Wednesday, January 25, 2017

রাণীনগরে ফসলী জমিতে পুকুর খননের মহাৎসব

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় এক শ্রেণীর পুকুর ব্যবসায়ী স্থানীয় কৃষকদের ধানী জমি চাষের বদলে বড় পুকুরের মালিক বুনিয়ে দেওয়ার লোভনী অফার দিয়ে ১০ বছর মেয়াদী লীজ প্রক্রিয়া চালু করে জমির মালিককে বোকা বানিয়ে ফসলী জমিতে পুকুর তৈরির লক্ষ্যে স্কেবেটার মেশিন দিয়ে আট ফিট গভীর করে জমির চার দিকে বাঁধ দিয়ে পুকুর খননের মহাৎসব চলছে। রাত-দিন ২৪ ঘন্টা বিরতিহীন ভাবে পুকুর খনন করে সেই মাটি আবার রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার প্রায় ২৫ টি ইট ভাটাতে মাটি সরবারহ করা হচ্ছে। কৃষকরা না বুঝে একদিকে হারাচ্ছে তাদের পৈতিক ফসলী জমি অন্যদিকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে এক শ্রেণীর তথাকথিত পুকুর ব্যবসায়ীরা। রাজশাহী, নাটোর, পাবনা এমনকি রাজধানী ঢাকা শহর থেকে এসে এখানে জমি লীজ নিয়ে ফসলী জমিতে পুকুর কেটে ইট ভাটার মালিকদের সাথে মাটি ব্যবসা চুটিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। এবিষয়ে স্থানীয়রা প্রতিকার চেয়ে গত ০৭/১২/২০১৬ইং তারিখে সহকারি কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ যার রিসিভ নং-১৫৮৭ করেও লাভ হচ্ছে না। ব্যক্তি মালিকানা জমির পাশাপাশি সরকারের ১নং খতিয়ানভূক্ত জমিও এই পুকুর দস্যুদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। জানা গেছে, উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে নদী-নালা খাল-বিল বাদে প্রায় সাড়ে ২১ হাজার হেক্টর ফসলী জমি রয়েছে। শ্রেণী ভেদে প্রায় সকল জমিতেই সারা বছর কোন না কোন ধরণের ফসল হয়।
কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি এবং উৎপাদিত কৃষিজাত পূর্ণের যথাযথ মূল্য না পাওয়ায় স্থাণীয় এক শ্রেণীর কৃষকরা পুকুর ব্যবসায়ী ও ইট ভাটা মালিকদের লোভনীয় অফারের ফাঁদে পড়ে প্রতি বিঘা জমি বছরে ১২ হাজার টাকা দরে ১০ বছরের জন্য লীজ প্রক্রিয়া চুক্তিনামা করে চাষযোগ্য ফসলী জমিতে বড় পুকুর করছে আর সেই মাটি প্রতি গাড়ি (ট্রাক্টর) ছয়শত থেকে সাতশত টাকায় ইট ভাটায় বিক্রয় করছে পুকুর ব্যবসায়ীরা। জমি গুলো দেখে মনে হচ্ছে এযেন উম্মুক্ত জলাশয়। ভূমি আইনের নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে নির্বিচারে আবাদী কৃষি জমিতে অবাদে পুকুর খনন করায় দিনদিন কমে যাচ্ছে ফসলী জমি অন্য দিকে পাশের জমির মালিকরা পুকুর পাড়ের প্রতিবন্ধকতার কারণে স্বাভাবিক ভাবে পানি চলাচল বন্ধ হওয়ায় বোরো ধান রোপণে অনেক কৃষকরা বাধগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই কেউ চলে যাচ্ছে পুকুর দস্যুদের কাছে আবার কেউ জমি চাষ না করে ফেলে রাখছে। এতে করে শুধু চলতি মৌসুমেই প্রায় পাঁচশত হেক্টর জমিতে বোরো চাষ কম হওয়ার আশংকা রয়েছে। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা অবদি প্রায় নয়টি স্কেবেটার মেশিন দিয়ে মাটি কেটে ইট ভাটায় পৌছে দেওয়া হচ্ছে। উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে পুকুর খননের প্রবনতা লক্ষ্য করা গেলেও বিশেষ করে মিরাট ইউপি’র আয়াপুর ও আতাইকুলা মৌজার এক নাম্বার ও দুই নাম্বার স্লুইচ গেট নামক স্থানে পুকুর খননের প্রবনতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোনিয়া বিনতে তাবিব মিরাট ইউপি’র কয়েকজন কৃষকদের কাছ থেকে মৌখিক ভাবে যেনে তাৎক্ষনিক মেশিন দিয়ে পুকুর খনন বন্ধ সহ জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য ওসি রাণীনগরকে নির্দেশ দিলে পুলিশ এক স্কেবেটার চালককে থানায় আনলেও রসহ্যজনক কারণে তাকে ছেড়ে দেওয়ায় পুকুর দস্যুরা আরও বেপরোয়া হয়ে মহাৎসবে খনন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এযেন দেখার কেউ নেই। এব্যাপারে আত্রাই উপজেলার বান্দাইখারা গ্রামের আলহাজ্ব রমজান আলী জানান, আতাইকুলা মৌজার দুই নাম্বার স্লুইচ গেটের পার্শ্বে আমার তিন বিঘা জমির সাথে আরও ২১ বিঘা জমি প্রতি বছর ১২ হাজার টাকা বিঘায় বিভিন্ন জমির মালিকের কাছ থেকে পুকুর খননের জন্য ১০ বছর মেয়াদী লীজ নিয়েছি। সেই জমিতে আমি মেশিন দিয়ে মাটি কেটে পুকুর তৈরি করছি। কৃষি অফিসার কৃষিবিদ এসএম গোলাম সারওয়ার জানান, কৃষি জমিতে স্কেবেটার মেশিন দিয়ে মাটি কেটে পুকুর খননের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার আশংকায় আতাইকুলা মৌজার বেশকিছু জমিতে চলতি মৌসুমে বোরো ধান না হওয়ার আশংকা রয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ পেয়ে আমি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তাৎক্ষনিক পুকুর খনন করতে নিষেধ করলেও তার মানছে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উধর্তন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) লিলুফা ইয়াসমিন জানান, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর মিরাট ইউপি’র ভূমি কর্মকর্তাকে তদন্ত স্বাপেক্ষে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই জমির কিছু মালিকরা জমির শ্রেণী পরিবর্তনের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন করায় তা তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে আমার দপ্তরে দেওয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই জরিতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

No comments:

Post a Comment