বাংলাদেশে
যে ক’জন রাজনৈতিক ইতিহাসের গবেষক আছেন, তাদের মধ্যে বদরুদ্দীন উমর সবচেয়ে
অগ্রগণ্য। ভাষা আন্দোলনের ওপর নিবিড় গবেষণা করে তিনি ‘পূর্ব বাংলার ভাষা
আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ নামে তিন খণ্ডে যে গ্রন্থ রচনা করেছেন, সেই
গ্রন্থ তাকে অমরত্ব দান করবে। এ গ্রন্থটি ছাড়াও তিনি অনেক বিষয়ে লিখেছেন,
যেগুলোর একাডেমিক মূল্য অপরিসীম। বর্তমানকালের ছাত্রছাত্রীরা যদি তার রচিত
গ্রন্থগুলো পাঠ করে, তাহলে তারা উন্নততর জীবনবোধে উজ্জীবিত হয়ে উঠবে।
আমাদের দুর্ভাগ্য, গভীর গবেষণা ও চিন্তামূলক লেখার প্রতি হাল আমলের
ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ খুব একটা দেখা যায় না। ফলে দেশের মানুষ ও দেশের
ইতিহাস সম্পর্কে তাদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। জনাব উমর দৈনিক
যুগান্তরে ‘কাগমারী সম্মেলনের ৬০ বছর পূর্তি’ শিরোনামে একটি নাতিদীর্ঘ কলাম
লিখেছেন। কলামটি অত্যন্ত সময়োপযোগী হয়েছে। আমরা অনেকেই ভুলতে বসেছিলাম, ৬০
বছর আগে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে একটি ঐতিহাসিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এ
সম্মেলন ইতিহাসের চাকাকে ভিন্ন এক মোড়ে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। যে রাজনৈতিক
বিবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের উত্থান, সেই বিবর্তনের
পথরেখায় কাগমারী সম্মেলন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। জনাব উমরের
লেখাটি প্রকাশের আগেই গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভাসানী অনুসারী পরিষদের উদ্যোগে
ঢাকায় কাগমারী সম্মেলনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি অতি অনাড়ম্বর অনুষ্ঠান
হয়েছিল। আশা করেছিলাম এ অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা আরও ভালো আয়োজনের মধ্য
দিয়ে অনুষ্ঠানটি করবেন। কিন্তু আমাদের সে আশা পূরণ হয়নি। এক বেলার এ
অনুষ্ঠানে ছিল ছবির প্রদর্শনী এবং আলোচনাসভা। ভাসানী অনুসারী পরিষদের এ
উদ্যোগ এবং উমর সাহেবের লেখার পর কাগমারী সম্মেলনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে
আরও সফল অনুষ্ঠানাদি হবে, এটাই আশা করব। কাগমারী সম্মেলন আমাদের স্বাধীনতার
ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে
পাকিস্তান আমলে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত ইস্ট পাকিস্তান হাউস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল
ভূমিকা পালন করেছে। লন্ডনে যেসব বাঙালি ছাত্রছাত্রী উচ্চ শিক্ষার্থে গমন
করত তাদের মধ্যে স্বাধীনতার চিন্তা ছড়িয়ে দিয়ে ইস্ট পাকিস্তান হাউস এ দেশের
শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রসর মানুষদের আরও অগ্রসর চিন্তার দিকে টেনে নিয়েছিল।
এই ইস্ট পাকিস্তান হাউসের অন্যতম সংগঠক ছিলেন ড. কবিরুদ্দীন আহমদ। তিনি
একজন অর্থনীতিবিদ। সম্ভবত তিনি এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যাপনা করছেন
অথবা অবসর জীবনযাপন করছেন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পাকিস্তান
সরকার যে বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করত, তথ্যভিত্তিকভাবে তার উন্মোচন ঘটিয়ে
টহযধঢ়ঢ়ু ঊধংঃ চধশরংঃধহ শিরোনামে একটি পুস্তিকা রচনা করেছিলেন। এ পুস্তিকাটি
বিশাল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। ড. কবিরুদ্দীন সেই সময় রাজনৈতিক
চিন্তাচেতনার দিক থেকে কমিউনিস্ট ঘেঁষা ছিলেন বলে তার বন্ধুবান্ধবরা তাকে
কবিরোভস্কি নামে ডাকত। ইস্ট পাকিস্তান হাউসের সঙ্গে আরও যারা জড়িত ছিলেন
তাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জাকারিয়া চৌধুরী, ব্যারিস্টার
জমিরুদ্দীন সরকার, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার সাখাওয়াত হোসেন,
আলমগীর কবির, তসদ্দুক আহমদ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। ইস্ট পাকিস্তান হাউসের
কর্মকাণ্ডের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থেকে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর লন্ডনে স্বাধীনতা
সংগ্রামীরা দ্রুত সংগঠিত হতে পেরেছিল। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর পক্ষেও
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কর্মকাণ্ড শুরু করা সহজতর হয়। আলমগীর কবির
ছিলেন চিত্রনির্মাতা। সুঠামদেহী এ মানুষটি বাংলাদেশ হওয়ার পর ফেরি থেকে
