সম্প্রতি
নির্বাচন কমিশন গঠনের পর বিএনপি গতানুগতিক ধারার বিরোধীদলীয় সুরে যেভাবে
কথা বলছে তাতে মনে হয় না নির্বাচনী পথে হাঁটতে দলটি সঠিক পথের দিশা পেয়েছে।
বিএনপি নেতৃত্ব যদি মনে করে সিইসি নিয়োগ ইস্যুতে প্রতিবাদী হয়ে দলকে
চাঙ্গা করবে, তাহলে আমি বলব ছন্নছাড়া দশায় হাবুডুবু বিএনপি নেতৃত্ব হয়তো পথ
হারিয়েছে। নির্বাচনী প্রস্তুতি ছাড়া অন্যসব বাকোয়াজ বিএনপি
কর্মী-সমর্থকরাও ভালোভাবে নেবে বলে মনে হয় না। বর্তমান ধারায় বিভিন্ন দলের
কাছ থেকে নাম নিয়ে এর ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠনের কোনো হেতু খুঁজে পাই
না আমি। সার্চ কমিটিই যদি খুঁজবে তবে অন্যদের মতামত দেয়ার সুযোগ থাকার কথা
নয়; কিন্তু আমাদের রাজনীতির অদ্ভুত সব আচরণ থাকছেই। দুর্বল বিএনপির মানা
উচিত তারা অমন পদ্ধতিতে গিয়ে ট্রাম্পকার্ডটি শাসকগোষ্ঠীর হাতে দিয়েই
দিয়েছে। এখন প্রয়োজন গৎবাঁধা আহাজারি না করে এবং বারবার একই ভুল পথে না
হেঁটে নির্বাচন সামনে রেখে দলকে সংগঠিত করা। তারও আগে প্রয়োজন
যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্কছেদের ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনের মাঠে আসা।
সবল ও
প্রবলকে অনেকভাবে ছাড় দেয়া যায়; আর দুর্বলকে টিকে থাকতে হলে, ঘুরে দাঁড়াতে
হলে ছাড় দিতে হয়। সতেরো শতকের কবি আবদুল হাকিম দেশপ্রেম আর আত্মোপলব্ধি
থেকে যথার্থই বুঝেছিলেন মাতৃভাষার প্রতি যাদের ভালোবাসা-শ্রদ্ধা নেই তাদের
জন্ম-পরিচয়ও প্রশ্নবিদ্ধ। অমন দুরাত্মাদের কবি দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে
বলেছেন। কবির ভাষায়- যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সব কাহার জন্ম
নির্ণয় ন জানি ॥ দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়/নিজ দেশ তেয়াগী কেন
বিদেশ ন যায় আজ আবদুল হাকিমের মতো দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত কোনো কবি থাকলে
মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা, বাংলাদেশে বাস করে দেশের অস্তিত্বকে
প্রকারান্তরে অস্বীকার করা মানুষগুলোকে হয়তো এভাবেই ধিক্কার দিতেন। আরও
ধিক্কার দিতেন এদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও। এ সময়ে বিএনপির প্রথম প্রয়োজন
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তাদের অবস্থানের
বিষয়টি পরিষ্কার করা। ‘জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট’ ধরনের ফালতু কথা
মানুষ গ্রহণ করবে না। জামায়াত বা হেফাজতের মতো ধর্মবণিকদের শেষ পর্যন্ত
গণমানুষের অন্তরের কাছে পৌঁছা সম্ভব নয়। এগারো শতকে সেন ব্রাহ্মণ শাসকরা
ধর্ম নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করে সাধারণ হিন্দুদের শোষণ করতে পেরেছিল; কিন্তু
এ পদাংক অনুসরণ করে পাকিস্তানি শাসকচক্র ধর্মবণিক দলগুলো দিয়ে আত্মরক্ষা
করতে পারেনি।
আজ জামায়াত-হেফাজতরা একটি গণ্ডিবদ্ধ তালবেলেম গোষ্ঠীর ভয়
