গুলশান
ডিএনসিসি মার্কেটের সামনে আহাজারি যেন কিছুতেই থামছিল না। তিল তিল করে গড়া
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান-দোকান আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছিল। বিধ্বংসী আগুনের শিখার
সঙ্গে মিশে গেছে দোকানে থাকা সব ধরনের মালামাল, ক্যাশ বাক্সও। সেইসঙ্গে
পুড়ে ছাই হয়ে গেছে স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। আগুনে সর্বস্ব খোয়ানো শত শত দোকান
মালিক, কর্মচারী ও তাদের পরিজনের আহাজারি চলছিল।
কেউ কাউকে সান্ত্বনা দিতে
পারছিলেন না। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছড়ে পড়ছিলেন বুকফাটা কান্নায়। এ দৃশ্য
দেখে সাধারণ মানুষও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৯টায় ডিএনসিসি
মার্কেটের উত্তর পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন মমতাজ
বেগম। স্বামী শহিদুল ইসলাম বুক থাপড়াচ্ছিলেন। সায়মা ও সাজ্জাদ এন্টারপ্রাইজ
নামে দুটি দোকান রয়েছে তাদের। ৪ সন্তানকে ঘুমে রেখে ভোররাতে ছুটে এসেছেন
তারা। চোখের সামনে স্বপ্নের দোকান পুড়ে ছাই হলেও কিছুই করতে পারছেন না।
কারণ, তাদের দোকানগুলো মার্কেটের মাঝখানে। মমতা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে
বললেন, ‘আমাদের সবকিছু শেষ। চোখের সামনে দোকান পুড়ছে। গ্রামের জায়গা-জমি,
নিজের বিয়ের গহনা বিক্রি করে তিল তিল করে এ দোকানগুলো গড়েছি। সন্তানদের
নিয়ে ঢাকায় থাকি, এখন সর্বস্ব হারিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে হবে। সন্তানদের
পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যাবে। ঋণগ্রস্ত হয়েছি প্রায় ১৭ লাখ টাকা। এত টাকা কী করে
পরিশোধ করব।’ পাকা মার্কেটের নিচতলা ও ওপর তলায় দুটি দোকান রয়েছে রওশন আরা
নামের এক ব্যবসায়ীর। নিচতলার তালাল ট্রেডিং দোকানটি চোখের সামনে পুড়তে
দেখেছেন। দ্বিতীয় তলার ৯৫নং দোকানটি মঙ্গলবার বিকাল ৫টা নাগাদ পুড়ছিল।
কিছুই করার ছিল না তাদের। রওশন আরা বলেন, এ মার্কেটেই তিনি ৭ বছর নিজে
ব্যবসা করেছেন।
এখন কিছুটা অসুস্থ। শ্রমিক-ম্যানেজার দিয়ে দোকানগুলো
চালাচ্ছিলেন। প্রায় ২ কোটি টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। ভবিষ্যতে কী করবেন-
বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ফাতেমা ও কলি আক্তার নামের দু’জন শ্রমিক
হা-হুতাশ করছিলেন। এদিক-ওদিন দৌড়াচ্ছিলেন। বুকফাটা কান্নায় কলি আক্তার
বলছিলেন, ‘এখন আমাদের কী হবে, কী করে খাব। কেমনে সন্তানদের পড়াব।’ পাশে
দাঁড়িয়ে থাকা মো. ফরিদ নামক এক যুবক মোবাইল ফোনে কথা বলছেন আর কাঁদছেন।’
জানালেন, এ মার্কেটে øিগ্ধা ইলেকট্রিক, সোলটার্চ ও মামস্ চয়েচ নামে তিনটি
দোকান রয়েছে তাদের। যার দুটির ম্যানেজার তিনি (ফরিদ)। কেউ কেউ কিছু মালামাল
উদ্ধার করতে পারলেও তারা একটি মালও উদ্ধার করতে পারেননি। ফাতেমা আক্তার
জানান, স্বামী ও এক সন্তান ভীষণ অসুস্থ। সোলটার্চ দোকানে চাকরি করে তিনিই
