গাইবান্ধা-১
(সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) থাকাকালীন সময়ে কর্নেল (অব.) আবদুল
কাদের খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছিলেন স্থানীয়
আওয়ামী লীগ নেতা চন্দন কুমার সরকার। এর নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছিলেন মনজুরুল
ইসলাম লিটন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর লিটনের সঙ্গে চন্দনের বিরোধ তৈরি হয়।
কাদের খান তাকে নিজ দলে টেনে নেন। কাদেরের কথায় লিটনের বিরুদ্ধে সরকারের
বিভিন্ন দফতরে নানা দুর্নীতির অভিযোগ দেয়া শুরু করেন চন্দন। লিটন ও কাদের
দু’জনই চন্দনকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাবার ‘ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করেন।
লিটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়ার কারণে তার সমর্থকরা চন্দনের ওপর হামলা
চালিয়েছে। ভুয়া ওয়ারেন্টে পুলিশে দিয়ে জেল খাটিয়েছে। এসব ঘটনার পর কাদের
খানের আরও কাছে চলে আসেন চন্দন। কাদের খান তাকে লিটন হত্যা মিশনেও ব্যবহার
করেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশের প্রযুক্তিগত
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে- লিটন হত্যার সময় চন্দন এমপি লিটনের বাড়ির সামনের গাব
গাছের নিচে অবস্থান করছিলেন। লিটন হত্যার এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি
কুড়িগ্রাম হয়ে উত্তরবঙ্গের কোনো একটি জেলার সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান।
লিটন হত্যার সঙ্গে চন্দনের ভগ্নিপতি সুবল চন্দ্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও
তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা
হচ্ছে। এদিকে চন্দনের নামে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো একটি কথিত
ই-মেইল নিয়ে আলোচনা চলছে। ওই ই-মেইলে তিনি লিটন হত্যার সঙ্গে জড়িত নন বলে
দাবি করেছেন। এটা তিনি গাইবান্ধা পুলিশ সুপার বরাবর পাঠিয়েছেন বলেও জানান।
গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, চন্দন
পুলিশ সুপার বরাবর কোনো ই-মেইল বা চিঠি পাঠিয়েছে এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা
নেই। তার নামে এ ধরনের কোনো চিঠি আসেনি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
লিটন হত্যায় কাদের খানের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন চন্দন- এ বিষয়ে যথেষ্ট
তথ্য-প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। পুলিশের প্রযুক্তিগত তদন্ত, কাদের খান ও
তিন কিলারের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে লিটন হত্যার পরিকল্পনা
ও হত্যার মিশন বাস্তবায়নে চন্দন জড়িত। লিটনের অবস্থানের বিষয়ে কাদের খানকে
তথ্য দিয়ে তিনি সহযোগিতা করেছেন। লিটন হত্যার এক সপ্তাহের মধ্যে ভারতে
চন্দন : পুলিশের প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা গেছে, ঘটনার সময় চন্দন লিটনের
বাড়ির সামনের গাব গাছের নিচে অবস্থান করছিলেন। হত্যা মিশন শেষে সেখান থেকে
চন্দন পালিয়ে যান। মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে
বলেন, লিটন হত্যার সময় চন্দনের অবস্থান জানার পরপরই তাকে খোঁজা শুরু হয়।
কিন্তু ঘটনার পরপরই চন্দন সুন্দরগঞ্জ থেকে পালিয়ে যান। তখনই তাকে ঘিরে
সন্দেহ তৈরি হয়। ৫ জানুয়ারি তার অবস্থান ছিল কুড়িগ্রামে। ধারণা করছি,
সুন্দরগঞ্জ থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ পেরিয়ে কুড়িগ্রামে যায় চন্দন। তারপর
উত্তরবঙ্গের কোনো একটি জেলার সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যান।
চন্দনের ভগ্নিপতি সুবল চন্দ্রের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কাদের ও চন্দনের
মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে শামসুজ্জোহার মাধ্যমে : এমপি লিটনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী
ধুবাডাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম
সুজা জানান, ২০১২ সালে কাদের খানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দিলে চারটি মামলা
হয়। ওই মামলার পর সহযোগী শামসুজ্জোহার মাধ্যমে কাদের খান যোগাযোগ করেন
চন্দনের সঙ্গে। পরে অর্থের বিনিময়ে তাদের দু’জনের মধ্যে সমঝোতা হয়। ২০১৪
