পত্রিকার
সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি বলে প্রতিষ্ঠিত-অপ্রতিষ্ঠিত লেখকদের
উপসম্পাদকীয়গুলোর একটি অংশ প্রতিদিনই এডিট করতে হয় আমাকে। মনে হতেই পারে-
চাকরিটা তো ভালোই, বেতন পাওয়া যায় আবার বাধ্যতামূলকভাবে কিছু না কিছু পড়তে
হয় বলে নতুন প্রেমের নতুন অনুভূতির মতো নতুন জ্ঞানের নতুন আনন্দও মেলে তাতে
অবিরাম। না, ঠিক না। বেতনটাই যা রেগুলার, জ্ঞান ও আনন্দ ইরেগুলার, ইন
ফ্যাক্ট কিছু লেখক, বিশেষত নতুনরা তাদের ভ্রান্ত চিন্তা এমনভাবে কনসিভ করে
বসে আছেন যে, আনন্দটা রেগুলারাইজ করা কঠিন। আপত্তি ছিল না, আনন্দহীন জীবন
মানেই তো তা দুর্ভাবনা কিংবা বিরক্তির নয়। এমন অনেকেই আছেন, যারা জ্ঞানের
সন্ধানই পাননি, তাদের আবার জ্ঞানের মজা কী! যে খাবার কখনও খাইনি, তা খেয়ে
ঢেকুর তুলতেও দেখিনি কাউকে, তা যতো সুস্বাদুই হোক, না খেতে পারলে আক্ষেপ বা
অনুতাপ হবে ক্যামনে? জ্ঞানপিপাসুই জানে জ্ঞানের থাকে কত শিহরণ, কত তৃপ্তি।
ঝুম বৃষ্টির দিন অথচ পড়তে জানে না, তার মতো দুর্ভাগা আর নেই। কেউ ফোড়ন
কাটতেই পারেন, জ্ঞানের আনন্দ যদি এত জরুরি, তাহলে মূর্খ স্ত্রীর সঙ্গে
দীর্ঘবাস করে কীভাবে মানুষ? উত্তর সোজা। স্বামীটিও যদি মূর্খ হয়,
সেক্ষেত্রে মূর্খতায় মূর্খতায় কাটাকাটি হয়ে যাবে আর তিনি যদি শিক্ষিত,
তাহলে এক রসিকের কথায় প্রশ্নটির উত্তর আছে- একজন মূর্খ স্ত্রী তোমাকে যে
জ্ঞান দেবে, একশ’ পণ্ডিতও তা পারবে না! হ্যাঁ, সব নয়, যেসব লেখার কথা বলছি,
সেগুলোয় যে আনন্দ নেই তাতে ক্ষতির কিছু ছিল না, বাসায় পৌঁছে রাতে মপাঁসার
একটি গল্পগ্রন্থ কিংবা জয় গোস্বামীর কবিতার বই নিয়ে বসলেই অভাবটা পূরণ হয়ে
যাবে। কিন্তু ঘিনঘিনে বিরক্তি ঠেকাবে কে? কেউ যখন খাবারের নতুন আইটেম
সার্ভ করে বলেন- খেয়ে দেখেন কী মজা- অতঃপর যদি জিহ্বা বিদ্রোহ করে, তখন তো
প্রকাশ্যে না হোক, মনে মনে বলতেই হয়- এর চেয়ে আমার আলু ভর্তাটাই তো ভালো
ছিল। হরহামেশাই বিশেষত অপ্রতিষ্ঠিত কলামিস্টদের লেখাগুলোয় দুটি বিশেষ শব্দ
পড়তে হচ্ছে। অন্ধকার ও ধ্বংস। দেশটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে অথবা ইতিমধ্যেই
নিমজ্জিত হয়েছে ধরনের বাক্য লিখে লেখক নিশ্চয়ই ভাবছেন এডিটর খুশি না হয়ে
পারেন না। রাজনীতির এত মহান ক্রিটিক আর কে আছেন! রবীন্দ্রনাথ হতে পারিনি তো
কী হয়েছে, প্রমথনাথ বিশী (প্রখ্যাত রবীন্দ্র-সমালোচক) তো হতে পারলাম।
রাজনীতির সমালোচনা কত সহজ হয়ে গেছে এদেশে! ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দরকার হয়
