সিরাজগঞ্জের
এনায়েতপুর থানার আওয়ামী লীগ নেতা ও জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাজী
সুলতান মাহমুদ ও তার সহযোগীরা ঘাটাবাড়ি এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায়
পুকুর কেটে ২টি ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে প্রকাশ্যে হাজার হাজার ঘনফুট
বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে। গত সাড়ে ৩ বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা বিক্রি
করেছে। একই জায়গায় ৬০-৬৫ গভীর করে বালু উত্তোলনের ফলে চার পাশের ফসলী জমি ও
বসতবাড়ী পুকুরে ধসে পড়ছে। এছাড়া চক্রটি পাউবো’র জমি প্লট বানিয়ে বিক্রি
করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগ এবং স্থানীয়
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রহস্যজনক নিক্রিয়তায় বালু ও ভূমিদস্যুরা বেপরোয়া
হয়ে উঠেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগে জানা যায়, এনায়েতপুর থানার জালালপুর ইউনিয়ন
পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি হাজী সুলতান মাহমুদ
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের কিছু অসাধু প্রকৌশলীর যোগসাজসে ২০০৮ সালে
ঘাটাবাড়ী এলাকায় পাউবো’র প্রায় ২৬ বিঘা জমি ইজারা নেয়। এর মধ্যে ৬ বিঘা
জমিতে পুকুর কেটে মাছ চাষ শুরু করেন। পরের বছর বিশাল আয়তনের পুকুরে ২টি
ড্রেজার মেশিন বসিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট বালু উত্তেলন করে
প্রকাশ্যে বিক্রি করছেন। একটানা বালু উত্তোলনের ফলে পুকুরের চারপাশে ধ্বস
নেমেছে। ইতোমধ্যে পুকুরে দুইটি বসত বাড়ি ও কয়েক বিঘা ফসলি জমি ধ্বসে গেছে।
বিশাল পুকুরের আশপাশের অনেক বসতবাড়ি ও আবাদি জমি হুমকীর মুখে পড়েছে। এছাড়া
ইজারা অবশিষ্ঠ জমি প্লট করে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেকেই প্লট কিনে বাড়ীঘর
তৈরি করে বসবাস করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন বালু ও
ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। এ কারণে তারা আরো
বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রভাবশালী এই চক্রের ভয়ে এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ টু
শব্দ করার সাহস পর্যন্ত পাচ্ছেন না। সরেজমিন ঘাটাবাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়,
পাউবো’র জমি লীজ নিয়ে প্রভাবশালী চক্রটি পুকুর কেটে দেশীয় প্রযুক্তিতে
তৈরি ২টি ড্রেজার বসিয়ে পাইপের সাহায্যে পুকুরের তলদেশে থেকে বালু উত্তোলন
করছে। বর্তমানে পুকুরটির গভীরতা দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৬৫ ফুট। পরে উত্তোলিত
বালু জালালপুর ও পাশ্ববর্তী খুকনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে চড়া দামে বিক্রি
করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বালু উত্তোলনের ফলে গভীর খাদে পরিণত হওয়া
পুকুরটির চারপাশের আবাদী জমি ও বসতভিটা একটু একটু করে ভেঙে পড়ছে। বড় ধরনের
ধ্বস নামার আশঙ্কায় পুকুরের চারপাশের বসতিরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। দুইটি
বসত বাড়ি ও কয়েক বিঘা ফসলি জমি পুকুরে ধ্বসে গেছে।
প্রভাবশালী চক্রটি
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের বেলকুচি উপ-বিভাগের আওতাধীন ঘাটাবাড়ীর পুকুর
থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন সাহায্যে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করে সাড়ে ৩
বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এদিকে সরকার মোটা অংকের টাকা
রাজস্ব হারাচ্ছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রাশসনের কিছু
দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজসে চক্রটি অবৈধভাবে বালুর ব্যবসা
চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের রহস্যজনক নিরবতায় বালু ও ভূমিদস্যু
চক্রটি দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজন কৃষি জমির মালিক ও
বাড়িওয়ালা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রভাবশালী বালুদস্যুরা
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের ফসলী জমিতে পুকুর কেটে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন
বছর ধরে বালু উত্তোলন করে প্রায় দেড় কোটি টাকা বিক্রি করেছে। এছাড়া পানি
উন্নয়ন বিভাগের জমি প্লট আকারে বিক্রি করে চক্রটি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে
নিচ্ছে। অনেকেই প্লট কিনে বাড়ী তৈরি করে বসত করছেন। জালালপুর ইউনিয়ন যুবলীগ
নেতা ও ইউপি মেম্বর বাহারুল ইসলাম বালু উত্তোলন ও প্লট বিক্রিতে ইউপি
চেয়ারম্যার হাজী সুলতান মাহমুদকে সহযোগীতা করছে। তারা দু’জনই ক্ষমতাসীন
দলের নেতা হওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। এ নিয়ে এলাকার মানুষের
মাঝে চাপা ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে জালালপুর ইউনিয়ন
আওয়ামীলীগের সভাপতি হাজী সুলতান মাহমুদ সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে
তিনি জানান,
২০০৮ সালে মাছ চাষের জন্য প্রায় সাড়ে ৩ হেক্টর (২৬ বিঘা) জমি
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগ থেকে ইজারা নেয়া হয়েছে। প্রতি বছর শতাংশে ৮
টাকা হিসেবে খাজনা জমা দেয়া হচ্ছে। প্রতি বছর বণ্যার সময় পানির সাথে বালু
এসে পুকুর ভরে যায়, ড্রেজার দিয়ে সেই বালু তুলে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসনক, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ
প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই বালু উত্তেলান করে বিক্রি করা হচ্ছে। তার দাবি এই
বালু ব্যাবসা বৈধ। জালালপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা শহিদুল
ইসলাম মোবাইল ফোনে জনান, বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জনানো হয়েছে। কিন্তু
তাদের কোন নির্দেশনা না পাওয়ায় বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ
ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী
প্রকৌশলী হাসান ইমামের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি উৎকোচ
গ্রহনের কথা অস্বীকার করে বলেন, বালু উত্তোলনের বিষয়টি তার জানা নেই। তবে
সরেজমিন তদন্ত করে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা
গ্রহনের জন্য বেলকুচি উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেয়া হবে। এ ব্যাপারে
বেলকুচি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মোবাইল ফোনে জানান, বেলকুচি
কর্মস্থলে ৩ মাস আগে তিনি যোগদান করেছেন। এ বিষয়ে কেউ তাকে কোন রিপোর্ট না
করায় কিছুই জানতে পারেননি।
এখন বিষয়টি জানার পর সরেজমিন তদন্ত করে জড়িতদের
বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জনৈক
প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা ইজারা
প্রদান করার আগে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। তবে কোন ক্রমেই ভূমির
শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না এবং প্রতি বছর ইজারা নবায়ন করতে। পাউবোর
জমিতে পুকুর কেটে বালু উত্তোলন করা অন্যায় এবং এর জন্য সিরাজগঞ্জ পাউবো’র
নির্বাহী প্রকৌশলীকে জবাবদিহি করতে হবে। যে জায়গায় ৬০-৬৫ ফুট গভীর করে বালু
উত্তোলন করা হচ্ছে তার চার পাশের এলাকা ধ্বস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দিকীর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ
করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়টি তার নজরে নেই। তবে দ্রুত খোঁজ নিয়ে ঘটনার
সাথে জড়িত বালু ও ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তারা যতো
প্রভাবশালীই হোক না কেন, কোনো ছাড় দেয়া হবে না।

No comments:
Post a Comment