২০১৬
সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে সফল হয়েছেন রুশ
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উত্তরসূরি হিসেবে
ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছেন
তিনি। প্রতিক্রিয়ায় ওবামা ৩৫ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করলেও পুতিন পাল্টা
পদক্ষেপে যাননি। তিনি কেবল সময় গড়ানোর অপেক্ষা করছেন। ২০ জানুয়ারি হোয়াইট
হাউসের কর্ণধার হচ্ছেন পুতিনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একজন। আর মার্কিন
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাচ্ছেন তারই একজন পুরনো বন্ধুকে।
এই পরিবর্তনের
একটি দিক হচ্ছে পুতিন তার ‘প্রিয় শত্রু’ হিসেবে মার্কিন নেতাকে হারাচ্ছেন।
ভবিষ্যতের যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার শত্রুদেশ হিসেবে ততটা বিবেচিত না-ও হতে
পারে। তাহলে পুতিনের ‘পছন্দনীয় শত্রু’ এখন কে হবে? রুশ শত্রুতার
যোগ্যতাসম্পন্ন আর কোনো পুরুষ নেই। আছেন একজন নারী। তিনি হচ্ছেন জার্মান
চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। পরবর্তীতে পুতিনের উপযুক্ত টার্গেট তাই
মার্কেলই। চলতি বছরের গ্রীষ্মে জার্মানির সাধারণ নির্বাচন। আগ্রাসী রাশিয়ার
বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একমাত্র ইউরোপীয় নেতা হিসেবে টানা চতুর্থ মেয়াদের জন্য
নির্বাচনে লড়বেন অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের মতো
অনেক জার্মান রাজনীতিবিদও পুতিনে মুগ্ধ। ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের
ক্রিমিয়া দখলে নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মস্কোকে শাস্তি দেয়ার দাবিতে
উচ্চকণ্ঠ ছিলেন মার্কেল। গত বছর তিনি ১০ লক্ষাধিক শরণার্থীকে জার্মানিতে
স্বাগত জানিয়েছেন এবং অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোকেও এ ব্যাপারে চাপ দিয়েছেন।
ইউরোপজুড়ে নব্য জাতীয়তাবাদীদের উত্থানের বিপরীতে মার্কেল এখনও ঐক্যবদ্ধ ও
উদারনৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী।
আর রাশিয়ার বিরুদ্ধে বৃহৎ রাজনৈতিক ও
অর্থনৈতিক দুর্গ হিসেবে ইউরোপকে দেখতে চান। এমতাবস্থায় ২০১৬ সালে
যুক্তরাষ্ট্রে হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে যা হয়েছে, ২০১৭ সালে মার্কেলের
সঙ্গেও তেমন খেলা খেলতে চান পুতিন। আর এর লক্ষণ ইতিমধ্যে দৃশ্যমানও হয়েছে।
মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টির কম্পিউটার সার্ভারে হামলা করা রুশ ম্যালওয়ার
‘ফ্যান্সি বিয়ার’ ও ‘সোফাকি গ্রুপ’ নামে পরিচিত। এই ম্যালওয়ারগুলো জার্মান
পার্লামেন্টের কম্পিউটার নেটওয়ার্কেও হামলা করেছে। পার্লামেন্ট সদস্য
অনেকের ব্যক্তিগত তথ্যও চুরি করেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জার্মানিতেও
আমেরিকার নাটক মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের প্রকৃতির দিক দিয়েও আধুনিক
জার্মানির ইতিহাসে সবচেয়ে নোংরা, কঠিন ও কদর্যপূর্ণ প্রচারণা চালু হয়েছে।
আমেরিকান অভিজ্ঞতা জার্মানির জন্য সুবিধা দিতে পারে। রশিয়ার প্রযুক্তিগত
সক্ষমতা ও পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের ধারণা হয়েছে। সবচেয়ে বড় যে ব্যাপার তা
হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। তাদের সাইবার হামলাগুলো এই আদর্শেই পরিচালিত
হচ্ছে। এখানে স্নায়ুযুদ্ধ কালের শিক্ষাও কাজে লাগতে পারে। ১৯৮৯ সালের
পূর্বে জার্মানি যে ‘জারেৎসাং’ কৌশল নিয়েছিল রাশিয়া তার ডিজিটাল ভার্সন
বাস্তবায়ন করছে। ‘জারেৎসাং’ পরিভাষার ব্যাখ্যা একটু কঠিন। এটা এমন এক
রাজনৈতিক অস্ত্র যাকে শরীরের ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপের ফলাফলের সমান্তরাল বলা
যেতে পারে।
এই অস্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে পশ্চিমা মূল্যবোধের মৌলিক কাঠামোকে
ধ্বংস করা হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো ও মুক্ত-অর্থনীতির প্রস্তাবনাকে
মূল্যহীন করা হচ্ছে এবং নির্বাচনী আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ
করা হচ্ছে। পূর্ব জার্মানির স্টাসি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কেজিবি যে
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালাত, তাই এখন নতুন পদ্ধতিতে প্রয়োগ হচ্ছে।
‘জারেৎসাং’এর মাধ্যমে গুপ্ত হত্যা, গুজব ছড়ানো ও যুদ্ধ নিয়ে সন্দেহ তৈরি
করা হতো। রাজনীতিবিদকে ঘুষ দিয়ে আবার তা প্রকাশ করে তাদের অপরাধী বানানো
হতো। সাবেক কেজিবি সদস্য ভ্লাদিমির পুতিন আর তার সহযোগীরা এই ধূর্ত কৌশল
সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। তাই এখন গুজবের পরিবর্তে ‘ভুয়া নিউজ’ ছড়িয়ে দেয়া
হচ্ছে। সাইবার হামলায় তথ্য চুরি করে তা ফাঁস করা হচ্ছে। সেই একই ধরনের
যুদ্ধের জন্য এবারের নিশানা জার্মানি। এই যুদ্ধে কে জিতবে তা সময়ই বলে
দেবে।

No comments:
Post a Comment