না, এমনি এমনি বলে দেয়া যায়- চারিদিকে অন্ধকার! এদের একজনকে একদিন বললাম,
সর্বত্রই যদি এত অন্ধকার, তো পথ চলছেন কীভাবে? সাপে কাটছে না? ওলবার্স নামে
জার্মান এক অ্যাস্ট্রফিজিসিস্ট একটা কূটতর্ক তুলেছিলেন বহুকাল আগে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে এটাকে বলা হয় ‘ওলবার্সের কূটাভাস’ (Olburs' paradox)।
তিনি বলেছিলেন, রাতের আকাশে সূর্য নেই ঠিক আছে; কিন্তু আলো বিকিরণকারী
লক্ষ-কোটি নক্ষত্র তো থাকে। রাতের পৃথিবী তবু অন্ধকার কেন? আমার এই লেখক
দিনের বেলায়ই প্রচণ্ড উত্তাপের একটি জ্বলজ্যান্ত দেশী সূর্য থাকতেও
বাংলাদেশটাকে অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছেন। কোনো মন্ত্রী নয়, খোদ প্রধানমন্ত্রীকে
পদত্যাগ করতে পরামর্শ নয়, নির্দেশ দিয়েছিলেন লেখায়।
বলেছিলাম, পদ মানে তো
পজিশন ও পা দুটোই। আপনি কোন্টা ত্যাগ করতে বলছেন? পা ত্যাগ করলে
প্রধানমন্ত্রী হাঁটবেন কীভাবে? আরেক লেখকের কলাম ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছি
সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে। তার প্রতিটি লেখায় একটি অনিবার্য বাক্য ছিল-
দেশটা ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছে গেছে। তাকে বলেছিলাম- স্বাধীনতার পর থেকে
শুধু শুনে আসছি- দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে; এতদিনে মাত্র কিনারায়! ওখানটায় আটকে
না রেখে একটা ধাক্কা দিন, ধপাস শব্দ উঠুক। আরও বলেছি, সেই শৈশব থেকে শুনে
আসছি, দেশের ঋণের পরিমাণ এত বেশি যে, একটি শিশু হাজার হাজার ডলার ঋণ সঙ্গে
নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। কই আমাকে তো কোনো বিদেশী ঋণ শোধ করতে হচ্ছে না, দেশটা
ঋণের দায়ে নিলামেও ওঠেনি এখনও। সবশেষে তাকে বছর পঁচিশেক আগের একটি
ভবিষ্যদ্বাণীর কথা শুনিয়েছিলাম। স্টিফেন হকিং এসেছিলেন জাপানে, টোকিও
বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার ছিল। সেখানে পৌঁছামাত্রই টোকিও শেয়ার মার্কেটের
স্টলওয়ার্টরা তার কাছে গিয়ে হাজির। একজোটে সবাই বললেন, স্যার লেকচারে আপনি
আর যাই বলুন, বলবেন না পৃথিবী সহসাই ধ্বংস হয়ে যাবে। বোঝেন তো, মার্কেট ফল
করবে। যা হোক, হকিং তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, এই পৃথিবী অন্তত আগামী ২৬ হাজার
বছর অ্যাজ ইট ইজ থাকবে। লেখককে এরপর বলেছি, আপনার বোধহয় দুশ্চিন্তায় ঘুম
হচ্ছে না। বাংলাদেশ পৃথিবীরই অংশ। সুতরাং নো চিন্তা, ডু ফুর্তি! সত্যজিৎ
রায় যে অস্কার পেয়েছিলেন, তা দয়া-দাক্ষিণ্য নয়, অস্কার কমিটির আবার দয়া!
