সুনামগঞ্জের
দিরাইয়ের বিভিন্ন জলমহাল সরকারের কাছ থেকে মৎস্যজীবীরা লিজ নিলেও তা
ভোগ-দখল করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের লোকজন। ক্ষমতার
প্রভাব খাটিয়ে বিনা বিনিয়োগে অংশীদার হন তারা। তাদের চাহিদা না মেটালে
জলমহাল দখলে যেতে পারেন না লিজ গ্রহীতারা। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসনসহ
স্থানীয় প্রশাসনের কাছে গেলেও প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। দিরাইয়ে জনশ্রুতি
আছে, সেখানে শেখ হাসিনার সরকার চলে না, চলে সুরঞ্জিতের সরকার। ফলে
মৎস্যজীবীরা যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সরকারের কাছ থেকে লিজ নিলেও বিনা
লিজে ভোগ-দখল করেন সুরঞ্জিতের লোকজন। এ জলমহাল দখল নিয়ে সুরঞ্জিত অনুসারীরা
এখন বিভক্ত। তৈরি হয়েছে গ্রুপ-উপগ্রুপ। তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও বিভিন্ন
সময় জলমহালের নীল জল রক্তাক্ত হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার জলে প্রাণ
যায় নিরীহ তিন মৎস্যজীবীর। এদিকে একাধিক গ্রুপে বিভক্ত সুরঞ্জিত অনুসারীদের
অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটতে চান দীর্ঘদিন সুরঞ্জিত সেনের
প্রতিপক্ষ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান। এ কারণে তিনটি খুনের পর
৩২ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও থানায় কোনো মামলা হয়নি। বুধবার দিরাই উপজেলা সদরসহ
জলমহাল তীরবর্তী গ্রামগুলোর লোকজনের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য উঠে আসে।
জলমহাল নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে মঙ্গলবার একরাম বাহিনীর হাতে খুন হন তিনজন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের হাত ধরে রাজনীতিতে অভিষেক হয় একরার হোসেন ওরফে একরাম
হোসেনের। গত ইউপি নির্বাচনে দলীয় সমর্থন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়
একরাম। এরপর থেকে সে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান গ্রুপে যোগ দেয়।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুরঞ্জিত সেন অনুসারীদের কোণঠাসা করার পরিকল্পনায়
ব্যস্ত সে। গুঞ্জন উঠেছে, তিন খুনের মামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ
সম্পাদক প্রদীপ রায়, যুগ্ম সম্পাদক ও পৌর মেয়র মোশাররফ মিয়া, উপজেলা আওয়ামী
লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল আহমদসহ সুরঞ্জিত সেনের ঘনিষ্ঠজনদের আসামি
করা হচ্ছে। উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের ঘোরামারা সাতপাকিয়া জারলিয়া নদী
জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে তিন খুনের ঘটনায় এখন আতংকিত হাওর জনপদ।
একরার হোসেন ওরফে একরামের নেতৃত্বে ১৫০-২০০ লোক বন্দুক, পাইপগান, সুরকি,
লাঠি ইত্যাদি নিয়ে জারলিয়া জলমহাল দখল করতে যায়। অভিযোগ রয়েছে, জলমহাল
দখলের জন্য সিলেট থেকে তার ছোট ভাই এমসি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক বদরুল আজাদ
রানা অস্ত্র ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী জোগান দেয়। এ সময় দক্ষিণ নাগেরগাঁও
মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধনঞ্জয় দাসের লোকজন জলমহালের
খোলাঘরে অবস্থান করছিলেন। প্রতিপক্ষের লোকজন কাছাকাছি এগিয়ে এলে দুই পক্ষে
সংঘর্ষ বাধে। এ সময় হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর ফের সংঘর্ষের আশংকা করছেন
স্থানীয়রা। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ঘনিষ্ঠ মাসুক
মিয়া বলেন, গত কয়েক দিন ধরে একরার জলমহালটি দখলে নেয়ার চেষ্টা করে।
মঙ্গলবার একরার তার ভাই ছাত্রদলের ক্যাডার বাহিনী ও এলাকায় তার নিজস্ব
