মেয়েটির
নাম মেহেরুন্নেসা মুবাশ্বির। রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের
বিবিএ শিক্ষার্থী। বয়স ২৫-এর কোঠা অতিক্রম করতে এখনও ঢের বাকি। বাবাহারা
মেহেরুন্নেসা পাঁচ বোনের মধ্যে তৃতীয়। তারুণ্যের এ বয়সে যার প্রাণোচ্ছল
থাকার কথা, সেই বয়সেই কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় শয্যাশায়ী
মেহেরুন্নেসা। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার দুটি কিডনি বিকল হয়ে পড়েছে। বেঁচে
থাকার জন্য সপ্তাহে চারবার ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছে।
কিন্তু তার পরিবারের
পক্ষে এ ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালানো একপ্রকার অসম্ভব। চিকিৎসকরা তাই কিডনি
প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেখানেই যত প্রতিবন্ধকতা আর
অসহায়ত্ব। যুগান্তরের কাছে অশ্রুসজল চোখে এসব কথা জানান তিনি। মেহেরুন্নেসা
জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কিডনি বিকল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর
চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশীদ ও অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলামের কাছে
যান। তারা প্রত্যেকেই তার অবস্থা বিবেচনা করে কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ
দেন। প্রতিস্থাপনের পূর্ব পর্যন্ত ডায়ালাইসিস চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
যেখানে প্রতি ডায়ালাইসিসে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা প্রয়োজন সেখানে মাত্র দেড়
থেকে দুই লাখ টাকার মধ্যে দেশেই কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব। তাই ডায়ালাইসিস
ব্যয়বহুল হওয়ায় তিনি কিডনি প্রতিস্থাপনের চেষ্টা শুরু করেন।
পাঁচ বোনের
মধ্যে একজনের সঙ্গে রক্তের গ্রুপে মিল থাকলেও বয়সে ছোট হওয়ায় তার কিডনি
নেয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় খালাতো বোন কিডনি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
কিন্তু চিকিৎসকরা খালাতো বোনের কিডনি নিতে অস্বীকৃতি জানান। চিকিৎসকরা
জানান, মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ১৯৯৯ অনুযায়ী শুধু
স্বামী-স্ত্রী, প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে, বাবা-মা, প্রাপ্তবয়স্ক ভাই, বোন,
রক্ত সম্পর্কিত চাচা, ফুপু, মামা, খালা ছাড়া কারও কিডনি নেয়া যাবে না
এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা তাকে দেশে প্রতিস্থাপন না করে বিদেশে যেতে পরামর্শ
দেন। পাশের দেশে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, কিডনি প্রতিস্থাপনে ১৮ থেকে
২০ লাখ টাকা প্রয়োজন। এ টাকা জোগাড় করা তার বা তার পরিবারের পক্ষে একেবারেই
অসম্ভব। ঘটনার আকস্মিকতায় একপ্রকার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে অসুস্থ থেকে
অসুস্থতর হয়ে পড়ছেন মেহেরুন্নেসা। তার দু’চোখে এখন শুধুই শূন্যতা। ঠিক এ
রকম একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মানবদেহে
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন ও প্রতিস্থাপনের দুটি ধারা (আইন) কেন বেআইনি ও অবৈধ
ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের
বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে
গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ড. ইউনুছ আলী
আকন্দ। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন বিশ্বজিত রায়। শুনানিতে আইনজীবী ইউনুস
আলী আকন্দ বলেন, মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ১৯৯৯-এর ২ (খ) ও (গ) তে
বলা আছে রক্তসম্পর্কীয় পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা, ভাই,
বোন ও আপন চাচা,
ফুপু, খালা এবং স্বামী-স্ত্রীকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন করতে পারবে।
কিন্তু এ্যাপোলো হাসপাতালে বর্তমানে (তৎকালীন) চিকিৎসাধীন মো. বাবুলকে তার
মামাতো ভাই এমএ রশিদ কিডনি দান করতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেটি গ্রহণ
করতে রাজি হয়নি। কিডনি প্রতিস্থাপন করতে চাইলে আদালতের আদেশ নিয়ে আসতে বলা
হয়। তখন এমএ রশিদ হাইকোর্টে (ওই আইনটি চ্যালেঞ্জ করে) এ সংক্রান্ত একটি রিট
আবেদন করেন। দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হওয়ার পর একটি দালাল চক্র তৈরি
হয়। যারা মিথ্যা কথায় অশিক্ষিত, দরিদ্র মানুষদের ভুলিয়ে কখনওবা জোর করে
কিডনি নিয়ে বিক্রি করত। একপর্যায়ে কিডনি বেচাকেনা বাণিজ্যে পরিণত হয়। এ
পরিস্থিতি প্রকট আকার ধারণ করলে সরকার এ আইন প্রণয়ন করে। তবে আইনি
বাধ্যবাধকতায় দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পেয়েছে বলে
জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন বাঁচাতে এ আইনের
কিছুটা সংশোধনের দাবি জানান দেশের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্টরা বলেন,
কিডনি প্রতিস্থাপনের চাহিদা অনুযায়ী দেশে যথেষ্ট পরিমাণে সংকট রয়েছে। আইনি
জটিলতা, পরিবার ছোট হওয়ায় দাতা না থাকা এবং দানপরবর্তী দাতাদের শারীরিক
সমস্যাসহ বিভিন্ন কিডনি রোগীর প্রতিস্থাপন অনেকটা দুরবস্থা। অবস্থার
উত্তরণে উন্নত দেশের মতো মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে কিডনি সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
অন্যথায় বিপুলসংখ্যক কিডনি রোগী বাঁচানো অসম্ভব।
সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কিডনি প্রতিস্থাপন বিষয়ক এক
সংবাদ সম্মেলনে দেশের প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপনকারী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এমএ
ওয়াহাব, অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া, অধ্যাপক এএ সালাম, অধ্যাপক এসএ খান, রফিকুল
আলম, নেফ্রোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম সেলিম, অধ্যাপক
ডা. হাবিবুর রহমান দুলাল এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেন। তারা বলেন,
বিশ্বব্যাপী ক্রনিক কিডনি রোগের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রায় দুই
কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। গড়ে ৩৫ হাজার রোগীর কিডনি স্থায়ীভাবে
অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর মধ্যে মাত্র ২০ ভাগ রোগী কিডনি প্রতিস্থাপনের আওতায়
আসেন। এ রোগ হলে বাঁচার উপায় দুটি, কিডনি নিয়মিত ডায়ালাইসিস এবং
প্রতিস্থাপন। ডায়ালাইসিস অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা। তাই সবার পক্ষে এই
প্রক্রিয়ায় বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রচলিত আইনে কিডনি প্রতিস্থাপন
বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক কিডনি রোগী বাঁচাতে ‘মানবদেহের
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন’ সংশোধন করা প্রয়োজন।

No comments:
Post a Comment