তা-ও একজন এশিয়ানের প্রতি। রায়ের ছবিগুলো এতই বাস্তব যে, মনে হয় বেড়ার ফাঁক
দিয়ে ঘরের বস্তু ও মানুষগুলোর ক্রিয়াকলাপ দেখছি। আমাদের পরিচালকরাও
বাস্তবটা দেখেন না যে তা নয়; কিন্তু ছবি বানানোর সময় মেলোড্রামা মেশানো চাই
কী চাই, তা-ও মাত্রা ছাড়ানো। জীবন কদাচিৎ নাটক হয়, অতিনাটক হয় কালেভদ্রে।
অথচ এদেশের ফিল্ম-মেকারদের দৃষ্টিতে জীবন সার্বক্ষণিক অতিনাটকীয়তায় ভরা।
ভারতীয় চ্যানেলগুলোর সিরিয়ালের নেশাখোর এক ভাবীকে একদিন একটি সিরিয়ালে
বিমুগ্ধ নয়নে স্থবির থাকতে দেখে বলেছিলাম, আপনাদের বাসায় এত যে আসি, কখনও
তো চিৎকার-চেঁচামেচি, কানাঘুষা, ষড়যন্ত্র এসব দেখি না। আমাদের বাসায়ও তাই।
তো যত প্যাঁচ, যত গ্যাঞ্জাম সব এই ফ্যামিলিতেই! এসব সিরিয়াল দেখার সময় শুধু
ভাববেন, এই যে চিৎকার, এই যে চড় মারামারি- সামনে একটা ক্যামেরা বসানো আছে।
ভাবী বললেন, ভাবী (মানে আমার স্ত্রী) দেখে না? বলেছি- ও তো আমার নাটক
দেখেই কূল পায় না। বাস্তব অতিক্রম করা যায় না, অথচ কিছু লেখক স্বীকারই করতে
চান না, বিএনপি একটি শক্তির নাম।
স্বামী মানতেই চান না যে, প্রাইভেট
কোম্পানিতে চাকরিরত তার স্ত্রীর বস্ একটি শক্তি আর তাই তার ফোন ধরতে সে
বাধ্য। তো তিনি মানতে না চাইলেই কি সেই বসের শক্তি কমবে? আমি পছন্দ করি না,
তার মানে কি সে অস্তিত্বহীন? একদিনই বলেছি, বিএনপি ধ্বংসযোগ্য কোনো পদার্থ
নয়। হাসিনা-খালেদা কোনো ব্যাপার নয়। এই রাষ্ট্রের বাঙালি মুসলমানের একটা
বড় অংশকে কখনই শুধুই বাঙালি বানানো যাবে না, আবার বাঙালিত্ব বাদ দিয়ে শুধুই
মুসলমান করে রাখা যাবে না আরেকটি প্রায় সমান অংশকে, তাই এই ধারার
প্রতিনিধিত্বকারী দুটি বড় দল থাকবেই, দলের নাম যা-ই হোক না কেন। হ্যাঁ,
একটি অংশের কিছু মানুষ চেতনার পরিবর্তনে আরেকটিতে বিলীন হতে পারে বটে,
পাড়ের গাছটির পাতা যেমন টুপ করে পড়ে নদীতে। তবে অসংখ্য পাতার ক’টাই বা পড়বে
এভাবে, বৃক্ষের মূল চেহারার দৃশ্যমান কোনো বদল ঘটবে না। নদী আর বৃক্ষ
দুটোকেই চেনা যাবে আগের মতোই। আমরা বড়জোর পারি, এই দুই শক্তির সংঘাত থামিয়ে
অথবা কমিয়ে এনে শান্তির নীড় গড়তে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- উভয় উভয়কে নাকচ
করার কত চেষ্টাই না করেছে, এন্ড অফ দ্য ডে সেসব চেষ্টা নিজেরাই নাকচ হয়ে
গেছে। নাকচ করার প্রবণতা কাটিয়ে উঠে অ্যা গুড সেন্স অফ অ্যাকোমোডেশন
আত্মস্থ করার যে বিকল্প নেই, কথাটা দল দুটির নেতাকর্মীদের বোঝানোই হচ্ছে না
কিছুতে। শেষ বাক্যটি পড়ার পর পাঠক হয়তো ভাবতে শুরু করেছেন আমি এখন
কলামিস্ট ছেড়ে রাজনীতিকদের পিছু নিলাম। না। আমার প্রিয় কবি আবুল হাসান,
