Sunday, January 1, 2017

দল গোছাতেই বছর গেল বিএনপির

সরকারবিরোধী আন্দোলন ছেড়ে ২০১৬ সালজুড়ে দল পুনর্গঠনেই ব্যস্ত ছিল বিএনপি। সফল জাতীয় সম্মেলনের পর কেন্দ্রীয় নির্বাহী, জাতীয় স্থায়ী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কমিটি নতুনভাবে সাজানো হয়। তৃণমূল পুনর্গঠনও চলে জোরেশোরে। ইতিমধ্যে প্রায় অর্ধেক জেলা কমিটি পুনর্গঠন শেষ হয়েছে। মূল দলের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। যুবদলসহ আরও কয়েকটি অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠনও প্রায় শেষ পর্যায়ে। এর বাইরে জাতীয় বেশ কিছু ইস্যুতেও সরব ছিল বিএনপি। আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ। তাই স্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জাতির সামনে একটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। সর্বশেষ ইসি পুনর্গঠন নিয়ে বিএনপিকে সংলাপে ডাকেন রাষ্ট্রপতি। খালেদা জিয়ার প্রস্তাব এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে রাষ্ট্রপতির এমন মন্তব্যে নতুন করে আশাবাদী হয়ে ওঠে দলটি। রাজপথের আন্দোলন না থাকায় আগের চেয়ে গত বছরটিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছিল কিছুটা কম। ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে কেন্দ্র করে কিছুটা উত্তাপ ছড়ায়। ওইদিন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চায় বিএনপি। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন অনুমতি দেবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়। এরপর নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুমতি চাইলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশ অনুমতি দেয়নি। এই নিয়ে কিছুটা উত্তাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল করার মধ্য দিয়েই এর প্রতিবাদ জানায় দলটি।
তবে বছরজুড়েই আলোচনায় ছিল আদালতপাড়া। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সিনিয়র নেতারা বছরের বিভিন্ন সময় আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ২০১৬ সালে বিএনপির অনেক সাফল্য রয়েছে। আমরা সফলভাবে কাউন্সিল করতে পেরেছি। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও দল গোছাতে পারা আমাদের বড় সাফল্য। বলতে গেলে ২০১৬ ছিল বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর বছর। তিনি আরও বলেন, রাজপথে না থাকলেও বিএনপি যে আন্দোলন থেকে সরে গেছে এমনটা ভাবা ঠিক নয়। আন্দোলনের অংশ হিসেবেই আমাদের নেত্রী ইসি পুনর্গঠনে প্রস্তাব দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বিএনপির সঙ্গে এ বিষয়ে সংলাপ করেছেন। এতে আমরা বর্তমান সংকট নিরসনে আশাবাদী হয়ে উঠেছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে বিএনপি প্রার্থীর পরাজয় হলেও সেখানে আন্দোলনে আমাদের আংশিক বিজয় হয়েছে। বিএনপির আন্দোলনের কারণেই সরকার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিয়ে দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠাই আগামী দিনে বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ। নাসিকে জয় হাতছাড়া হওয়ায় কিছুটা মনঃক্ষুণœ নেতারা : বছরের শেষপ্রান্তে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয় নির্বাচন হলেও তা জাতীয় উত্তাপ ছড়ায়। নাসিকে জয় দিয়ে বছর শেষ করার প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হাতছাড়া হওয়ায় কিছুটা মনঃক্ষুন্নভাবেই বছর পার করে বিএনপি নেতাকর্মীরা। নাসিক নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজে পুরো নির্বাচন মনিটরিং করেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। নাসিকে প্রতিটি ওয়ার্ডে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে একটি করে কমিটি করা হয়। প্রায় দু’শ কেন্দ্রীয় নেতা পুরো নাসিক চষে বেড়ান। স্থানীয় তিন নেতা তৈমুর আলম খন্দকার, আবুল কালাম ও গিয়াসউদ্দিন শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের পক্ষে ততটা সক্রিয় ছিলেন না বলে অভিযোগ ওঠে। দলীয় প্রার্থীর চেয়ে তারা ছেলে ও ভাইকে জয়ী করাতেই ব্যস্ত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের প্রার্থীর পরাজয় ঘটে। নাসিক পরাজয়ের পর হাইকমান্ড এর নেপথ্যের প্রাথমিক কারণ হিসেবে স্থানীয় তিন নেতার নিষ্ক্রিয়তাকেই দেখছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা নেতাদের ঢাকায় তলব করেন খালেদা জিয়া। তাদের কাছে পরাজয়ের ব্যাখ্যা দাবি করেন। ওই তিন নেতা নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দিলেও তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি খালেদা জিয়া। নাসিক নির্বাচনে নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের পাশাপাশি সাংগঠনিক দুর্বলতাও ফুটে ওঠে। তাই জেলা ও মহানগর কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জাতীয় কাউন্সিল ও নতুন কমিটি : সরকারবিরোধী আন্দোলনে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে বিএনপি। সময়মতো কাউন্সিল না হওয়ায় নেতাকর্মীদের মনোবলও কমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিরতি দিয়ে দল পুনর্গঠনের দিকে নজর দেয় বিএনপি। ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় দলটির ষষ্ঠ কাউন্সিল। কাউন্সিল ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়। সারা দেশ থেকে কয়েক হাজার নেতা কাউন্সিলে অংশ নেন। এবারের কাউন্সিলে দলের গঠনতন্ত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। বাড়ানো হয় জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা। এক নেতার এক পদ এমন গুরুত্বপূর্ণ বিধান গঠনতন্ত্রে সংযোজন করা হয়। কাউন্সিলের দিন নতুন কমিটি না দেয়ায় নানা সমালোচনার মুখে পড়ে দলটির হাইকমান্ড। কাউন্সিলের ১১ দিন পর ৩০ মার্চ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মহাসচিব, রুহুল কবির রিজভীকে সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও মিজানুর রহমান সিনহাকে কোষাধ্যক্ষ করে তিনজনের নাম ঘোষণা করা হয়। ৯ এপ্রিল ঘোষণা করা হয় যুগ্ম-মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদকের নাম। আর সর্বশেষ ৬ আগস্ট ৫০২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি ও ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির দুটি পদ ফাঁকা রেখে বাকিদের নাম ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ৭৩ সদস্যের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কমিটির নামও ঘোষণা করা হয়। স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষিত নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের নাম না থাকায় অনেকেই হতাশ হন। কাঙ্খিত পদ না পেয়ে নোমানসহ অনেক নেতাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।
তৃণমূল পুনর্গঠন : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর দলটি সাংগঠনিক সংকটে পড়ে। ওই সংকট কাটাতে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে পুনর্গঠন কাজে হাত দেয়। ৯ আগস্ট কেন্দ্র থেকে চিঠি পাঠিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়। দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানকে তৃণমূল পুনর্গঠনে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত শতভাগ সফল হয়নি দলটি। জানতে চাইলে বিএনপির তৃণমূল পুনর্গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, আমরা ডিসেম্বরের মধ্যেই তৃণমূল পুনর্গঠন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসনের বাধা, হামলা-মামলায় হয়রানিসহ নানা কারণে তা শেষ করতে পারিনি। এখন পর্যন্ত ৫০ ভাগ পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়েছে।
ইসি পুনর্গঠনে প্রস্তাব ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ : ১৮ নভেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন খালেদা জিয়া। সব দলের ঐক্যের ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের খুঁজে বের করতে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন, ইসি শক্তিশালীকরণে আরপিওর কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন ওই রূপরেখায়। খালেদা জিয়ার ঘোষিত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। কিন্তু সুশীল সমাজসহ অনেকেই ওই প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। প্রস্তাবের একটি কপি বিএনপি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠায়। এমন পরিস্থিতিতে ১৮ ডিসেম্বর সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিএনপিকে চিঠি দেন রাষ্ট্রপতি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গভবনে যান। ইসি পুনর্গঠনে আগের দেয়া প্রস্তাবের একটি কপি রাষ্ট্রপতিকে দেয়া হয়। একই সঙ্গে সার্চ কমিটি ও সিইসি এবং অন্যান্য কমিশনারের জন্য দশজনের একটি তালিকাও তাকে দেয়া হয়। বিএনপির প্রস্তাবকে ইতিবাচক উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি জানান, ইসি পুনর্গঠনে এ প্রস্তাব সহায়ক হবে। রাষ্ট্রপতির এমন মনোভাবে আশান্বিত হয়ে উঠেছেন বিএনপি নেতারা। তাদের প্রত্যাশা সব দলের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করবেন। রাজপথে নয়, আদালতপাড়ায় ব্যস্ত ছিলেন নেতারা : হরতাল অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি না থাকায় রাজপথে আইনশৃংখলা বাহিনীর দমন-পীড়ন থেকে অনেকটাই নিরাপদে ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তবে বিগত বছরগুলোতে দায়ের করা নানা মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচারের মুখোমুখি হন দলটির নেতারা। বিগত বছরগুলোতে উপর্যুপরি মামলার মাধ্যমে আইনি জালে আটকানো হয়েছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটি থেকে তৃণমূল নেতাদের অনেকেই এখন একাধিক মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচারের মুখোমুখি। ইতিমধ্যে তারেক রহমানের একটি মামলায় রায় হয়েছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল মামলার বিচারকার্য দ্রুতগতিতে চলছে। কয়েকদিন পরপরই খালেদা জিয়াকে আদালতে উপস্থিত হতে হচ্ছে।

No comments:

Post a Comment