাকেন। আবার প্রকল্প আকারের কর্মযজ্ঞে কোনো বড় বিশেষজ্ঞ সবার মাথার ওপর থাকেন। একাধিক শিক্ষকও কমিটি তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব পালন করেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে- পুস্তক রচনা, সম্পাদনা ও মুদ্রণ পর্যন্ত শুধু এনসিটিবির কর্মকর্তারাই নন, নির্বাচিত লেখক-সম্পাদকসহ অনেকেই যুক্ত থাকেন। তবুও ফি বছর নানা রকম ভুল-ত্রুটির কথা সামনে চলে আসে। এবারের ভুলগুলো বহুমাত্রিক এবং শংকা তৈরি করার মতোও বটে। যে কারণে এনসিটিবির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে; যদিও যে কর্মযজ্ঞে নানা অবস্থানের মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে সেখানে সবারই জবাবদিহিতা প্রয়োজন। বই লেখা, সম্পাদনা ও মুদ্রণের সঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে যারা যুক্ত আমি শুধু তাদের কথাই বললাম। তবে দৃশ্যান্তরে আরও অনেক শক্তিমান নীতিনির্ধারক থাকেন। মন্ত্রণালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকেও নির্দেশ আসে। এসব হিসাবে না রাখলে প্রকৃত সংকটের চরিত্র বোঝা যাবে না, রহস্যও উন্মোচিত হবে না। এর মধ্যে পত্রিকান্তরে জানলাম ভুল বা বিভ্রান্তিগুলোর জন্য নিজেরা দায়ী নন বলে শ্রদ্ধেয় লেখক ও সম্পাদকরা বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন। তবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কারণে কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। লেখক-সম্পাদকদের অবহিত না করে বইয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা,
রাজনৈতিক কারণে লেখকদের না জানিয়ে অনেক জায়গায় সংস্কার এনে পক্ষান্তরে লেখকদের ঘাড়ে দায় চাপানোর উদাহরণ এনসিটিবির রয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগ করে, নাকি আরও শক্তিশালী মহল থেকে আদিষ্ট করে থাকে তা আমার জানা নেই। যদি দ্বিতীয়টি ঘটে থাকলে লেখক-সম্পাদক মহোদয়দের প্রতি আমাদের সমবেদনা রইল। আমি একাধিকবার এনসিটিবির কারিকুলাম তৈরি, পুস্তক প্রণয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। ফলে আমার কাছ থেকে দেখার ও বোঝার কিছুটা সুযোগ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- পুস্তক প্রণয়নে কী কী আলোকচিত্র যাবে, শিল্পীকে দিয়ে কী ছবি আঁকানো হবে তা এনসিটিবির বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে আমরা লেখক-সম্পাদকরা পরামর্শ দিতাম। অংকিত ছবি আর আলোকচিত্র অনুমোদনে আমরা চূড়ান্তভাবে ভূমিকা রাখতাম। এ কারণে আমার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, গাছ থেকে ছাগলের আম আর আমপাতা খাওয়ার ছবি আঁকার জন্য চিত্রশিল্পী শাস্তি পাবেন কেন? তিনি নির্দেশনামতো তার চিন্তা থেকে এক বা একাধিক ছবি এঁকে দিতেই পারেন। চূড়ান্তভাবে বইতে ছাপার অনুমোদন যেখান থেকে হয়েছে প্রশ্ন তুলতে হবে তো সেখানে। আলোচিত কুসুমকুমারী দেবীর কবিতায় যদি মুদ্রণজনিত দু-একটি ভুল থাকত, তাহলে মানা যেত প্রুফ দেখার দায়িত্ব যাদের ওপর ছিল তাদের চোখ এড়িয়েছে; কিন্তু এখানে একাধিক লাইন এলোমেলো হয়ে গেছে। কোথাও এলোমেলোর কারণে অন্তমিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এসব তো সম্পাদনা পরিষদ এবং সবশেষে এনসিটিবির সম্পাদকের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। নাকি সব ঠিক করার পরও ট্রেসিং বের করার আগে কেউ সব উল্টে দিল? তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, ভয়ানক একটি