দেখিয়ে আমাদের ক্ষমতাপ্রিয় দলগুলোকে কিছুটা নতজানু করতে পারলেও সাধারণ
মানুষের আস্থায় কখনও আসতে পারবে না। এ একুশ শতকের বাংলাদেশের আধুনিকমনস্ক
মুসলমান প্রকৃত ইসলামবিরোধী সস্তা ওয়াজকে মাথা পেতে নেবে না। তারা
যুক্তি-বুদ্ধি আর জ্ঞান দিয়ে বিচার করবে। তারা মুরব্বি হুজুরের বয়ানকে আমলে
নেয়ার চেয়ে তাফসির জেনে ধর্মের বাণীকে গ্রহণ করবে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাননি, তাতে কি তাকে জ্ঞানী বলে
স্বীকৃতি দিতে ধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে কারও দ্বিধা আছে? অনেককাল আগের কথা।
এক ওয়াজ মাহফিলে একজন ‘ইসলামী চিন্তাবিদ’ বলেছিলেন, মুসলমান ঘরের
ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শিক্ষা দিয়ে বেদ্বীন বানানো হচ্ছে। সব মুসলমানের উচিত
সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দ্বীনী শিক্ষা দেয়া। তরুণ বয়সেই আমার এ যুক্তি
মানতে দ্বিধা হয়েছিল। পরে মহানবীর বিখ্যাত হাদিসটি আমার মনের ধোঁয়াশা দূর
করে দেয়। ‘শিক্ষার জন্য সুদূর চীনে যাও’। কী অপূর্ব প্রতীকী উপস্থাপনা।
প্রকৃত বিদগ্ধ জ্ঞানীর পক্ষেই সে যুগে শিক্ষার জন্য নিজ সম্প্রদায়কে এমন
প্রণোদনা প্রদায়ী বক্তব্য প্রদান করা সম্ভব ছিল। জ্ঞানচর্চার পক্ষে পবিত্র
কোরআনের যে শিক্ষা তা খণ্ডিতভাবে নয়, সর্বজনীন পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপন
করেছিলেন মহানবী। নবীর জন্ম-পূর্বের মক্কা তথা আরব ভূমিকে আমাদের
বদ্ধবুদ্ধির কেউ কেউ ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বলতে পছন্দ করেন; কিন্তু সে যুগেও
যে জ্ঞানচর্চায় আরব পিছিয়ে ছিল না সে কথা তো ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে
না। দ্বিতীয় হিজরির পর আরব ভূমিতে লিখন পদ্ধতির উদ্ভবের আগে মুখে মুখে
কবিতা রচিত হতো। ক্বাসিদায় কৌমের গৌরবগাথা প্রচারিত হতো।
ইমরুল কায়েস,
জুবায়ের, আল আসবাহ প্রমুখ কবি ও পণ্ডিতের মধ্য দিয়ে জ্ঞানচর্চার একটি ধারা
তৈরি হয়েছিল। প্রাচীন গ্রিস ও চীনের দর্শন এ যুগের আরব পণ্ডিতের অজানা ছিল
না। পরবর্তী সময়ে খেলাফতের যুগে এসব বহির্বিশ্বের জ্ঞান আরবিতে অনূদিত
হওয়ায় অনুবাদ সাহিত্যে এক শক্ত অবস্থানে পৌঁছে আরব। অস্বীকার করার উপায়
নেই, এ জ্ঞানচর্চার পরিবেশে মক্কায় জন্ম হয়েছিল মহানবীর। জ্ঞানী হিসেবে
যিনি বিশ্বনন্দিত তাঁকে বিশ্বের প্রাচীন জ্ঞান ছুঁয়ে যাবে না, তা মানা যায়
না। তাই কনফুসিয়াসের দর্শনচর্চায় উজ্জ্বল চীন নবীকে আকর্ষণ করবে না তা কি
সম্ভব! সে যুগের ভূগোল বিচারে বলা যায় আরব থেকে চীনে পৌঁছা খুব সহজ ছিল
না। সুতরাং প্রতীক হিসেবে চীনকে বেছে নেয়া নবী নিশ্চয়ই যথার্থ মনে
করেছিলেন। যদি ইসলামী শিক্ষাকে মহানবী একমাত্র গ্রহণযোগ্য শিক্ষা ভাবতেন,
তাহলে যে দেশে ইসলাম প্রবেশ করেনি সেই চীনকেই প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করতেন
না। তিনি জ্ঞানকে ধর্মের সীমাবদ্ধতায় বাঁধতে চাননি। বলতে চেয়েছেন, জ্ঞান
