Thursday, February 2, 2017

সার্চ কমিটি নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিয়ে জনগণকে স্বস্তি দিক

নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন প্রক্রিয়ায় নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মাসব্যাপী আলোচনা শেষে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সার্চ কমিটি গঠনের যে প্রস্তাব রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২৫ জানুয়ারি সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণের ব্যবস্থা নেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে তা ওই তারিখেই সারসংক্ষেপ আকারে সাংবিধানিক নিয়মানুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করে।
প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশসহ সারসংক্ষেপটি একই তারিখে আবারও রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হলে তিনি তা অনুমোদন করেন। প্রধানমন্ত্রী সুপারিশকৃত ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অনুমোদিত হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তা একই তারিখে অর্থাৎ ২৫ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে। ২০১২ সালের চার সদস্যের সার্চ কমিটিতে নেতৃত্বদানকারী আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত এবারের ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের শরিকরা এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি সার্চ কমিটিকে স্বাগত জানালেও দেশের অন্যতম বৃহৎ ও সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের সহযোগীরা সার্চ কমিটি নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে।
বিএনপির অভিযোগ, ‘ছয় সদস্যের সার্চ কমিটির পাঁচজনই বিতর্কিত।’ নতুন ইসি আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করবে বিধায় এর গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ও জনগণের মাঝে এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছে। তাই নবগঠিত সার্চ কমিটি কীভাবে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ প্রদানের সুপারিশ করে সবাইকে স্বস্তি দিতে পারে তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। সার্চ কমিটি ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত তাদের প্রথম বৈঠকে নতুন ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বঙ্গভবনে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী ৩১টি দলের কাছ থেকে পাঁচটি করে নাম সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ৩১ জানুয়ারি বিকাল ৩টার মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে নাম জমা দেয়ার জন্য এসব রাজনৈতিক দলকে অনুরোধ জানায়। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ২৬টি দল ১২৫ জনের নাম জমা দিয়েছে। দলগুলোর মধ্যে রয়েছে- আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ (ইনু), গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, এলডিপি, ইসলামী ঐক্য জোট, ন্যাপ (মোজাফফর), জমিয়াতে উলামা ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (জেপি), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল, গণফ্রন্ট, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জাকের পার্টি, মুসলিম লীগ, বংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট, বাসদ ও বিকল্পধারা বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) কোনো নাম জমা দেয়নি, তবে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে চিঠি দিয়েছে তারা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ,
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ও গণফোরাম এ তিনটি দল কোনো নাম জমা দেয়নি। নতুন ইসি গঠনে সার্চ কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে নাম চাওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। তবে নাম সংগ্রহ যথেষ্ট নয়। প্রাপ্ত নামগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করতে হবে। গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে তাদের জীবন-বৃত্তান্ত। পেশাগত জীবনে তারা অস্বচ্ছতা বা অনিয়মে জড়িত ছিলেন কিনা, কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল কিনা- এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এ ছাড়া তাদের নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা আছে কিনা, তা-ও দেখতে হবে। ৩০ জানুয়ারি সার্চ কমিটির সঙ্গে বৈঠকে দেশের বিশিষ্টজনরা প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ, সৎ, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্যদের নিয়ে ইসি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, দলপন্থী নিরপেক্ষরা যাতে কোনোভাবেই এখানে স্থান না পান তা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই ইসির প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। আগামীতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে তারা এসব প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবের ব্যতিক্রম হলে শুরুতেই নির্বাচন কমিশন ঘিরে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা (যুগান্তর, জানুয়ারি ৩১)। এ ছাড়া বিশিষ্টজনরা ইসি গঠনে সংবিধান অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব আইন প্রণয়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা বলেছেন, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সংবিধান মেনে এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন। এ কাজটি যত দ্রুত করা যায় ততই দেশের জন্য মঙ্গল। সার্চ কমিটি কমপক্ষে একজন নারীসহ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগে প্রতিটি শূন্যপদের বিপরীতে দু’জন ব্যক্তির নাম বাছাই করে সুপারিশ করবে। সে ক্ষেত্রে একজন সিইসি ও চারজন নির্বাচন কমিশনার পদের বিপরীতে সার্চ কমিটি সুপারিশকৃত ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়াবে ১০ জনে। সিইসির একটি পদের বিপরীতে সার্চ কমিটি সুপারিশকৃত দু’জনের মধ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী একজনকে ও নির্বাচন কমিশনারের চারটি পদের বিপরীতে সার্চ কমিটি সুপারিশকৃত আটজনের মধ্য থেকে চারজনকে বেছে নেবেন এবং তাদের নিয়োগ অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানাবেন। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবে স্বাক্ষর করবেন। উল্লেখ্য, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,
প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, সিইসি ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগে রাষ্ট্রপতির কোনো স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা নেই। ইসি গঠনে সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে নির্দেশিত আইন এ পর্যন্ত প্রণীত না হওয়ায় এবং সংবিধানে সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন ও এসব পদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির উল্লেখ না থাকায় প্রধানমন্ত্রী যদি সার্চ কমিটি সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারদের পদে অন্য ব্যক্তিদের নিয়োগের জন্য প্রস্তাব করেন, রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদনে বাধ্য। তাই সুশীল সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞসহ অনেকে মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী একজন দলীয় ব্যক্তি হওয়ায় প্রধান বিচারপতি নিয়োগের মতো সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগদান প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার বাইরে থাকা দরকার। রাজনৈতিক দল ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, শাসক দল আওয়ামী লীগ যাদের নাম সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব করেছে তারা হলেন দলটির গত মেয়াদের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক মুখ্য সচিব আবদুল করিম ও মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, সাবেক পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ, সাবেক সচিব মনজুর হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। অপরদিকে জাতীয় সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রস্তাবিত সম্ভাব্য নামগুলো হল স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাসমিন আরেফা সিদ্দিকী, সাবেক সচিব মোহাম্মদ আসাফউদ্দৌলা ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। তা ছাড়া, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকরা নির্বাচন কমিশন গঠনে যেসব নাম জমা দিয়েছে তাদের মধ্যে আছেন- সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. সা’দত হোসেন, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, জেসমিন টুলী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) দানিয়েল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাঈনউদ্দিন, সাবেক জেলা জজ এমএ গফুর, সাবেক সচিব জাফর আহমেদ চৌধুরী, সাবেক আইজিপি আজিজুল হক, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) এএলএম ফজলুর রহমান ও সরকার আলাউদ্দিন। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী সার্চ কমিটি প্রাপ্ত নামগুলোর মধ্য থেকে ২০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা (শর্ট লিস্ট) তৈরি করেছে। সার্চ কমিটি শর্ট লিস্টভুক্তদের নাম প্রকাশ করতে পারে, যাতে গণমাধ্যম তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করতে পারে। এতে সার্চ কমিটির পক্ষে ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করা সহজ হবে। কারণ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপি যেসব নাম প্রস্তাব করেছে মর্মে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে সেসব নামের বেশিরভাগই বিতর্কিত। সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগের সুপারিশ প্রদানে সার্চ কমিটিকে দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এরপর গুরুত্ব দিতে হবে দক্ষতার ওপর। তবেই আগামীতে একটি নিরপেক্ষ ও দক্ষ ইসি গঠন সম্ভব হবে।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক
latifm43@gmail.com

No comments:

Post a Comment