মিয়ানমার
সরকারের গঠিত একটি কমিশন দাবি করেছে, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের
বিরুদ্ধে গণহত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কমিশন তাদের অন্তর্বর্তীকালীন
প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গণধর্ষণের যে অভিযোগ উঠেছে, তার সমর্থনেও যথেষ্ট
প্রমাণ নেই। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যার
যে অভিযোগ রয়েছে, সে বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। খবর বিবিসির।
অক্টোবর মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান
শুরুর ঘোষণা দেয়ার পর থেকে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কায়দায়
নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। অনেকের মতে, রোহিঙ্গাদের নির্মূলে অভিযান
চালাচ্ছে মিয়ানমার। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র নিন্দার মুখে রয়েছেন অং
সান সুচি। মিয়ানমার সরকার সাবেক জেনারেল মাইয়িন্ট সোয়ের নেতৃত্বে তদন্ত
কমিশন গঠন করে।
জানুয়ারি মাস শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন
দেয়ার কথা রয়েছে। অর্ন্তবর্তীকালীন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যেহেতু
রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে এবং তাদের ধর্মীয় স্থাপনাগুলো ধ্বংস
করা হয়নি, সেহেতু সেখানে গণহত্যা হয়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা
গণধর্ষণের অভিযোগেরও যথেষ্ট প্রমাণ পায়নি তারা। এতে আরও বলা হয়েছে, ৪৮৫ জন
বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে
বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। অগ্নিসংযোগ, গণগ্রেফতার ও নির্যাতনের
অভিযোগ এখনও খতিয়ে দেখছে কমিশন। আশ্চর্যজনকভাবে, আটক অবস্থায় মিয়ানমার
নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নির্যাতনে বন্দি মৃত্যুর বিষয়ে কমিশনের কোনো
মন্তব্যই নেই। অর্থাৎ বিষয়টি তাদের আমলেই নেই বলে জানান বিবিসির মিয়ানমার
প্রতিনিধি জোনাথ ফিসার। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা
বাহিনীর দাবি, রোহিঙ্গাদের দমনে আইন মেনেই অভিযান চালানো হয়। যদিও
স্যাটেলাইট ইমেজ থেকে বিভিন্ন গ্রামে অগ্নিকাণ্ড সংঘটনের প্রমাণ মিলেছে।
এছাড়া দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ, বাছ-বিচারহীন
হত্যার মতো ভয়াবহ সব অপরাধ চালানোরও অভিযোগ রয়েছে। রাখাইন রাজ্যের সংকট তিন
মাস ধরে চলছে। বর্তমানে পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও তা যেকোনো সময়
আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে
পড়া একটি রোহিঙ্গা নির্যাতনের ভিডিও গেল সপ্তাহে প্রথমবারের মতো আমলে নেয়
মিয়ানমার সরকার। ওই ভিডিও দেখে চারজন পুলিশকেও গ্রেফতার করা হয় বলে জানা
যায়। এদিকে রাখাইন রাজ্যে সাংবাদিক এবং তদন্তকারীদের প্রবেশে বাধা দেয়া
হচ্ছে।
এ কারণে সেখানকার স্পষ্ট পরিস্থিতি তুলে ধরা যাচ্ছে না। বিবিসির
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমকে মিয়ানমারের বৌদ্ধ
সম্প্রদায় জোর করে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। মিয়ানমার সরকার
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের
অন্যতম আদিবাসী সংখ্যালঘু। কিন্তু দেশটির সরকার তাদের আসল জাতীয়তা অস্বীকার
করে তাদের ‘বাঙালি’ বা বাংলাদেশ থেকে আগত অবৈধ অভিবাসী আখ্যা দিয়ে আসছে।
নাগরিকত্ববঞ্চিত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০১২ সালে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা
শুরু হয়। এতে এক লাখ ২০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। গত
বছরের অক্টোবরের পর থেকে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা
পালিয়ে এসেছেন বলে দাবি করেছে গার্ডিয়ান। গত সপ্তাহে ১২ জনেরও বেশি নোবেল
বিজেতা এ সংকটে অং সান সুচির ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে একটি বিবৃতি
প্রকাশ করেন। এতে বলা হয়, এ ধরনের অভিযানের ফলে জাতিগত নিপীড়ন ও
মানবতাবিরোধী অপরাধের মাধ্যমে ইতিহাসের কোনো বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটে যাওয়ার
আশংকা রয়েছে।

No comments:
Post a Comment