অন্বেষণে হাজার কষ্ট প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে হলেও এগিয়ে যাওয়া উচিত।
ইতিহাসের আলোকে এ ব্যাখ্যা যখন স্পষ্ট হল, তখন করুণা হল আমাদের বদ্ধবুদ্ধির
মানুষগুলোর জন্য। অজ্ঞানতার কারণে ইসলামের শিক্ষার বিশালত্বকে এরা
মুহূর্তে কীভাবে ক্ষুদ্র করে ফেলতে চাইছে! এভাবে বদ্ধবুদ্ধি আর
সুযোগসন্ধানী মানুষরা মুক্তিযুদ্ধের মতো উজ্জ্বল সত্যকেও উড়িয়ে দিতে চাইছে
তুড়ি মেরে। আসলে প্রকৃত জ্ঞানীর পাশাপাশি জ্ঞানমূর্খ আর জ্ঞানপাপী দু’ধরনের
মানুষও থাকে সমাজে। জ্ঞানমূর্খকে করুণা করা যায়; কিন্তু জ্ঞানপাপী ঘৃণার
পাত্র।
প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চা করেও জ্ঞানচক্ষু যাদের উন্মীলিত হয়নি তারা
জ্ঞানমূর্খ অভিধায় অভিহিত হতে পারেন; কিন্তু জ্ঞানপাপী সবই জানেন, তবে
নিজের প্রয়োজনে উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য আংশিক সত্য প্রকাশ করেন, কখনও প্রকাশ
করেন বিকৃতরূপে। আবার নিজের পক্ষে যাবে না বলে অনেক সতর্কতায় সত্যকে গোপন
করার চেষ্টা করেন। বাংলার ইতিহাসের বিখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারকে
কখনও সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিক বলে সমালোচনা করা হয়। তিনি ষোলো শতকের হিন্দু
ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক শ্রী চৈতন্যের উত্থানকে বলতে চেয়েছেন হিন্দুদের ওপর
মুসলমান শাসকদের অত্যাচারের প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া (রমেশচন্দ্র মজুমদার,
বাংলাদেশের ইতিহাস ২য় খণ্ড, মধ্যযুগ, জেনারেল, ৩য় সং, ১৩৮৫ বাং, পৃষ্ঠা
২৬০)। মধ্যযুগের বাংলার সমাজ ইতিহাসের খোঁজ যারা রাখেন তারা জানেন সমকালীন
বাংলার স্বাধীন সুলতানরা এ দেশে ধর্মীয় উদার শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজ
পৃষ্ঠপোষকতা ও আনুকূল্যে এ সময় হিন্দু কবিদের মধ্যে সাহিত্য সৃষ্টির জোয়ার
এসেছিল। উচ্চ রাজপদে বহু যোগ্য হিন্দু নিয়োগ পেয়েছিলেন। চৈতন্যের নব্য
বৈষ্ণববাদের প্রভাবে হিন্দুদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের গতি স্তিমিত হয়ে
গিয়েছিল। শ্রী চৈতন্য যাতে নির্বিঘ্নে তার ধর্ম প্রচার করতে পারেন সে জন্য
ওই যুগের শক্তিমান সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ রাষ্ট্রীয় আদেশ জারি
করেছিলেন। এ ধরনের উদাহরণ যুগে যুগে পাওয়া যায়। সুতরাং দিলে যদি ‘মোহর’
মেরে দেয়া হয় বা রাজনৈতিক সুবিধাবাদের লোভ যদি বুকে বাসা বাঁধে,
সেখানে
রাজনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমলা বা বণিকের তকমা থাকলেও এদের পক্ষে
যুক্তিবাদী মানুষ হওয়া কঠিন। এরা অপব্যাখ্যা করে হলেও ধর্মকে ব্যবহার করে
নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। মিথ্যাচার এদের সিঁড়ি পেরোনোর প্রধান বাহন।
তবে যত অন্ধকারের প্রাণীই এরা হোক না কেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