গাড়িসহ নদী বক্ষে পড়ে যাওয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধের পর
তিনি ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন। তিনি ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডেতে চলচ্চিত্রের পাতা
সম্পাদনা করতেন। দেশে ফিরে আসার অল্প ক’দিন পর ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলে
গ্রেফতার হন।
তাকে বিনা বিচারে কারাগারে বেশ কিছুদিন আটক থাকতে হয়েছিল।
ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকায় ব্রিটিশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা কারাগারে তার
খোঁজখবর রাখতেন। তার কাছে শুনেছি, স্বাধীনতার জন্য সাহায্য লাভের আশায়
তিনি কিউবার বিপ্লবী প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে কিউবায় গিয়ে দেখা
করেছিলেন। তিনি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ারি বুমেদিনের সঙ্গেও একই বিষয়
নিয়ে আলাপ করেছিলেন। এ থেকেই বোঝা যায় আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল
বহুমাত্রিক। এর অনেক খুঁটিনাটি দিক এখনও অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে। যতদিন এসব
ঘটনা অনুদ্ঘাটিত থেকে যাবে ততদিন আমাদের স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ফুটে
উঠবে না। জনাব উমর তার লেখার শুরুতে বলেছেন, মওলানা আবদুল হামিদ খান
ভাসানীর আহ্বানে ও উদ্যোগে ৮-১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭ তারিখে তিন দিনব্যাপী
অনুষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। সেই সঙ্গে হয়েছিল এক
সাংস্কৃতিক সম্মেলন। তাতে যোগদান করেছিলেন পূর্ব বাংলা, পশ্চিম পাকিস্তান,
ভারত এবং অন্যান্য দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা। সব মিলিয়ে
কাগমারীতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এমন এক সম্মেলন যার সঙ্গে তুলনীয় কোনো সম্মেলন
আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। ইতিহাসবিদ আবদুল করিম তার ‘সমাজ ও জীবন’ আত্মজীবনী
গ্রন্থে তার অভিজ্ঞতার কথা লিখতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আমি মওলানা ভাসানীকে মাত্র
দুইবার দেখেছি- একবার এসএম হলের সামনে ছাত্র-সভায়, অন্যবার পূর্ব
পাকিস্তান আইনসভার সামনে।
আমরা ছাত্ররা মিছিল নিয়ে যাই রাষ্ট্রভাষা বাংলার
দাবিতে, তিনি স্বল্পক্ষণ বক্তৃতায় জানিয়ে দিলেন, তিনি কোনোদিন
বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, এখনও করবেন না। রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবেই। এসএম হলের
সামনে বক্তৃতা করেন আওয়ামী মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতিপর্বে। দুইবারই
আমরা তার বক্তৃতায় খুশি হয়েছিলাম। তিনি ছিলেন ওজস্বিনী বক্তা, বক্তৃতা শুরু
করলে বক্তব্য শেষ না করে ছাড়তেন না। অনেকেই বলতেন তিনি ছিলেন ডেমাগগ,
অর্থাৎ যুক্তিতর্কবিহীন আবেগপূর্ণ বক্তা, তার নেতৃত্বে জনগণের আস্থা ছিল
এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংকটের সময় সঠিক বক্তব্য দিতেন। যাই হোক,
ভাসানী পাকিস্তানের সামরিক জোটে যোগদানের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং ১৯৫৪
সালের শেষ দিকে তিনি এবং তার সমমনা সহকর্মীরা তাদের মতের সমর্থনে আওয়ামী
লীগ কাউন্সিলের প্রস্তাব পাস করেন। সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর
ভাসানীর সঙ্গে তার মতবিরোধ হয় এবং আওয়ামী লীগের ভাঙন হয়। এ প্রশ্ন ছাড়াও
ভাসানী এ সময়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তব্যের সঙ্গে পাকিস্তানের বিভিন্ন
ভাষাভাষী প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কেও বক্তব্য রাখতে থাকেন। ১৯৫৭
সালের প্রথমদিকে মওলানা ভাসানী কাগমারীতে একটি সাংস্কৃতিক সম্মেলনের আয়োজন
করেন। ফেব্রুয়ারির এ সম্মেলন উদ্বোধন করেন তিনি নিজে, উদ্বোধনী বক্তৃতায়
তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে তার বিখ্যাত ‘সালামু আলাইকুম’ উচ্চারণ
করেছিলেন। তখন ছিল এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। তার বিরোধীরা এ বক্তব্য
রাষ্ট্রদ্রোহমূলক আখ্যা দেয়।’ সরাসরি স্বাধীনতা শব্দটি উচ্চারণ না করেও
তিনি তার নিজস্ব ঢঙে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাই দাবি করেছিলেন। আমাদের
স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এ সাহসী উচ্চারণকে কীভাবে গুরুত্বহীন মনে করব?
