Wednesday, February 22, 2017

জাতিসংঘের স্বীকৃতির উদ্যোগ

ইতিহাসের কাল রাত ২৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায়ের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সরকার শিগগিরই এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, প্রথমে এ দিনটিকে গণহত্যা দিবস পালনের ঘোষণা দেয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি যেভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে মর্যাদা লাভ করে, ঠিক সেই প্রক্রিয়ায় গণহত্যা দিবসটির আন্তর্জাতিক রূপ দিতে জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জনে নানা পদক্ষেপ নেয়া হবে। এরই অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের ওপর বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নৃশংসতার চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সব মানুষের কাছে নতুন করে তুলে ধরা হবে। প্রথমবারের মতো ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে একাত্তরের ২৫ মার্চ স্মরণে দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব ওঠে।
বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ এ প্রস্তাব করেন। এ প্রস্তাবের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, একাত্তরের ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশবাসীকে সোচ্চার হতে হবে। নতুন প্রজন্মকে জানানো উচিত আমাদের ইতিহাস। দেশে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে যাতে পালন করা হয়, সেজন্য জাতীয় সংসদে প্রস্তাব আনা যেতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবেও দিবসটি যাতে পালিত হয়, সেজন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে প্রয়োজনীয় সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত পাঠিয়ে জোর দাবি জানানো হবে বলে জানান তিনি। সোমবার ওসমানী মিলনায়তনে একুশে পদক বিতরণ ও মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে আবারও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদে একাত্তরের ২৫ মার্চ স্মরণে গণহত্যা দিবস পালনের দাবি ওঠার পর সোমবার ধানমণ্ডিতে সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগ এ নিয়ে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে পাকিস্তানি প্রচার-প্রপাগান্ডার সমুচিত জবাব দিতে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে দিনটিতে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসে কী কী কর্মসূচি পালন করা হবে তা পরে আরেকটি বৈঠক করে সেখানে প্রস্তাব দেয়া হবে। এরপর এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হবে বলে আওয়ামী লীগের ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস আওয়ামী লীগের একার দাবি নয়, সবার অভিন্ন দাবি হওয়া উচিত। দিবসটি পালনের জন্য আলোচনা হয়েছে জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ২৫ মার্চ যে ‘জেনোসাইড’ হয়েছে তার ‘ডকুমেন্ট’ জাতিসংঘে আছে। ওই দিন কী ঘটনা ঘটেছিল তা পাকিস্তানি জেনারেলদের লেখাতেও রয়েছে। সে সময় সাংবাদিকরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন। আমরা এসব ডকুমেন্ট নিয়ে গণহত্যা দিবসকে আন্তর্জাতিকভাবে পালনের জন্য জনমত তৈরি করব। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এত পরে কেন গণহত্যা দিবস পালনের বিষয় এলো? উত্তরে ওবায়দুল কাদের বলেন, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারতো আগে হয়নি। তাছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার এখনও চলছে। জানা গেছে, পাকিস্তানের করাচি থেকে প্রকাশিত জুনায়েদ আহমেদের ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ, মিথস এক্সপ্লোডেড’ বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচারের পর গণহত্যা দিবস পালনের বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনায় আসে। ওই বইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, ৩০ লাখ শহীদসহ মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানা ঘটনা বিকৃতভাবে উত্থাপন করা হয়। এ বইটি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর ডিরেক্টর জেনারেল বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠালে ইতিহাস বিকৃতি ও মিথ্যাচারের বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নজরে আসে। সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ’৭১-এর মহাসচিব হারুন হাবীব যুগান্তরকে বলেন, ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস পালনে সরকারের এ উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। তার কারণ এ দিনটি পালনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মাঝে ইতিহাস সচেতনতা গড়ে উঠবে। বিশ্ব গণমাধ্যম, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘের নথিতে এটা বিশ শতকের সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম গণহত্যা বলে স্বীকৃত। তিনি বলেন, আমরা বহু বছর ধরে দাবি করে আসছি পাকিস্তানি বাহিনী যে দিনটিতে গণহত্যা শুরু করে, সে দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হোক। হারুন হাবীবের মতে, যদি ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তাহলে ২১ ফেব্রুয়ারি যেভাবে অন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হয়েছে ঠিক সেভাবেই এক সময় আমরা দাবি তুলতে পারব ২৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হোক।
মাতৃভাষা বাংলার জন্য আত্মত্যাগের ভাস্বর একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ১৯৯৯ সালে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য স্বীকৃতি পায়। ওই বছর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। পরের বছর ২০০০ সাল থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে বিশ্বের ১৯০টি দেশে পালিত হচ্ছে। ভাষার দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তাৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির ওপর যে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, তারই ধারাবাহিকতায় নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতার চরম রূপ ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। বাঙালি জাতিসত্তাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ২৫ মার্চ সংঘটিত গণহত্যাটি ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরিকল্পিত সামরিক অভিযান। ওই অভিযানে শুরুতে ঢাকার ফার্মগেটে মিছিলরত বাঙালির ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা কালীমন্দিরে অভিযান চালিয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামসহ সারা দেশেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ওই দিন কত মানুষ নিহত হন তার সুনির্দিষ্ট হিসাব অবশ্য এখনও জানা যায়নি।

No comments:

Post a Comment