বিকৃতির অপচেষ্টা তো কম করেনি। কিন্তু এরা কি পরিসংখ্যান নিয়ে দেখেছে নতুন
প্রজন্মের কতজন কিশোর-তরুণ মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন হয়ে
পড়েছে? বরঞ্চ এসব রাখঢাক আর মিথ্যাচার বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃত সত্য
জানার কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের অগ্রজ যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ
নিয়েছিলেন, যুদ্ধের স্মৃতি যাদের কাছে জীবন্ত, একাত্তরের কিশোর আমরা যারা
পাক হানাদার বাহিনীর ভয়ে পরিবার-স্বজনদের হাত ধরে গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে
বেড়িয়েছি, হানাদারদের অত্যাচারের স্বাক্ষর ভস্মীভূত ভিটেতে পোড়া টিনের ঘর
উঠিয়ে আবার বসবাস শুরু করেছি, শীতলক্ষ্যার স্রোতে অসংখ্য মানুষের লাশ ভেসে
যেতে দেখে বুকটা হু হু করে উঠেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে রাজাকার
কমান্ডারের মৃত্যুর খবর শুনে কচি মনে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেছে- আজ তাদের
পরিবারের বেড়ে ওঠা প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ইতিহাস কী দিয়ে আড়াল করা
যাবে? জামায়াতের নামান্তরে রাজাকার, আলবদর, আল শামসের ক’টা পরিবার ছিল এ
দেশে? কোটি কোটি বাঙালিকে এরা কোন জাদুবলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-বিচ্ছিন্ন
করবে?
মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা এসব দেশদ্রোহী কবি আবদুল হাকিমের যুগে
জন্মালে তিনি নিশ্চয় বলতেন ‘এসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। তবে এসব
যুদ্ধাপরাধীর পরিবারের ভেতর থেকে মুক্তচিন্তার দেশপ্রেমিক বাঙালির জন্ম
হচ্ছে না- হবে না কে বলতে পারে। গোকুলে কে কখন কীভাবে বেড়ে উঠছে কে জানে!
তাই এ সময়ে আমরা বিএনপি-রাজনীতির বিবর্ণ দশা দেখতে চাই না। ঘুরে দাঁড়ানোর
জন্য চাই আধুনিক-স্মার্ট বক্তব্য ও কর্মসূচি। ঘুরপথে বা অন্ধকার পথে যে
ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয় সে শিক্ষা তো বিএনপির এতদিনে হয়ে যাওয়ার কথা। আগামী
নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় চলে আসতেই হবে এমন চিন্তা বিএনপিকে
বিভ্রান্তিতে ফেলবে। স্বাধীনতাবিরোধীদের পক্ষপুট থেকে ফেলে দিয়ে নিজের
নিষ্কলুষ অবয়ব নিয়ে সামনে আসা প্রয়োজন সবার আগে। বর্তমান বাস্তবতায় নিজের
মতো করে সিইসি আদায় করা বিএনপির পক্ষে সম্ভব নয়। নির্বাচনকে পাস-ফেলের
সিঁড়ি আর ক্ষমতায় যাওয়ার পরশপাথর না ভেবে দলকে সুসংগঠিত করে রাজনীতিতে ঘুরে
দাঁড়ানো এখন বিএনপি নেতাদের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করি। সুতরাং অযথা
সিইসি বিতর্কে না গিয়ে নির্বাচনের পথে হাঁটাই বিএনপির একমাত্র লক্ষ্য হওয়া
উচিত।
এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnaway7b@gmail.com
এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnaway7b@gmail.com

No comments:
Post a Comment