বাবু
ওরফে তারাবাবু। এই নামটি এখন কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে ভয় ও আতংকের। কারণ
কুষ্টিয়াজুড়ে তার একচ্ছত্র দাপট। রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকে শুরু করে জেলার
প্রায় সব সরকারি কাজ শুরুর আগে তারাবাবুকে সেলামি দিতে হয়। তা না হলে নানা
‘ঝুটঝামেলা’ তৈরি হয়। তবে শুধু সরকারি কাজ নয়, বাড়ি বা দোকান নির্মাণ,
এমনকি জমি কেনাবেচা করতে গেলেও তারাবাবুর লোকজনকে খুশি রাখতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কুষ্টিয়ায় প্রায় সব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে
তারাবাবুর অদৃশ্য ইশারায়। জেলার বাসিন্দাদের কাছে এটিই এখন দিবালোকের মতো
সত্য। সূত্র বলছে, কুষ্টিয়ায় কন্ট্রাক্ট কিলিং থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি,
অপহরণ, দখল ও লুটপাট চলছে অনেকটা ওপেন সিক্রেট স্টাইলে। অথচ এসব দেখেও না
দেখার ভান করে আছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। স্থানীয়রা বলছেন, তারাবাবু
বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মুকুলের ডান হাত বা সেকেন্ড ইন-কমান্ড হিসেবে
কাজ করেন। তাই স্থানীয় প্রশাসনও তাকে এড়িয়ে চলার কৌশল বেছে নিয়েছে। সূত্র
মতে, শীর্ষ সন্ত্রাসী মুকুলের লোকজন তারাবাবুকে ‘ছোট বস’ বলে ডাকেন। এই ছোট
বসের নেতৃত্বে মুকুল বাহিনীর সদস্যরা এখন ফের সংগঠিত হচ্ছে। তবে বিষয়টি
আইনশৃংখলা বাহিনীর একেবারে অজানা নয়। সম্প্রতি র্যাবের গোয়েন্দা শাখা
কুষ্টিয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের নামের তালিকা তৈরি করে।
র্যাবের এ তালিকার এক নম্বরে আছেন তারাবাবু। এরপরের অবস্থানে তার প্রধান
দু’সহযোগী কালু ওরফে টেন্ডার কালু এবং পৌর এলাকার জিল্লুর রহমান ওরফে
জিল্লু।
র্যাব জানায়, জিল্লু আগে জাসদ গণবাহিনীর নেতা ছিলেন। বর্তমানে
তিনি ঠিকাদারদের ভয় দেখিয়ে পৌরসভার বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজের কমিশন আদায়
করেন। সেই কমিশনের একটি বড় অংশ শীর্ষ সন্ত্রাসী মুকুলের স্ত্রী সাহিদা
খাতুনের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। বাকি টাকা মুকুলের ভাগ্নে স্বপন ও শ্যালক
সাইদুল ইসলামসহ অন্যদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়। র্যাবের তালিকায় নাম আছে
আবু তৈয়ব ওরফে ডাল বাদশা, নূরে আলম ওরফে বাবু ও মুকুলের সাবেক দেহরক্ষী
আবদুল আলীমের। পুলিশ জানায়, আলীমের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত
১২টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় আলীমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে।
কিন্তু পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি অপরাধ জগতে নির্বিঘ্নে বিচরণ করছেন।
র্যাবের তালিকাভুক্ত অন্য মোস্ট ওয়ান্টেডরা হচ্ছেন মিরপুরের সারোয়ার,
ভেড়ামারার একরাম, জয় ওরফে ভাগ্নে জয় ও থানা পাড়ার সুরুজ। এদের মধ্যে সুরুজ
এক সময় বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এরপর তিনি
গণমুক্তিফৌজ নামের আরেকটি চরমপন্থী দলে যোগ দেন। কিছুদিন তিনি চরমপন্থী
নেতা আবির হাসান ও দাদা তপনের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন। বর্তমানে তিনি
তারাবাবুর অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। স্থানীয়রা বলছেন, ২০০০ সালে
কুষ্টিয়ার চরমপন্থী নির্মূলে ব্যাপক অভিযান শুরু করে র্যাব। অভিযানের এক
পর্যায়ে শীর্ষ চরমপন্থী নেতা মুকুল ভারতে পালিয়ে যান। মুকুলের বেশির ভাগ
সহযোগী র্যাবের ক্রসফায়ারে মারা পড়েন। কিন্তু র্যাবের অভিযান থেমে গেলে
ধীরে ধীরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে শুরু করেন মুকুলের প্রধান সহযোগী বাবু
ওরফে তারাবাবু। এমনকি র্যাবের ভয়ে মুকুলের যেসব সহযোগী গা ঢাকা দিয়েছিল
তারাও একে একে ফিরে আসতে শুরু করে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে একজন উচ্চপদস্থ
র্যাব কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, তারাবাবুর নেতৃত্বে কৃষ্টিয়ায় নানা
ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। নানা কৌশলে বরাবরই তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন।
এবার তিনি র্যাবের গোয়েন্দা জালে আটকা পড়েছেন। যে কোনো সময় তাকে গ্রেফতার
করা হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনীর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র।

No comments:
Post a Comment