বাহিনী নিয়ে তিন দিক থেকে সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। তিনি দাবি করেন, নিজেদের
গুলিতেই ওরা তিনজন নিহত হয়। বিরোধপূর্ণ জলমহালের পাঁচ আনা অংশের দাবিদার
একরাম জানান, স্থানীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে ১৪২০ বাংলা থেকে পরবর্তী
৬ বছরের জন্য জলমহালটি লিজ আনা হয়। লিজের ৫ আনা অংশের মালিক তিনি। লিজ
নেয়ার প্রথম বছর শান্তিপূর্ণভাবে ভোগ করলেও পরে উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ
সম্পাদক প্রদীপ রায় ও যুগ্ম সম্পাদক পৌর মেয়র মোশাররফ মিয়া বিনা পয়সায়
অংশীদার হতে চায়। এই অযৌক্তিক দাবি মেনে না নেয়ায় তারা আমাকে কিভাবে
জলমহালটি ভোগ করি তা দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছিল। এরপর থেকে আমাকে বাদ দিয়ে
পুরো জলমহালটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। মঙ্গলবার জলমহাল দখলে গেলে তাদের
নেতৃত্বে সশস্ত্র হামলা চালালে আমার ১১ জন লোক গুলিবিদ্ধ হন। এর মধ্যে ৩
জন মারা যান। সিলেট থেকে তার ছোট ভাই এমসি কলেজ ছাত্র দলের আহ্বায়ক বদরুল
আজাদ রানা অস্ত্র ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী জোগানের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। এ
ব্যাপারে উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় জানান, একরাম গত ২
বছর মৎস্যজীবীদের লিজ নেয়া জলমহালটি জোরপূর্বক ভোগ করে আসছিল। এ নিয়ে
মামলা-মোকদ্দমাও হয়। একপর্যায়ে মৎস্যজীবীরা জলমহালটি ফিরে পেলে কর্তৃত্ব
হারায় একরাম। এরপর থেকে জলমহালটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠে সে। এর
ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সশস্ত্র লোকজন নিয়ে জলমহালটি দখলে গেলে মৎস্যজীবীরা
প্রতিরোধ করে। ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি
বলেন, ১৬ জানুয়ারি থেকে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। সরেজমিন নিহতদের গ্রামের
বাড়ি আকিল নগরে গেলে সেখানে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। শাহরুলের মা
পুত্র হারানোর শোকে বিলাপ করছেন, তার স্ত্রী সাহেনা বেগম অনেকটা বাকরুদ্ধ।
ঘরে তাকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে। জ্ঞান ফিরলেই স্বামী হারানোর শোকে
চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন এবং বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন, কথা বলতে
পারছেন না। শাহরুলের মা সেলিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঘটনার দিন আমার
ছেলেকে উজ্জ্বল ফোন করে নিয়েছে, যাওয়ামাত্র শুনি আহাদের পার্টির লোক আমার
ছেলেরে গুলি করে মারছে। উজ্জ্বলের স্ত্রী সাহানা ১ বছরের পুত্র সন্তান কোলে
নিয়ে বিলাপ করছিলেন। এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামী
হাতিয়া গ্রামের দবির মিয়ার বাড়িতে চাকরি করেন। ঘটনার দিন জারলিয়া নদীর
পাশের জমিতে কাজ করতে গেলে বিলের মালিকরা আমার স্বামীকে গুলি করে মারে।
বৃহস্পতিবার বিকালে তিনজনের লাশ দাফন করা হয়েছে। দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত
কর্মকর্তা আবদুল জলিল জানান, বুধবার পুলিশ সুপার হারুন আর রশিদ, সিলেট
রেঞ্জ অফিসের এসপি নুরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দিরাই সার্কেল
বেলায়েত হোসেন সিকদার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। রাত ৭টায় রিপোর্ট লেখা
পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধার নেই। পুলিশের
অভিযান চলছে। বিরোধপূর্ণ জলমহালের খলায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

No comments:
Post a Comment