সংসার চালান। ৬ বছর ধরে দোকানটিতে চাকরি করছেন। আজ চোখের সামনে সেই দোকান
পুড়ছে। সন্তান আর শ্রমিকদের মই দিয়ে উঠিয়ে ওয়াল ছিদ্র করে দোকানের ভেতরে
থাকা মালামাল উদ্ধার করার চেষ্টা করছিলেন আফরোজা ভূঁইয়া নামে এক মহিলা।
চারদিকে যখন আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। ঠিক সে সময় তার স্বামী, সন্তান ও
শ্রমিকরা মিলে রাস্তামুখী মার্কেটের দ্বিতীয় তলার ওয়াল ভেঙে ছিদ্র করছিলেন।
আফরোজা বলেন, ‘কাঁদতে কাঁদতে চোখে-বুকে পানি নেই।
দ্বিতীয় তলার সাদিয়া
টেইলার্স দোকানটি আমাদের। ২০টি মেশিনসহ কাপড়-চোপড়ে ভরা ছিল দোকান। ২০-২২ জন
কারিগর ছিলেন। নতুন বছর উপলক্ষে ২০ লাখ টাকার মালামাল তুলেছিলাম। এখন সবই
পুড়ে ছাই হচ্ছে। ২০ লাখ টাকার ওপরে ঋণ আছে। তিন মেয়ে পড়াশোনা করছে, তাদের
কী করে পড়াব।’ খেলাধুলার সামগ্রী বিক্রিতে মালেক অ্যান্ড সন্স নামের
দোকানটির পরিচিতি ছিল খুব। দোকানটির মালিক দেলোয়ার হোসেন জানান, ‘প্রায়
কোটি টাকার মালামাল ছিল দোকানটিতে। এ ব্যবসা দিয়েই বোন-ভাই, মা-বাবা আর
স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে ছিলেন তিনি। পরিবারের মেয়ে-ছেলেদের
বিয়েশাদি, পড়াশোনা সবই এ ব্যবসার কল্যাণেই হয়ে আসছিল। গত রোববার ৫০ লাখ
টাকার মালামাল তুলেছিলেন তিনি। পুরো দোকানটি মালামালে ভর্তি ছিল। এখন সবই
শেষ। শেষ আমাদের জীবনও। তিনি বলেন, ৩ বারে ৭০ লাখ টাকা ঋণ করেছেন। এ বছর
ব্যবসা করতে পারলে পুরো টাকা পরিশোধ করতে পারতেন। তার কোনো ইন্স্যুরেন্স
নেই জানিয়ে বললেন, এ মার্কেটের কারোরই তেমন ইন্স্যুরেন্স নেই। তবে ব্যবসায়ী
সমিতি রয়েছে। ছোট্ট দুই সন্তান নিয়ে কাঁদছেন আবদুল সালাম নামে এক
ব্যবসায়ী। তিনি জানান, লিমা এন্টারপ্রাইজ নামে তার একটি ফার্নিচার দোকান রয়েছে। পুরো মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। স্ত্রী-সন্তানকে ঘুমিয়ে রেখে
এসেছেন মালামাল উদ্ধার করতে, কিন্তু পারেননি। রাস্তায় যখন কাঁদছিলেন, দেখেন
স্ত্রী আর ২ সন্তান তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। ছোট্ট মেয়ে লিমা বলছিল,
‘বাবা আস, বাসায় যাই, তুমি ভাত খাবে না।’ এমনটা বলতেই লিমাকে বুকে ছড়িয়ে
কাঁদতে শুরু করলেন স্বামী-স্ত্রী।
নাইনা এন্টারপ্রাইজ নামের দোকানের মালিক
মো. ইসমাইল জানান, বিয়ের পর থেকেই তিনি এ মার্কেটে ব্যবসা করছেন।
স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। তার দোকানটি ক্যালকাটা
এন্টারপ্রাইজ নামেও পরিচিত ছিল। ভারতীয় থ্রি-পিসসহ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন রকম
পোশাক ছিল দোকানটিতে। বাবার দেয়া জায়গা বিক্রি করে এ দোকানটি গড়েছিলেন।
এখন পথে বসতে হবে জানিয়ে বললেন, ইদানীং ব্যবসা ভালো হচ্ছিল না। ঋণ করে
মালামাল ওঠানোসহ সংসার চালাতেন। ২২-২৫ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। পাইকার ও
ফড়িয়াদের কাছে পড়ে আছে প্রায় ৭০-৮০ লাখ টাকা। দোকান চালু না থাকলে এসব টাকা