সালে কাদের খান নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর দুদকের মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
লিটনের মাধ্যমে চন্দনই তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা
করেছিলেন। এ বিষয়ে শামসুজ্জোহার সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা
করেও তাকে পাওয়া যায়নি। সোমবার দুপুরে তার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত
হলুদিয়া গ্রামে গিয়ে তার বাড়ি তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে। তবে ঘরে আলো জ্বলছিল।
দরজায় কড়া নেড়েও তাকে পাওয়া যায়নি। নলডাঙ্গা বাজারে তার দোকানে গিয়েও তাকে
পাওয়া যায়নি। তার দোকানের ম্যানেজার মিজানুর রহমান জানান, শামসুজ্জোহা
ব্যাংকে গেছেন। পরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পুলিশ ও
স্থানীয় সূত্র জানায়, লিটনের পারিবারিক একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন
চন্দন।
লিটন এমপি হওয়ার পর সুন্দরগঞ্জে চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন
চন্দন। বেপরোয়া হয়ে ওঠার পর লিটন তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। এমনকি দল
থেকে তাকে বের করে দেন। এ সময় শামসুজ্জোহার মাধ্যমে চন্দনের সঙ্গে যোগাযোগ
করেন কাদের খান। তিনি চন্দনকে লিটনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা শুরু করেন।
সরকারি বিভিন্ন দফতরে লিটনের বিরুদ্ধে চন্দন দুর্নীতির অভিযোগ দেন। এতে করে
কয়েক মাস আগে লিটন তাকে ভুয়া ওয়ারেন্টে কারাগারে পাঠান। কারাগার থেকে
বেরিয়ে কাদের খানের সঙ্গে লিটন হত্যার পরিকল্পনা ও মিশন বাস্তবায়ন করেন
চন্দন। চন্দনের সেই কথিত ই-মেইল : ২৪ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকের
কাছে চন্দনের নামে একটি ই-মেইল আসে। ওই মেইলে দাবি করা হয়েছে, তার
বিরুদ্ধে লিটন হত্যায় জড়িত থাকার যে বিষয়গুলো এসেছে তা ভিত্তিহীন,
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। ২০০৮ সালে কাদের খান এমপি নির্বাচিত
হওয়ার পর হিন্দুধর্মাবলম্বী ২৭টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি বরাদ্দ
আসে। তিনি কাজ সমাপ্ত না করায় তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
তিনি দুদকে দেন। দুদক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পায় ও পরে তার বিরুদ্ধে
মামলা হয়। সে কারণে কাদের খান পূর্বশত্রুতার জেরে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা
করছেন বলে দাবি করেন চন্দন। সেই ক্যাপের ডিএনএ নমুনা তিন কিলারের নমুনার
সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে : এমপি লিটন হত্যার পর পুলিশ তার বাড়ির সামনে থেকে
একটি ক্যাপ উদ্ধার করে। ওই ক্যাপটি হত্যা মিশনে অংশ নেয়া কোনো খুনির বলে
প্রথম থেকেই ধারণা করছে পুলিশ। এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ
সুপার রবিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ওই ক্যাপের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে খুনিদের
ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে। এরই মধ্যে তিন খুনির ডিএনএন নমুনা সংগ্রহ
করা হয়েছে। কাদেরের বাড়ির তত্ত্বাবধায়ককে গ্রেফতার দেখানো : অবশেষে আবদুল
কাদেরের বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক শামীম আহমেদ মণ্ডলকে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ।
শনিবার তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। তবে শামীমের বাবা মোহর আলী মণ্ডল সোমবার
যুগান্তরের কাছে দাবি করেন, আরও ১৫ দিন আগে পুলিশ তাকে নিয়ে গেছে। এখনও
তিনি জানেন না তার ছেলে কোথায় আছে। এমপি লিটন হত্যার ঘটনায় কাদের খানকে ২১
ফেব্রুয়ারি তার বগুড়ার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বুধবার ১০ দিনের
রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডের তৃতীয় দিন শনিবার তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে
আদালতে জবানবন্দি দেন। এর আগে এ ঘটনায় কিলিং মিশনে অংশ নেয়া তিন যুবক
মেহেদী, শাহীন ও রানা এবং কাদের খানের গাড়িচালক হান্নান আদালতে জবানবন্দি
দেয়। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গার নিজ বাড়িতে
দুর্বৃত্তরা এমপি লিটনকে গুলি করে হত্যা করে।

No comments:
Post a Comment