Sunday, January 29, 2017

হাজতবাসের তিন দিন পর মুক্ত দুই স্কুলছাত্র

থানা চেনাতে গিয়ে ছদ্মবেশে থাকা পুলিশের হাতে ‘আটক’ দুই স্কুলছাত্র নাঈম ইসলাম ও মো. আকাশকে অবশেষে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। রাজধানীর মান্ডা আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ওই দুই ছাত্রকে বৃহস্পতিবার রাতে আটক করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। কোনও মামলা কিংবা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলেও শুধু সন্দেহের বশে তিন দিন তাদের থানাহাজতে আটকে রাখা হয়। বিষয়টি জানাজানির পর যুগান্তরের পক্ষ থেকে অনুসন্ধানে গেলে শনিবার রাতে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
তবে ওই দুই ছাত্রকে ছেড়ে দেয়ার পেছনে লেনদেনের ঘটনা রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। প্রাইভেট পড়ে বাসায় ফেরার পথে ছদ্মবেশী তিন পুলিশ সদস্য স্থানীয় থানা (মুগদা থানা) চিনিয়ে দেয়ার কথা বলে কৌশলে তাদের থানায় নিয়ে যান। পরে তাদের নেয়া হয় যাত্রাবাড়ী থানায়। পুলিশের দাবি, এক তরুণীর রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তারা ওই দুই ছাত্রকে আটক করে। তবে তাদের ছেড়ে দেয়ার শর্ত হিসাবে পুলিশের পক্ষ থেকে মোটা অংকের টাকা দাবি করা হয় বলে স্বজনরা অভিযোগ করেন। এ নিয়ে দেন-দরবারের একপর্যায়ে বিষয়টি জানতে পেরে যুগান্তরের পক্ষ থেকে শুক্র ও শনিবার থানায় সরেজমিন অনুসন্ধান চালানো হয়। এ সময় ভুক্তভোগী দুই ছাত্রের স্বজনদের সঙ্গে দফায়-দফায় কথা হয়। একপর্যায়ে শনিবার সন্ধ্যায় কথা হয় যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আনিছুর রহমান এবং এক তরুণীর রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় দায়ের হওয়া সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ওমর ফারুকের সঙ্গে। রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনায় এসআই ওমর ফারুক ওই দুই ছাত্রকে আটকের বিষয়টি স্বীকার করেন। ২৪ ঘণ্টার বেশি কাউকে থানায় আটক রাখা যায় কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে ওই পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘মানবিক কারণে তাদের (স্কুলছাত্র) এখনও আটক কিংবা গ্রেফতার দেখানো হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, কাগজে আটক কিংবা গ্রেফতার দেখানোর পর সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাদের আদালতে পাঠানোর বাধ্যবাধ্যকতা রয়েছে। এতে অল্পবয়সী ওই দুই ছাত্রের জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর ছেড়ে দিলে পালিয়েও যেতে পারে। এ কারণে ভবিষ্যতের কথা ভেবে ও তদন্তের স্বার্থে পুলিশ ওই দুই ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।   অন্যদিকে তিন দিন ধরেই যাত্রাবাড়ী থানার সামনে অবস্থান করছেন স্কুলছাত্র নাঈম ইসলাম ও মো. আকাশের অভিভাবকরা। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ওমর ফারুক ও ওসি আনিছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মান্ডা খালপাড় এলাকার বাসিন্দা ওই দুই ছাত্রের অভিভাবকদের সঙ্গে স্কুলের শিক্ষক ও এলাকার লোকজনও থানায় যান। তারাও দুই ছাত্রকে ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করেন। স্কুল শিক্ষকরা পুলিশকে বলেন, আটক দুই ছাত্রের স্বভাব চরিত্রে কোনো ত্রুটি তারা কোনো দিন পাননি। কিন্তু কোনো কথায় তাদের ছাড়তে রাজি হয়নি যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ।
তবে সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় শনিবার রাত ১১টার দিকে পুলিশ দুই ছাত্রকে ছেড়ে দেয়। দুই ছাত্রের স্বজনদের একজন শনিবার রাত ১২টার দিকে যুগান্তরকে লেনদেনের ব্যাপারটি নিশ্চিত করলেও কত টাকা দিয়েছেন তা জানাতে চাননি। এমনকি তিনি তার পরিচয়ও উল্লেখ না করার অনুরোধ জানান। শনিবার যাত্রাবাড়ী থানা সরেজমিন পরিদর্শনের সময় হাজতে থাকা স্কুলছাত্র নাঈম ও আকাশের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। ওই সময় আকাশ জানায়, বৃহস্পতিবার বিকালে অপরিচিত একটি নম্বর থেকে তার মোবাইল ফোনে বারবার কল আসছিল। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি বলছিলেন, তিনি কুমিল্লায় থাকেন। জরুরি একটি কাজে ঢাকায় এক লোকের কাছে এসেছেন। কিন্তু ঢাকায় আসার পর ওই লোকের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাচ্ছেন। আকাশ আরও জানায়, ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ওই লোকটি বলছিলেন, যে ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে তিনি ঢাকায় এসেছেন, সেই ব্যক্তি কিছু দিন আগে আপনার (আকাশের) মোবাইল নম্বরটি দেন। আকাশের ভাষায়, ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ওই ব্যক্তি বলছিলেন, আমি নাকি সেই ব্যক্তির ঠিকানা বলতে পারব। আকাশ জানায়, বারবার লোকটি তার সঙ্গে দেখা করার আকুতি জানায়। পরে আকাশ তার মায়ের সঙ্গে ওই ব্যক্তিকে কথা বলিয়ে দেয়। এমনকি বাসার ঠিকানাও দেয়। কিন্তু ওই লোকটি বাসায় আসেননি। আকাশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার পর স্কুলের এক শিক্ষকের বাসায় প্রাইভেট পড়ে তারা (নাঈম ও আকাশ) রিকশায় ফিরছিল।
এমন সময় আবারও আকাশের নম্বরে সেই মোবাইল থেকে ফোন আসে। তারা মুগদা থানার ল্যাটকার গলির সামনে এলে তিন লোকের সঙ্গে দেখা হয়। তারা জানান, কুমিল্লা থেকে তারা বিকালে ঢাকায় এলেও ঢাকার কোনো কিছু তেমন চেনেন না। তাই তারা তাদের আশপাশের একটি হাসপাতাল ও শপিংমল চিনিয়ে দিতে বলেন। সরল মনে আকাশ-নাঈম রিকশা থেকে নেমে ওই তিনজনকে নিয়ে স্থানীয় ইসলামী হাসপাতাল ও বাশার টাওয়ার (শপিংমল ও আবাসিক ভবন) দেখিয়ে দেয়। এরপর ওই তিন ব্যক্তি দুই ছাত্রকে ডলার গিফট করতে চান। তারা ডলার না নিলে কফি খাওয়ার অফার দেন। এতেও রাজি হয়নি দুই ছাত্র। পরে ওই তিন ব্যক্তি তাদের মুগদা থানা দেখিয়ে দিতে বলেন। তাদের নিয়ে দুই ছাত্র থানার সামনে গেলে ওই তিন ব্যক্তি তাদের থানার ভেতর যেতে বলেন। তারা ভেতরে যেতে না চাইলে একপর্যায়ে জোর করে থানায় নিয়ে আটকে রাখা হয় বলে জানায় আকাশ। এদিকে আটকের পর বিষয়টি তাদের মা-বাবাকে জানানো হয়। খবর পেয়েই তারা থানায় ছুটে যান। এরপর থেকেই চলে নানা নাটক। যাত্রবাড়ী থানার ওসি আনিছুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, কিছু দিন আগে যাত্রাবাড়ীর মীরহাজিরবাগ থেকে এক তরুণী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। ওই ঘটনায় তার ভাই সাধারণ ডায়েরি করলে তরুণীটির খোঁজে পুলিশ কাজ শুরু করে। একপর্যায়ে প্রযুক্তির সহায়তায় দেখা যায়, ওই তরুণী যে মোবাইল ফোনটি ব্যবহার করত সেটি এখন সিম পরিবর্তন করে অন্য আরেকজন ব্যবহার করছে। মোবাইল ফোনটির আইএমইআই নম্বরের (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুপমেন্ট আইডেন্টিটি) সূত্র ধরেই তারা স্কুলছাত্র আকাশকে আটক করেন। ওসি আরও বলেন, প্রতিটি মোবাইল ফোনের একটি স্বতন্ত্র নম্বর থাকে। ওই আইএমইআই নম্বরের সঙ্গে অন্য মোবাইল সেটের নম্বর মিল থাকার কথা নয়। সে হিসাবে ওই মোবাইলটি তরুণীর বলে তারা নিশ্চিত। আর এ রহস্যের কিনারা করতেই তারা আকাশকে আটক করেন। শুক্রবার সকালে যাত্রাবাড়ী থানায় গিয়ে দেখা যায়,
কার পার্কিংয়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে কান্না করছিলেন কয়েক নারী। সেখানে গিয়ে কথা হয় নাঈমের বাবা মাছ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম ও আকাশের বাবা অটোরিকশাচালক মো. মুছাসহ তাদের স্বজনদের সঙ্গে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তারা জানান, আকাশ ও নাঈম মেধাবী ছাত্র। অকারণে পুলিশ তাদের ধরে এনেছে। আকাশ জেএসসিতে ‘এ’ পাস ও নাঈম ‘এ’ মাইনাস পেয়ে নবম শ্রেণীতে পড়ছে। শনিবার দুপুরেও থানায় গিয়ে উদ্বিগ্ন অবস্থায় দেখা যায় অভিভাবকদের। আকাশের বাবা মো. মুছা জানান, পুলিশ যে মোবাইলে সমস্যার কথা বলেছে সেটি স্থানীয় একটি মোবাইলের দোকান থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে। দোকানে ৫০০ টাকা এখনও বাকি আছে। মোবাইল কেনার কাগজপত্রও পুলিশকে দেখানো হয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ যেসব কাগজপত্র চেয়েছে সবই দেয়া হয়েছে। পুলিশ এসবে সন্তুষ্টও হয়েছে। তার পরও ছেলে দু’টিকে তারা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। রাতে বলে সকালে ছাড়বেন, সকালে বলেন দুপুরে, দুপুরে বলেন বিকালে, বিকালে বলেন রাতে ছেড়ে দেয়া হবে। স্থানীয় নেতাদের দিয়ে তদবির করিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

No comments:

Post a Comment