স্যাবোটাস হয়ে গেল বোধহয়। লেখক-সম্পাদকদের চূড়ান্ত করা পাণ্ডুলিপি নিশ্চয় এনসিটিবিতে সংরক্ষিত আছে। তবু ভালো, শব্দ এলোমেলো হয়েছে-অসৎ উদ্দেশ্যে কবিতার লাইন পাল্টে দেয়া হয়নি। যেমন পাকিস্তান আমলে কাজী নজরুল ইসলামের ‘সজীব করিব মহাশ্মশান’কে আমরা পড়তে বাধ্য হয়েছিলাম ‘সজীব করিব গোরস্থান’। কিন্তু ‘ও’ তে ‘ওলকচু’ না শিখিয়ে ‘ওড়না’ শেখানোর তাড়না হল কেন বোঝা গেল না। ‘অ’ তে ‘অজগর’ পাল্টে দিয়ে ‘অজ’ ব্যবহার নিয়ে আমার মধ্যে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। অজগর বাদ পড়ল কেন? ভয়ংকর কোনো প্রাণীর কথা বলে বাচ্চাদের মনে ভয় ধরানো যাবে না- এ বিবেচনায় কি? তাহলে তো বাঘ, ভালুক, হাঙর কোনো কিছুর সঙ্গেই বাচ্চাদের পরিচয় করানো যাবে না। পাশাপাশি ‘ছাগল’-এর পরিবর্তে ‘অজ’-এর মতো অপ্রচলিত শব্দ যা বাঙালি শিশুর না জানা থাকলে কোনো ক্ষতি হবে না, তা কেন? অন্যদিকে আজকের প্রজন্মের কাছে হারাতে বসা ‘ওলকচু’ শেখানোটা কি জরুরি বেশি ছিল না?। ‘ওড়না’ শেখানোর চেয়ে নিশ্চয় বেশি জরুরি ছিল। আমি জানি না, রহস্যাবৃত এনসিটিবির চার দেয়ালে বসে কোন পক্ষ এর দায় নেবে? ওড়নাকেও না হয় ছেড়ে দিলাম। একটি বর্ণ শেখানো ছাড়া তো কিছু নয়! কিন্তু পত্রিকা থেকে জানলাম হেফাজত ইসলাম বলে এক মৌলবাদী দলের নেতারা স্কুলের পাঠ্যবইয়ের নানা সংস্কার দাবি করেছিলেন। নতজানু নীতি নিয়ে সেগুলোর ১৭টি নাকি মানা হয়ে গেছে। তাই এ সংগঠন তাদের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। দুর্ভাগ্য এই যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এমন লাঞ্ছনা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই হল! তাহলে বিশ্বাস করতে হয় সরকারের চেয়েও শক্তিশালী পক্ষ রয়েছে। তাই আমরা ধোঁয়াটে অবস্থায় আছি। যদি অভিযোগটি সত্য হয়ে থাকে তবে এর দায় কে নেবেন? এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ? লেখক-সম্পাদক? তত্ত্বাবধায়ক বিশেষজ্ঞমণ্ডলী? নাকি সরকারের ভেতরের অদৃশ্য শক্তি? এনসিটিবি বা সরকারের বিশেষ মহলের পুরনো অভ্যাস আছে লেখক-সম্পাদকদের দ্বারা চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হওয়ার পরও কোনো অদৃশ্য হস্তক্ষেপে অনেক কিছু পাল্টে দেয়ার। এবার লেখক-সম্পাদকদের প্রতিবাদ-বিবৃতি দেখে এমন আশংকাই প্রবল হয়েছে। পত্রিকায় লেখক-সম্পাদকদের যে নামের তালিকা দেখলাম তারা সবাই বরেণ্য ব্যক্তি। অমন চাপিয়ে দেয়া বিষয়ে তাদের আত্মসমর্পণ করার কথা নয়। প্রতিবাদ করে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়ার কথা ছিল; কিন্তু তেমন তো ঘটেনি। এ কারণে আমার মনে হয়, সম্পাদক-লেখকদের আরও স্পষ্ট করে জনসম্মুখে বক্তব্য উত্থাপন করা প্রয়োজন। তাদের চূড়ান্তভাবে সম্পাদনা করা পাণ্ডুলিপি থেকে সব উধাও করে হেফাজতি প্রেসক্রিপশন কীভাবে যুক্ত হল তা জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া উচিত। বিষয়টি একেবারেই হালকাভাবে নেয়া যাবে না। এ দেশের লাখ লাখ ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে কওমি মাদ্রাসায়। এসব মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন ছিল। বলা হতো এ শিক্ষাক্রম অনেক ক্ষেত্রে বাঙালি চেতনাকে ধারণ করে না। দেশের সাধারণ শিক্ষার ধারা থেকে অনেকটা দূরে কওমি কারিকুলাম। এসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে একটি আধুনিক শিক্ষার সাধারণ চাহিদামতো সমন্বিত সিলেবাস কওমি মাদ্রাসায় যুক্ত করার দাবি অনেক দিনের; কিন্তু কওমি