পাকিস্তানি
নাগরিক পরিচয়ে কাশিমপুর-২ কারাগারে মুক্ত কয়েদি (রিলিজড প্রিজনার) হিসেবে
বন্দি রয়েছেন মো. আলী নামের এক ব্যক্তি। অনুপ্রবেশের মামলায় সাজা হয়েছিল
তার। ২০০৫ সালের ১১ নভেম্বর তিনি কারাবন্দি হন। সাজা হয় পরের বছরের ৩১
জানুয়ারি। আর সাজার মেয়াদ শেষ হয় ২০০৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। এর পরও প্রায়
১১ বছর ধরে তিনি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, কনভিকশন
ওয়ারেন্টে তার নাম ও ঠিকানা ভুল লেখা ছিল। কারা অধিদফতর সূত্র জানায়,
পাকিস্তানের দূতাবাসে তার নাম-ঠিকানা পাঠানো হয়েছিল। দূতাবাস ওই ঠিকানা
অনুসারে কোনো পাকিস্তানি নাগরিক আছে বলে চিহ্নিত করতে পারেনি। আসলে ওই
বন্দির প্রকৃত নাম মহেন্দার প্রসাদ ওরফে মুকেশ। ভারতের বিহারের বোকারো রাচি
জেলার জাহানাবাদ থানা এলাকায় মুরলিধর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের ১৯০৫
নম্বর বাড়িটি তার। অপর একটি মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনুপ্রবেশের
অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ২০০৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কারাগারে প্রবেশ করেন
ভারতের বাসিন্দা সুমন দাস। পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগনা জেলার খরদা থানার
মহিন্দ্র নগর গ্রামে তার বাড়ি।
২০০৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তার সাজার মেয়াদ
শেষ হয়। এরপর সাড়ে ৮ বছর ধরে কাশিমপুর-২ কারাগারে মুক্ত কয়েদি হিসেবে বন্দি
রয়েছেন তিনি। অনুসন্ধানে জানা যায়, কনভিকশন ওয়ারেন্টে দেয়া তার
নাম-ঠিকানায় বর্তমানে কেউ থাকে না। তার মা-বাবা, ভাই-বোন কোথায় আছেন তাও
কেউ জানে না। পূর্ণ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করতে না পারায় তাকে ফেরত পাঠানো
যাচ্ছে না। শুধু মুকেশ কিংবা সুমন দাসই নন। ভারত-পাকিস্তানসহ চারটি দেশের
৮৪ জন নাগরিক সাজা শেষে মুক্ত কয়েদি (রিলিজড প্রিজনার) হিসেবে বাংলাদেশের
বিভিন্ন কারাগারে আটক আছেন। আইনি জটিলতার কারণে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত
পাঠানো যাচ্ছে না। এদিকে মুক্ত কয়েদি হিসেবে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন।
তাদের মরদেহ এখনও হিমঘরে পড়ে আছে। জানা গেছে, বিদেশী বন্দিদের ক্ষেত্রে
প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মানবতার স্বার্থে চিঠি চালাচালি বন্ধ রেখে আদালত, মন্ত্রণালয়, জেল
কর্তৃপক্ষ, আইনজীবী ও আইনশৃংখলা বাহিনীর মধ্যে দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে এর
একটা সুষ্ঠু সুরাহা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে,
কারাগারে মানবতা ধুকে ধুকে কাঁদছে। দেখার কেউ নেই। আইনি জটিলতায় লঘু পাপে
তাদের গুরুদণ্ড পেতে হচ্ছে। জানতে চাইলে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (প্রশাসন)
আবদুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, ‘সাজা ভোগের পর ৮৪ জন বিদেশী মুক্ত
কয়েদি হিসেবে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি আছেন। বিদেশী বন্দিদের মধ্যে
চার-পাঁচজন পাকিস্তানি ও কয়েকজন আফ্রিকান রয়েছেন। বাকিরা সবাই ভারতীয়
নাগরিক। সাজার মেয়াদ শেষ হলেও বিদেশী নাগরিক হওয়ায় তারা মুক্তি পাচ্ছেন না।
কারণ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ছেড়ে দেয়ার ক্ষেত্রে আইনগত বিধিনিষেধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের সম্মতি পাওয়া গেলে তাদের হস্তান্তর করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘সাজা শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে কারাগার থেকে আমাদের (কারা
অধিদফতর) কাছে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়।
এরপর আসামির প্রত্যাবর্তনের
