Sunday, January 1, 2017

নির্বাচন নিয়েই আওয়ামী লীগের বছর পার

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিল ২০১৬ সালের বেশিরভাগ সময়। এ সময়ের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা পরিষদ, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এবং কিছু এলাকায় পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া দল গোছানো এবং দলের সফল সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে গেল বছর। জঙ্গিবাদ-সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে দল ও জোটের সরব উপস্থিতি ছিল রাজপথে। বছরজুড়ে সংগঠন গুছিয়ে আরও শক্তি সঞ্চয় করেছে শাসক দল। বছরটিতে রাজপথে শক্তিশালী বিরোধিতার মুখে যেমন পড়তে হয়নি, তেমনি কিছু বিতর্ক থাকলেও ভোটের মাঠে সফল ছিল আওয়ামী লীগ। বছর শুরুর প্রথম সপ্তাহেই ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্রের বিজয় দিবস পালন নিয়ে রাজনীতির মাঠে বক্তৃতা-বিবৃতির ঝড় ওঠে। দিনটি পালনে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের ডাক দেয় আওয়ামী লীগ। আরেক বড় দল বিএনপি দিনটিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালনের অংশ হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়। এ নিয়ে চলে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য-বিবৃতি আর হুশিয়ারি। সমাবেশের অনুমতি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ২ দলকেই নিজ নিজ দলীয় কার্যালয়ে কর্মসূচি পালন করে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবে, ৫ জানুয়ারি সমাবেশ করতে না পারলেও ১০ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে আওয়ামী লীগ।
জানুয়ারিতে সম্মেলনের সিদ্ধান্ত, অক্টোবরে বাস্তবায়ন : ৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ২৮ এপ্রিল দলের ২০তম সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত হয়। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এসে সম্মেলনের তারিখ পিছিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১০ জুলাই। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এসে আরও এক দফা পিছিয়ে ২২ ও ২৩ অক্টোবর সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ দুটি দিনেই জাঁকজমকভাবে অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলন। চমক দিয়ে সাধারণ সম্পাদক পদে আসেন ওবায়দুল কাদের। সারা বছর সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই তৃতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক থাকছেন- এ আলোচনা থাকার পরও ওবায়দুল কাদের পেয়ে যান দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এ পদ। এক যুগ পর গত বছরের মাঝামাঝি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগকে ২টি ভাগে ভাগ করে নতুন কমিটি দেয়া হয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততা : মার্চ থেকে শুরু হয় সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিশাল কর্মযজ্ঞ। মোট ছয় ধাপে ৪ হাজার ২৭৯ ইউনিয়নে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ছয় ধাপে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ২৬৭২টি ইউপিতে জয় পান। প্রথমবার দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দল মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী নেতারা এসব বিরোধে ইন্ধনও দিয়েছেন। এ নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের বিরোধ স্পষ্ট হয়। দেশের অনেক স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে মারামারিতে লিপ্ত হন। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়টি প্রকট আকার ধারণ করেছিল। বছরের শেষদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছেন বিএনপির প্রার্থীকে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে জয় তুলে নেয় আওয়ামী লীগ। যদিও ৬১টি জেলার ১৩টিতে বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। এ ছাড়া থেমে থেমে কিছু পৌরসভাতেও ভোট হয়।
ছাত্রলীগে দুর্নাম : সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে এ বছর বারবারই বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে আওয়ামী লীগ। সারা বছরই কোথাও না কোথাও সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ। সর্বশেষ ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেটে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগের এক নেতার কলেজছাত্রী খাদিজাকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনা দেশজুড়ে ছিল আলোচিত। আরেক নেতা রবিনের বিরুদ্ধে ওঠে তার কথিত প্রেমিকা আফসানাকে হত্যার অভিযোগ। এমনকি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা দিয়াজ হত্যায়ও সন্দেহের তীর ওঠে তারই সংগঠনের কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এভাবেই সারা বছর কারণে-অকারণে সংঘর্ষে জড়িয়েছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। যার রেশ ছিল ৩০ ডিসেম্বর কুমিল্লায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এখানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়ান।
মন্ত্রী-এমপিদের বক্তব্য আর কর্মকাণ্ডে অস্বস্তি : সরকারের কয়েক এমপি-মন্ত্রীর বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ডের কারণেও অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে দলকে। দু’জন মন্ত্রী তাদের বক্তব্যের কারণে আদালত কর্তৃক শাস্তিপ্রাপ্ত হন। দুই মহিলা এমপির ছেলের কর্মকাণ্ডেও বেকায়দায় পড়ে সরকার। মহিলা লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পিনু খানের ছেলে গভীর রাতে মাতাল অবস্থায় রাজধানীর একটি সড়কে গুলি করে ২ পথচারীকে হত্যা করেন। আরেক মহিলা এমপির ছেলে অস্ত্র ও নেশাজাতীয় দ্রব্য নিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছিরের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। নতুন সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগে যোগদান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সইতে হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে। গত ডিসেম্বর মাসেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয় এমপি আবদুল ওদুদ জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মীকে আওয়ামী লীগে যোগদান করান।
সংখ্যালঘু হামলায় বেকায়দায় : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হামলা নিয়ে শাসক দলকে বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। দুটি স্থানেই আওয়ামী লীগ নেতারা সরেজমিন গেলেও দল সরকারে থাকায় এই হামলার কারণে সমালোচনা জোটে। ২টি হামলার সঙ্গেই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের নাম জড়িয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। বিপরীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করায় জুটেছে প্রশংসা আর কৃতজ্ঞতা। বছর শেষে দলটি প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই রাষ্ট্রপতির দরবারে ডাকের আশা করছে দলটি।

No comments:

Post a Comment