শুধু এই একটি উচ্চারণের জন্যই কাগমারী সম্মেলন ইতিহাসের পাতায় অতি
গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়ে আছে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাঞ্জাবের চৌধুরী
মোহাম্মদ আলীর অনুসারীদের সঙ্গে কোয়ালিশন গঠন করে সেই সময় পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি বলেছেন, পূর্ব
পাকিস্তানের ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন হয়ে গেছে। যে ২ শতাংশ বাকি আছে তার জন্য
তিনিই যথেষ্ট। অবশ্য এ সময় পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সুবিধাদির জন্য
তিনি বেশ কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। আবুল মনসুর আহমদের লেখা গ্রন্থ
‘আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর’-এ এটা উল্লেখ আছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের
৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের উক্তি আমি
ওই সময়ের পাকিস্তান অবজারভারে পড়েছি। পরলোকগত কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা তার
‘স্মৃতিকথায়’ লিখেছেন, ‘সম্মেলনের শক্তি পরীক্ষায় তিনি (সোহরাওয়ার্দী)
অবতীর্ণ হলেন। ভাসানীও ঠিক করেছিলেন- তিনি তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী
পররাষ্ট্রনীতিতে অটল থাকবেন। এদিকে পার্টির (কমিউনিস্ট) পক্ষ থেকে অধ্যাপক
মোজাফফ্র এবং আমি মওলানার সমর্থনে দাঁড়ালাম। প্রস্তাবটি আগেই তৈরি করে
রেখেছিলাম। আমরা সেটি মওলানার হাতে দিলাম। মওলানা ভাসানী তার চিরকালের
স্বভাবসুলভ অভ্যস্ত পদ্ধতিতে প্রস্তাবটি পাঠ না করে তার নিজ ভাষায়
প্রস্তাবের বিরুদ্ধে (সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাব) বক্তব্য দিয়ে প্রস্তাবের
কপিটি আমার হাতে দিয়ে তা প্রেসে দিতে বলেন। আমরা তদনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ
করলাম। ইতিমধ্যে জনাব সোহরাওয়ার্দী ভিন্নভাবে তার নিজস্ব পদ্ধতিতে তার
পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে উপস্থিত প্রেসকে ‘বুকিং’ করলেন। এ খবর মওলানা ভাসানীর
কানে পৌঁছা মাত্রই তিনি ত্বরিত গতিতে প্রেসকে ডেকে পাল্টা বিবৃতি দিলেন।
ফলে কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত মওলানা ভাসানীরই বিজয়
হয়েছে বলে সবাই ধরে নিলেন।
পরাজয়ের মুখে জনাব সোহরাওয়ার্দী উত্তেজিত হয়ে
পড়েছিলেন এবং কালবিলম্ব না করে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করলেন। ইতিমধ্যে তার
নির্দেশে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছাত্র-জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। ওই জনসভায়
তিনি তার কুখ্যাৎ ‘জিরো থিয়োরি’ প্রচার করলেন। এ ‘জিরো থিয়োরি’ আবিষ্কারের
একটা পটভূমি পূর্বাহ্নে গড়ে উঠেছিল। ওই সময় এক ঘরোয়া আলোচনায় আমি তাকে
বলেছিলাম, আপনি শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে মুসলিম মধ্যপ্রাচ্যের দিকে না
তাকিয়ে আমেরিকার দিকে হাত বাড়ান কেন? তার উত্তরে তিনি বলেছিলেন, Do these
Muslims show power? There are so many Zero. Zeros plus Zero is equal to
yero. Put the digit 1 (one). Behind the Zero and it makes ten. In this
way you go on adding more Zeros and it will give meaningful strength. So
I want to take the help of United States of America. জনাব সোহরাওয়ার্দী
ছিলেন তর্কবাগিশ ব্যক্তি। তার জিরো থিয়োরি সাময়িকভাবে বুদ্ধিজীবী মহলে কিছু
বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে সক্ষম হলেও শেষ কূল রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।’
আমরা সবাই জানি ৬০ ও ৭০-এর দশকে জোটনিরপেক্ষতার নীতি মর্যাদার আসনে
প্রতিষ্ঠিত হয়। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
একক পরাশক্তিতে পরিণত হওয়ার অবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পৃথিবী এখন
মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ডে পরিণত হতে চলেছে। যদিও এ চলার পথ খুবই বন্ধুর।
মওলানা ভাসানী কাগমারী সম্মেলনে এ দরিদ্র দেশটিতে যে শিখা প্রজ্বালন
করেছিলেন তার আলো এখন পৃথিবীর সব জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বজনমত এখন অন্যায়