জন্য কারা অধিদফতর থেকে বিস্তারিত তথ্য (ডিআর ফরম পূরণ করে) স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে
পাঠায়। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা সংশ্লিষ্ট অ্যাম্বাসিতে (দূতাবাস)
পাঠায়। পরে সংশ্লিষ্ট দেশ ওই আসামির নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে একটা
ক্লিয়ারেন্স অ্যাম্বাসির মাধ্যমে আবার আমাদের কাছে (কারা অধিদফতর) পাঠায়।
এরপর বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে মুক্ত কয়েদিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো
হয়।’ তিনি বলেন, ‘এ প্রক্রিয়া (রিলিজড প্রিজনার প্রত্যাবর্তন) সম্পন্ন করতে
দীর্ঘ সময় লেগে যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অ্যাম্বাসিগুলো তাদের দেশের
নাগরিক শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। এমন অনেক ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন যারা ১০
বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে মুক্ত কয়েদি হিসেবে বন্দি রয়েছেন যারা শুধু ওই
প্রক্রিয়ার কারণেই আটক আছেন। এদিকে অনেক মুক্ত কয়েদি আছেন যাদের
আত্মীয়স্বজন গরিব ও ফিরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞ। সংশ্লিষ্ট দেশের
কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা যে স্বজনদের ফিরিয়ে নেবেন সেটাও তারা
করতে পারছেন না। তবে নিতান্তই যারা গরিব আমরা চেষ্টা করি তাদের পার করে
দেয়ার জন্য। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার মাঝে পড়ে গেলে আমাদের কিছু করার থাকে
না।’ তিনি আরও জানান, অন্যান্য দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট
অ্যাম্বাসি তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু ভারতীয় যারা গরিব তারা পড়ে থাকে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অ্যাম্বাসির উদাসীনতা অনেকটা দায়ী।
কারা অধিদফতর
সূত্র জানায়, জাল মুদ্রা, মাদক ও অনুপ্রবেশের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন
সীমান্ত এলাকা থেকে এসব মুক্ত কয়েদিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। মামলায় পরে
তাদের কারাদণ্ড হয়। বিদেশী নাগরিকদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে
কাজ করছেন তাহমীনা আক্তার হাসেমী। প্রায় অর্ধশত মুক্ত কয়েদিকে তাদের নিজ
নিজ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। জানতে চাইলে
যুগান্তরকে তাহমীনা হাসেমী বলেন, ‘সাজাভোগ কিংবা খালাসের পর কাউকে এক ঘণ্টা
আটক রাখা অমানবিক। মানবতার স্বার্থে এই প্রত্যাবর্তন (বিদেশীদের নিজ দেশে
ফেরত পাঠানো) যতটা দ্রুত করা যায় ততই মঙ্গল। রিলিজড প্রিজনারদের মুক্তির
প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ। এ দীর্ঘ প্রক্রিয়া দ্রুত সমন্বয় করে এটার সমাধান করা
উচিত। চিঠি চালাচালি বন্ধ রেখে আদালত, মন্ত্রণালয়, জেল কর্তৃপক্ষ, আইনজীবী
ও আইনশৃংখলা বাহিনীর মধ্যে একটা সমন্বয় থাকা দরকার। সাজাভোগের পর বিদেশী
হওয়ার কারণে কয়েদি বের হতে পারবে না- এটা হতে পারে না।
মরদেহ
পড়ে আছে হিমঘরে : অনুপ্রবেশের অভিযোগে ২০১০ সালে কক্সবাজার এলাকা থেকে
গ্রেফতার হন ভারতের নাগরিক কারক মুখার্জী। অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলায় তিন বছর
সাজা হয় তার। সাজা ভোগের পর আইনি জটিলতায় তিনি মুক্তি পাননি। এরপর
কারাগারে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত বছরের ১১ নভেম্বর চিকিৎসার জন্য তাকে
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানেই তার মৃত্যু
হয়। দুই মাস ধরে ওই হাসপাতালের মর্গের হিমঘরেই পড়ে আছে কারক মুখার্জীর
মরদেহ। এ ছাড়া ভারতের আরেক নাগরিক নিজামউদ্দিন মুক্ত কয়েদি হিসেবে ২০১৫
সালের ১ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। ২২ মাস ধরে তার মরদেহ
হিমঘরে আছে।

No comments:
Post a Comment