মাদ্রাসার ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব আরোপ করা সম্ভব হয়নি। এখন তো দেখা যাচ্ছে, কওমি মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক হেফাজতিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে। আসলে ভূত নিয়ন্ত্রিত বহু সর্ষে সরকারের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি দুটো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এনসিটিবির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এতে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। তাই যখন এতসব ভুল বা অন্যায়ের জন্য এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের ওপর ঢালাওভাবে দোষ চাপানো হয় এবং অন্যরা গায়ের কাদা পরিষ্কার করে ধোপ-দুরস্ত থাকেন, তখন ভেতর থেকে একটি প্রতিবাদ উঠে আসে। আমি দেখেছি এনসিটিবি থেকে প্রকাশিত বই ছাত্রছাত্রীদের হাতে চলে যাওয়ার পরও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য লেখক-সম্পাদকদের অজ্ঞাতে সরকারি গোপন সংস্কার কমিটি ইতিহাস লিখন পদ্ধতির ধার না ধেরে কাটাকুটি করে বিকলাঙ্গ বানিয়ে তা আবার মুদ্রণ করেছে। বইয়ে ছুরি-কাঁচি চালানেওয়ালাদের নাম থাকছে না, দায় বহন করতে হয়েছে লেখকদেরই। এ দেশে অনেক কিছুই হয়। রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে গোপন সংস্কার কমিটি নিজ দল বা সরকারের আদর্শে একই বইয়ের বারবার সংস্কার করে; কিন্তু ছাপা হয় পুরনো লেখকদের নামেই, তাদের অজ্ঞাতে। একজন সচেতন পাঠক মনোযোগ দিয়ে পড়লে বিস্মিত হবেন- একই লেখক বারবার কেমন করে এত কথা পাল্টান। আরও বৈচিত্র্য আছে।
কখনও দীর্ঘ পরিশ্রম ও পরিমার্জনার পর প্রকাশের জন্য প্রস্তুত হল বই। অনুমোদনও হয়ে গেল। শ্রান্ত লেখক-সম্পাদকরা বাড়ি ফিরে গেলেন। তারপর ভয়ানক ঝড় বয়ে গেল এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। কোনো প্রবল প্রভাবশালী এত বড় জাতীয় কার্যক্রমে অংশ না নিতে পেরে ভয়ানক ক্ষেপে গেলেন। এ ঝড় থামানোর ক্ষমতা নেই এনসিটিবি বা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। সুতরাং আবার নতুন করে সম্পাদনা কমিটি গঠন করা হল প্রতাপশালীদের নিয়ে। লেখকদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করে ক্ষোভের ভূমিকম্প ওঠানো হল। লেখকদের কাছে না পাঠিয়ে বৈধতা না থাকলেও তারাই কারিকুলামের ছক পাল্টে ফেললেন। লেখকদের এতদিনের পরিশ্রমের পাণ্ডুলিপি কেটেকুটে পঞ্চাশ থেকে আশি ভাগ ফেলে দিলেন। নানা ভুল-ভ্রান্তিসহ নিজেদের লেখা ঢুকিয়ে দিয়ে লেখকদের শাস্তি দিলেন। মুদ্রিত বইতে লেখকের নাম অপরিবর্তিত থাকায় ভুল আর ভ্রান্তির দায় বহন করতে হল নিরীহ লেখকদেরই। তারা প্রতিবাদ করে এনসিটিবি ও মন্ত্রণালয়কে প্রতিবাদলিপি দিলেও জনগণের কাছে অজানাই রয়ে গেল ঘটনা। আমি জানি, এটি অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে; কিন্তু বিশ্বাস না করে উপায় নেই। এনসিটিবির চার দেয়ালেই শুধু নয়, অপরিণামদর্শীরা ছড়িয়ে আছে সরকারের নীতিনির্ধারণী নানা পর্যায়ে। এসব জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার মতো রাজনৈতিক কারণে শিক্ষানীতি নিয়ে এমন স্বেচ্ছাচার কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে কিছু সত্য সামনে আনার ইচ্ছে আছে আগামী সপ্তাহের লেখায়। যদি তা নীতিনির্ধারকদের ভবিষ্যৎ ভাবনায় কাজে লাগে!
এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnaway7b@gmail.com

No comments:

Post a Comment