যিনি ওই অল্প বয়সে না মরলে হতে পারতেন আরেক জীবনানন্দ, তার দুটি চরণ আওড়াই
আগে- মানুষ যদিও বিরহকামী, মিলনই তার মৌলিক। আমিও ফিরে যাচ্ছি আবার
কলামিস্টের কাছে।
২. কলামিস্ট কুলদীপ নায়ার আশির দশকের গোড়ার দিকে ব্রিটেনে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাতের সময় থ্যাচার ‘ইন্ডিয়া’ শুনেই তাকে বলেছিলেন- Oh India! The highest film-producing county of the world! ফিল্ম দিয়ে ভারতকে শনাক্ত করতে শুনে নায়ারের জাত্যাভিমানে লেগেছিল। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন- India is not only the highest film-producing country, it is the largest democracy of the world. Here three hundred millions people exercise their franchise- ভারত শুধু সর্বাধিক ফিল্ম প্রস্তুতকারী দেশই নয়, এটা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ, এখানে ৩০ কোটি লোক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। সত্যিই তো! ভারতের ভোটার সংখ্যা তখন ৩০ কোটি, একমাত্র চীনেই এর চেয়ে বেশি ভোটার থাকা সম্ভব ছিল; কিন্তু চীনে যে গণতন্ত্র নেই! তবে নায়ার ভারতীয় কলামিস্ট হয়ে এই মুহূর্তে নিশ্চয়ই বলতে পারবেন না, বাংলাদেশের চেয়ে তার দেশে কলাম ও কলাম লেখকের সংখ্যা বেশি। ‘বস্টন গ্লোব’-এর কলামিস্ট ব্রায়ান ম্যাকগ্রোরি, যিনি এখন ওই পত্রিকার এডিটর-ইন-চিফ, ১৭ বছর আগে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি মাসে ক’টি পলিটিক্যাল কলাম লিখি। যখন বললাম ৪টি, যেন তার সামনে তখন দাঁড়িয়ে এক কিম্ভূতকিমাকার জন্তু, তিনি চমকে উঠে বলেছিলেন, ওয়াও! অ্যা গ্রেট জিনিয়াস! তুমি এত কী লেখ? আমি এশিয়ান বটে, তবে আমেরিকানদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ভালো বুঝি। খুব শরম পেয়েছিলাম। ফরাসি দার্শনিক তাঁলেরা বলেছিলেন, মানুষ নিজেকে প্রকাশ করার জন্য কথা বলে না, সে কথা বলে নিজেকে লুকানোর জন্য। হ্যাঁ, আমি যে রাজনৈতিক কলামে সাহিত্য-টাহিত্য কিছুটা করি, সে তো নিজের অক্ষমতা ঢাকতে। কথা এক প্যারার অথচ লিখতে হয় তার ৮-১০ গুণ। বাকিটা ভরব কীভাবে? তালিবালি করতেই হয়।
২. কলামিস্ট কুলদীপ নায়ার আশির দশকের গোড়ার দিকে ব্রিটেনে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাতের সময় থ্যাচার ‘ইন্ডিয়া’ শুনেই তাকে বলেছিলেন- Oh India! The highest film-producing county of the world! ফিল্ম দিয়ে ভারতকে শনাক্ত করতে শুনে নায়ারের জাত্যাভিমানে লেগেছিল। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন- India is not only the highest film-producing country, it is the largest democracy of the world. Here three hundred millions people exercise their franchise- ভারত শুধু সর্বাধিক ফিল্ম প্রস্তুতকারী দেশই নয়, এটা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ, এখানে ৩০ কোটি লোক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। সত্যিই তো! ভারতের ভোটার সংখ্যা তখন ৩০ কোটি, একমাত্র চীনেই এর চেয়ে বেশি ভোটার থাকা সম্ভব ছিল; কিন্তু চীনে যে গণতন্ত্র নেই! তবে নায়ার ভারতীয় কলামিস্ট হয়ে এই মুহূর্তে নিশ্চয়ই বলতে পারবেন না, বাংলাদেশের চেয়ে তার দেশে কলাম ও কলাম লেখকের সংখ্যা বেশি। ‘বস্টন গ্লোব’-এর কলামিস্ট ব্রায়ান ম্যাকগ্রোরি, যিনি এখন ওই পত্রিকার এডিটর-ইন-চিফ, ১৭ বছর আগে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি মাসে ক’টি পলিটিক্যাল কলাম লিখি। যখন বললাম ৪টি, যেন তার সামনে তখন দাঁড়িয়ে এক কিম্ভূতকিমাকার জন্তু, তিনি চমকে উঠে বলেছিলেন, ওয়াও! অ্যা গ্রেট জিনিয়াস! তুমি এত কী লেখ? আমি এশিয়ান বটে, তবে আমেরিকানদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ভালো বুঝি। খুব শরম পেয়েছিলাম। ফরাসি দার্শনিক তাঁলেরা বলেছিলেন, মানুষ নিজেকে প্রকাশ করার জন্য কথা বলে না, সে কথা বলে নিজেকে লুকানোর জন্য। হ্যাঁ, আমি যে রাজনৈতিক কলামে সাহিত্য-টাহিত্য কিছুটা করি, সে তো নিজের অক্ষমতা ঢাকতে। কথা এক প্যারার অথচ লিখতে হয় তার ৮-১০ গুণ। বাকিটা ভরব কীভাবে? তালিবালি করতেই হয়।
ঢাকার এক সময়ের বিভাগীয় কমিশনার মোশতাক ভাইকে দেখতাম, কেউ তার
সমস্যা বলতে গিয়ে যখন লম্বা কাহিনী শুরু করতেন, তিনি বলতেন- শর্টে বলেন।
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এক লোক তার জমিজমা সংক্রান্ত সমস্যার কথা বলতে
গিয়ে শুরু করেছিলেন- বঙ্গবন্ধু ’৭২ সালে যখন- মোশতাক ভাই রেগে গিয়ে তাকে
থামিয়ে বললেন, কথা শর্ট করুন, বিসিএসে বঙ্গবন্ধুর আমলের ওপর প্রশ্নগুলোর
উত্তর দিতে পেরেছি বলেই এই চেয়ারে বসেছি, আপনি খালেদার আমলে চলে আসুন। কথা
ঠিক। শুধু মোশতাক ভাই নন, পাবলিকও সবজান্তা। তারপরও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা।
এ ভালো, তো ও খারাপ, এটা মানবাধিকার লংঘন, তো ওটা সুশাসনের ঘাটতি- ব্যস বড়
কলামিস্ট হয়ে গেলাম! তাওয়ার রুটির একটা পাশ পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, অনেক
আগেই ওপাশটা ওল্টানো উচিত ছিল, কিন্তু না, পুড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতেই সময়
শেষ! সেটাও না, আসলে ওপাশটা ওল্টানোর টেকনিক্যালিটিই জানা নেই। ফ্রেমে যে
ছবিটা দেখছি, তা অপছন্দ করা সোজা, মুছে ফেলে সেখানে পছন্দের ছবি আঁকা কঠিন।
