Saturday, January 14, 2017

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সঙ্কট নিরসনের রূপরেখা নেই: ফখরুল

জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সংকট নিরসনের কোনো নির্দেশনা নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভাষণে দেশের প্রকৃত চিত্র ছিল না দাবি করে তিনি  বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিকে বিভ্রান্ত করেছেন। শুক্রবার বিকালে দলের চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের প্রতিক্রিয়া জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনে আসেন ফখরুল। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে সংকট চিহ্নিত করবেন এবং তা নিরসনের পথের সন্ধান দেবেন। সেটাই ছিল তার জন্য রাষ্ট্র নায়কোচিত কাজ। তিনি তা না করে রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বলেছেন। আমরা তো নির্বাচন অংশ নিতে চাই। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা হতে পারে। সেজন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ একটি সহায়ক সরকারের অধীনে একটি নিরপেক্ষ, সাহসী, যোগ্য নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নির্বাচন। তিনি বলেন, উন্নয়নের কথা বলে, গণতন্ত্রকে হত্যা করে, জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে, একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা জনগণ কোনো দিনই মেনে নেবে না। আমরা এখনও আশা করি, প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র ধ্বংস করার একদলীয় শাসন প্রবর্তনের ভয়ঙ্কর রাস্তা থেকে সরে গিয়ে গণতন্ত্রের মুক্ত পথে চলবেন। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবার জন্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আগামী নির্বাচন এবং রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবেন। নতুন আশার আলো দেখাবেন। অন্যথায় জনগণের কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। ফখরুল বলেন, জাতির উদ্দেশে ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী জাতিকে ভ্রান্ত তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ২০১৪-এর ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের কথা বলেছেন, যা সঠিক নয়। ২০১৪-এর ৫ই জানুয়ারি ১৫৩ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছিল। ৫% ভোটার ভোট কেন্দ্রে যায়নি। সারা দেশের মানুষ এবং বর্হিবিশ্ব সেই নির্বাচনকে গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল করেছিল সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে বন্দুকের মুখে জিম্মি করে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি এবং আরও অনেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও সেটা গ্রহণ করা হয়নি। সেই সময়কার তামাশা ও নাটক সকলের মনে থাকার কথা।
ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে এমনভাবে চিত্রায়িত করেছেন যে সকল উন্নয়ন তার দুই দফার সরকারের ৮ বছরেই হয়েছে, যা সঠিক নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভিত্তি তৈরি করতে হয়, এরপর একটি একটি করে ইট লাগাতে হয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দুঃশাসন ও দুর্নীতির কারণে এবং ভ্রান্তনীতির কারণে যে অচল হয়ে পড়েছিল, বিদেশিরা তলাবিহীন ঝুড়ির সঙ্গে তুলনা করেছিল, দুর্ভিক্ষে লাখো মানুষ মারা  গিয়েছিল, সেই অর্থনীতিকে সজীব ও সচল করে তুলেছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে অবরুদ্ধ অর্থনীতিকে তিনি মুক্ত করেছিলেন। বেসরকারি বিনিয়োগ, মুক্তবাজার অর্থনীতি, কৃষিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার, শিল্পে ৩ শিফটের কাজ, সর্বপ্রথম পোশাকশিল্পের উদ্যোগ ও বিদেশে বাজার সৃষ্টি, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার সৃষ্টি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন এবং সচল অধ্যায়ে নিয়ে যায়। সেটাই ছিল ভিত্তি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান অর্থনীতিকে সচল করে। নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসায় বাংলাদেশ আবার স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। পরবর্তী গণতান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক, বৈধ-অবৈধ প্রায় সব সরকারই কমবেশি উন্নয়নে কাজ করে। তিনি বলেন, গত ৮ বছরে ধনী আরও ধনী, গরিব আরও গরিব হয়েছে। নজিরবিহীন দলীয়করণ, প্রশাসন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু করেছে। জবাবদিহির অভাব, অকার্যকর পালার্মেন্ট দুর্নীতিকে লাগামহীন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে অর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ধ্বংসের মুখে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, তিনি দাবি করেছেন তার সরকার শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করেছে  গত ৮ বছর ধরে এ দেশে শিক্ষার কী উন্নতি হয়েছে তা তো জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। জিপিএ-৫ বৃদ্ধি আর ছাত্রছাত্রীদের ফেল না করার নীতি গ্রহণ করে সরকার শিক্ষার গুনগত মানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এ বছর জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক ভর্তি পরীক্ষায় মাত্র ৫.৫২% টিকেছে। পত্র-পত্রিকায় আমাদের অধিকাংশ গ্র্যাজুয়েটদের শিক্ষার মানের যে চিত্র ফুটে উঠছে তাতে লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায়। চকচকে মলাটের রঙিন বই ছাত্রছাত্রীদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এনসিটিবিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভুলে ভরা প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্য পুস্তকের দায়দায়িত্ব এড়াতে পারে না।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সড়ক উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি বলেননি বাংলাদেশের ১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ ও ১ কিলোমিটার ফ্লাইওভার নির্মাণ ব্যয় চীন, ভারত ও যুক্তরাজ্যের চেয়ে কত বেশি। তিনি বলেননি নানা অজুহাতে মেগা প্রজেক্টগুলোর প্রকল্প ব্যয় কয়েকশ গুণ বৃদ্ধি করে মেগা চুরির কী সুবন্দোবস্ত করা হয়েছে। পদ্মা সেতুর প্রকল্প ব্যয় ছিল ১১ হাজার কোটি টাকা আর তা বাড়িয়ে করা হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। মালিবাগ ফ্লাইওভারসহ প্রায় সবগুলো ফ্লাইওভারের প্রকল্প ব্যয় এভাবে কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সরকার মেগা প্রকল্প গ্রহণে বেশি আগ্রহী কারণ এতে তারা মেগা চুরির সুযোগ সৃষ্টি করেন।
>>>মানবজমিন

No comments:

Post a Comment