যুদ্ধের বিরুদ্ধে।
মোহাম্মদ তোয়াহা আরও লিখেছেন, ‘আসলে পররাষ্ট্রনীতির
প্রশ্নের আড়ালে জনাব সোহরাওয়ার্দী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদ লাভের আশায়
কমিউনিস্টবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগের
সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে ওলি আহাদের অপসারণের ঘটনা থেকেই তা
সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এবার বাকি কমিউনিস্টদের বিতাড়নের পালা। পিকচার হাউসে
জনাব সোহরাওয়ার্দীর সুস্পষ্ট ঘোষণা (যারা তার পররাষ্ট্রনীতি মানবে না,
তারা আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যাবে) থেকে আমরা উপলব্ধি করেছিলাম হাওয়া কোন
দিকে বইছে। কাজেই ওলি আহাদ এবং আমি বিতাড়িত হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগের
সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিলাম। আওয়ামী লীগ থেকে আমাদের পদত্যাগ কমরেড সুধীন
রায়ের (খোকা রায়) মনঃপূত হয়নি। কিন্তু তিনি ঋধরঃ ধপপড়সঢ়ষর হিসেবে এটা মেনে
নিলেন। বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল জোটনিরপেক্ষ স্বাধীন
পররাষ্ট্রনীতির কথা বলে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ প্রায় সব দলই স্বাধীন
পররাষ্ট্রনীতির প্রবক্তা। এদের কারোর পক্ষেই প্রকাশ্যে মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার কথা বলতে শোনা যায় না। অবশ্য
অপ্রকাশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ কিছু ছাড় দেয়া হয়। অন্যদিকে এমন
ধারণাও প্রচলিত আছে যে, মার্কিন আশীর্বাদ না থাকলে ক্ষমতায় যাওয়া যায় না।
এসব কথার সত্যতা গভীর গবেষণার বিষয়।
তবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’, কারও সঙ্গে
বৈরিতা নয়, নীতি কতটা বাস্তবানুগ তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ কথাও অনেকে বলেন,
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু তার শত্রুর প্রয়োজন হয় না। পাশাপাশি এটিও
লক্ষণীয়, এ দেশের মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের অনেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে
ইমিগ্রেন্ট হতে চায় এবং হয়েছেও। সেখানে এখন যারা আছেন তারা কত সুখে আছেন
তারাই বলতে পারবেন। পঞ্চমের দশকে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি থাকায় এ দেশের
কমিউনিস্টরা মওলানা ভাসানীর ছত্রচ্ছায়ায় আওয়ামী লীগে কাজ করত। পরবর্তীকালে
১৯৫৭ সালে তারা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে আবারও মওলানা ভাসানীর ছত্রচ্ছায়ায়
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপে কাজ করতে থাকে। পরে নানা সময়ে তারা
মওলানা ভাসানীকে পরিত্যাগ করে। আজ অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রশ্ন তোলেন,
১৯৫৭ সালে কমিউনিস্টরা যদি মাটি কামড়ে আওয়ামী লীগেই থেকে যেত তাহলে এ দেশের
সমাজ ও রাজনীতির চেহারা কী হতো? যদি কমিউনিস্টরা সেই কৌশলই গ্রহণ করত
তাহলে তাদের রাজনৈতিক সংগ্রামে অনেক বেশি মেধার পরিচয় দিতে হতো। তারপরও কথা
থেকে যায়।
মস্কো-পিকিংয়ের দ্বন্দ্বের সময় তারা কীভাবে ঐক্য বজায় রাখত।
অবশ্য ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টি ঐক্য বজায় রেখেই এবং নিজস্ব স্বকীয়তা
রক্ষা করেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছে। সুতরাং খাঁটি
দেশপ্রেমিক এবং মেহনতি মানুষের বন্ধুদের জন্য ঐক্য এবং স্বকীয়তার প্রশ্নটি
খুবই জরুরি। আগামী দিনের সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে নতুন করে ভাবতে হবে এ যুগে
মানুষে মানুষে সমতা অর্জনের লড়াই-সংগ্রাম কোন পথ ধরে অগ্রসর হবে এবং
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার স্বরূপ এবং কাঠামো কী হবে। ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন
যে স্বপ্নের জন্ম দিয়েছিল, তার বাস্তবায়নের জন্য আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে
হবে।
ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ
ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

No comments:
Post a Comment