সেই কঠিনেরে ভালোবাসছে কি কেউ? পাঠক লক্ষ করুন, ছয় দফা দিয়েছিলেন
বঙ্গবন্ধু, মানে রাজনীতিক, কলামিস্ট নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের বড় বড় সংকট
তৈরি করেছে রাজনীতিকরা আবার সংকট উত্তরণের অ্যারো চিহ্নও দেখিয়েছেন তারাই।
এরশাদ পদত্যাগ করবেন ভালো কথা, এরপর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা কীভাবে রক্ষা
হবে- এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি কলামিস্টরা, তিন জোটের রূপরেখা তৈরি
করেছিলেন আবার সেই রাজনীতিকরাই। মাগুরা-২ উপনির্বাচনের পর যখন সুষ্ঠু
নির্বাচনের প্রশ্ন সামনে এলো,
তখনও রাজনীতিকরাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
ফর্মুলা দিয়েছিলেন, কোনো কলামিস্ট দেননি। অথবা ধরুন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর
আওয়ামী লীগের হাল কে ধরবেন তা ঠিক করেছেন রাজনীতিকরাই। কেউ একটি লাইনও
লেখেননি শেখ হাসিনার কথা। ভালো কি হয়নি রাজনীতিকদের সেই সিদ্ধান্ত? এই
লেখায় উদ্ধৃতি বেশি হয়ে যাচ্ছে। উদ্ধৃতির আতিশয্যের লেখককে সমালোচকরা বলেন-
খোঁড়া, হাঁটতে পারে না বলে অন্যের লাঠি ধার করে। তারপরও ক্যামুর কথাটি
উদ্ধৃত করি- আধুনিক মানুষ তিনিই, যিনি পত্রিকার শুধু হেডিং পড়েন আর রমণ
করেন। সত্যিই তো, আধুনিক মানুষ খবরেরও ডিটেইলসে যায় না, এই মানুষকে
থট-প্রোভোকিং কিছু দিতে না পারলে সে কলাম পড়বে কোন্ উছিলায়? নেহরুকে কেউ
যখন বলত- স্যার অমুক পত্রিকা আপনার বিরুদ্ধে যা-তা লিখেছে- তিনি বলতেন, ওসব
যদি কেউ পড়েও, মনে রাখবে না। আর মনে রাখলেও তাতে আমার স্বাস্থ্যের কোনো
ক্ষতি হবে না, সুতরাং দুশ্চিন্তা কোরো না। প্রয়াত মকবুল ভাইও (ড. মকবুলার
রহমান) প্রায় একই কথা বলেছিলেন। বিদগ্ধ এই পণ্ডিত দেশ-বিদেশ করে শেষ জীবনে
সময় কাটাতে দৈনিক সংবাদের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন। তিনি একদিন
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক-কাম-কলামিস্টকে বলেছিলেন, এসব তো মানুষ ভুলে
যায়, নিজের সাবজেক্টের ওপর এমন কিছু লিখুন, যা দীর্ঘস্থায়ী রেখাপাত করবে।
ঠিকই তো, পত্রিকার কলামগুলোর অধিকাংশই হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো,
ফুলানো-ফাঁপানো, চোয়ালের এক চাপেই ছোট্ট একটা দলা হয়, অতঃপর গেলার কিছুক্ষণ
পর মনেই থাকে না যে, একটা কিছু খেয়েছিলাম। বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও
শাসনব্যবস্থা যে অবস্থায় আছে, তাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার যিনিই হোন না
কেন, নির্বাচন কমিশন অশ্বডিম্বের অধিক কিছু নয়, অথচ পত্রিকা খুললেই এই