পাওয়া যাবে না। মো. ইউসুফ নামের এক ব্যবসায়ী রাস্তায় বসে শিশুর মতো
কাঁদছিলেন। আগুনের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় কাশতে কাশতে লুটে পড়ছিলেন। ওই অবস্থায়
কান্নাকণ্ঠে বললেন, ভাই ভাই ক্রোকারিজসহ তার ৫টি দোকান ছিল। সব কটি দোকানই
পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ডিসেম্বর মাস হওয়ায় প্রতিটি দোকানেই মালামাল ভর্তি ছিল।
বিশেষ ডিসকাউন্টে এসব মালামাল বিক্রি করার কথা ছিল। মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে
৫টা পর্যন্ত যখন কাঁচাবাজার, পাকা বাজার মার্কেটি পুড়ছিল তখনও কোনো কোনো
ব্যবসায়ী-শ্রমিক রাস্তা ঘেঁষা দোকানগুলো থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালামাল
উদ্ধার করার চেষ্টা করছিলেন। পাশের গুলশান শপিং সেন্টারের দোকানগুলো থেকে
মালামাল নামিয়ে রাস্তায় রাখছিলেন ব্যবসায়ী-শ্রমিকরা। রাস্তাজুড়ে মালামাল
রাখা হচ্ছে। রাস্তায় রাখা মালামাল পাহারা দিতে দেখা গেছে পরিবারের সদস্য
তথা নারী-শিশুদের। বেবী আক্তার নামের এক মহিলা জানান, তাদের দোকানের
মালামালের কিছু রাস্তায় রাখা হয়েছে। এখন এ মালামাল কোথায় রাখবেন, ২ রুমের
ছোট্ট একটি বাসায় ভাড়া থাকেন তারা। উদ্ধার হওয়া মালামালের অধিকাংশই পুড়ে
গেছে জানিয়ে অপর এক ব্যবসায়ী জানান, মধ্যরাত থেকে এখন বিকাল, আগুন তো
নিয়ন্ত্রণে আসেনি। চোখের সামনেই পুরো মার্কেট জ্বলছে। ৭শ’র ওপরে দোকান
জ্বলেই যাচ্ছে।
পুরো মার্কেটটি ধসে যাচ্ছে, চোখের সামনে। আরেক ক্ষতিগ্রস্ত
ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান। এই মার্কেটে তাদের চার ভাইয়ের আটটি দোকান ছিল।
ঘটনাস্থলের পাশে দাঁড়িয়ে মার্কেট থেকে বের হওয়া ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখছিলেন
তারা। আগুনে সর্বস্ব হারিয়ে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। তাদের
দোকানে ছিল ক্রোকারিজ, রেক্সিন ও ফ্লোরম্যাট। কাঁদতে কাঁদতে মাহবুব বলেন,
‘দোকান থেকে কিছুই বের করতে পারিনি। চোখের সামনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’
ময়মনসিংহ সদরের দাপুনিয়ার মাহবুব আঠারো বছর আগে এ মার্কেটে ব্যবসা শুরু
করেন। তার দেখাদেখি অন্য ভাইয়েরাও চাকরি ছেড়ে এখানে এসে ব্যবসা শুরু করেন।
সব হারিয়ে চার ভাই এখন নিঃস্ব। বিকাল ৫টার দিকে দেখা গেছে, মার্কেটটি ঘিরে
থাকা প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে বিভিন্ন মালামাল জড়ো করে রাখা হয়েছে।
শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে গৃহসজ্জার আধুনিকসব মালামাল সড়ক ও আইল্যান্ডের ওপর
অবিন্যাস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বুকফাটা কান্নার সঙ্গেই জড়িয়ে
ছিল চড়া অভিযোগের সূর। কেননা আগুন নিয়ন্ত্রণে আসছে না। আগুন সবকিছু পুড়িয়ে
নিজেই নিয়ন্ত্রণের দিকে যাচ্ছে, নিভছে।

No comments:
Post a Comment