কমিশন গঠন নিয়ে কলাম, টিভি খুললেই টকশো। অর্নামেন্ট বা কসমেটিক্স যখন
শরীরের চেয়ে মূল্যবান হয়ে পড়ে, তখনই এটা ঘটে। অশ্বডিম্বের আশায় ঘোড়ার এত
যত্ন পৃথিবীর আর কোথাও নেয়া হয় কিনা জানি না। প্রতিষ্ঠিত কিছু কলামিস্টের
লেখা অবশ্য না পড়লেও চলে, তাতে রাজনীতির জ্ঞান যেখানে ছিল,
সেখানেই থাকবে,
বরং যুক্তিবোধের ওপর কুয়াশার আচ্ছাদন পড়বে। চিরচেনা স্ত্রীও কোন্ কথায় অথবা
আচরণে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে, কখনও কখনও আগে থেকে আঁচ করা যায় না, এসব
কলামিস্ট দেশের কোন্ রাজনৈতিক ঘটনায় কী বলবেন তা আগাম বলে দেয়া যায় খুব।
কবির নাম উপরে লেখা না থাকলেও কবিতাটিতে যদি ‘হৃদয়’ ‘বীণা’, ‘জগৎ’-এই তিনটি
শব্দ থাকে, তখন যেমন বলে দেয়া যায় কবিতাটি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের;
উল্টোভাবে কলামিস্টের নাম পড়েই লেখাটিকে হাত দিয়ে ঢেকে রেখে বলে দেয়া যায়,
ওতে কী লেখা হয়েছে। রাজনীতি পাল্টায়, পাল্টায় রাজনীতির সমীকরণ, চোর সাধু
হয়, সাধু হয় চোর; গণতন্ত্রী স্বৈরাচারের মতো আচরণ করে, স্বৈরাচার শুধরে হয়
গণতন্ত্রী- পাল্টায় না শুধু এই কলামিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি। হাত দিয়ে ঝুনা
নারকেল ভাঙার চেয়েও কঠিন যুক্তি দিয়ে এদের পণ ভাঙানো।
হৃদয় সঁপেছি তো
সঁপেছি অথবা হৃদয় টেনে ধরেছি তো ধরেছি। এত কথার পর এখন তবে পাঠকের প্রশ্ন-
আপনি কেন তাহলে লিখছেন কলাম? হ্যাঁ, তর্জনি দিয়ে দেখাচ্ছি যখন অন্যকে, বুড়ো
আঙুল তখন তাক হয়ে আছে নিজের দিকে। লিখছি নিশ্চয়ই এবং অন্যকে করি না বারণও।
গণতন্ত্রের এই এক মহানত্ব- কাঁচা আবেগকেও প্রশ্রয় দেয়। আর প্রশ্রয় পেলে যা
খুশি লিখতেই তো পারি। দ্বিতীয় কথা, দাবার অধিকাংশ গ্রান্ড মাস্টারই যে
রাশিয়ার, তার কারণ সেখানে সবাই দাবা খেলে। কোনো বিষয়ে পার্টিসিপেশন যত বেশি
হবে, ট্যালেন্ট প্রস্ফুটিত হওয়ার সম্ভাবনা ততটাই বেড়ে যাবে। কাঁচা আবেগ যে
কখনই পাকবে না, কে জানে? লেখালেখি কিংবা আবেগ তো আর আলু নয় যে, দিন গেলে
পচে কিন্তু পাকে না। তৃতীয়ত, কলামের মাধ্যমে অনিয়ম-অন্যায়ের প্রতিবাদ তো
করা যায় অন্তত। তা না হলে সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে একটা ধারা
বহমান রয়েছে, সেটাই তো ভুলে থাকত অন্যায়কারীরা। কখনও কখনও প্রতিবাদে কাজও
হয়। সাত খুনের বিচার হয়েছে, রামপাল বন্ধ করতে না পারি, বঙ্গবন্ধুর নামে
নির্মিতব্য বিমানবন্দরের জায়গাটি তো পরিবর্তন করতে পেরেছি। অতএব খবরদার,
কলাম লেখা বন্ধ করবেন না!
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com

No comments:
Post a Comment