সবার
আস্থা অর্জন ও আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাই নতুন
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মূল চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন নবনিযুক্ত প্রধান
নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা। তিনি বলেন, নির্বাচনে সব দলের
অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। অন্য কমিশনারদের নিয়ে ঠিক করা হবে কর্মকৌশল।
নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরদিন মঙ্গলবার রাজধানীর উত্তরায়
নিজের বাসায় যুগান্তরের কাছে নতুন সিইসি এসব মন্তব্য করেন। আগামী নির্বাচন
অনুষ্ঠান, ইসির প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন, চাপমুক্ত হয়ে
নিরপেক্ষভাবে কাজ করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলাপ করেন কেএম নুরুল হুদা।
এ ছাড়া অপর দুই কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.)
শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী পৃথক সাক্ষাৎকারে সিইসির মতো প্রায় একই সুরে বলেন,
রাজনৈতিক দলগুলোসহ সবার আস্থা অর্জন করাই নতুন ইসির অন্যতম প্রধান
চ্যালেঞ্জ।
এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিএনপির অভিযোগ,
জনতার মঞ্চের সঙ্গে জড়িত ছিলেন নতুন সিইসি। এ কারণেই ২০০১ সালে তাকে
বাধ্যতামূলক অবসর দেয় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। জানা গেছে,
বাধ্যতামূলক অবসরের সময় কেএম নুরুল হুদা যুগ্ম সচিব ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগ
সরকারের সময়ে ২০০৯ সালে ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত সচিব ও সচিব
করা হয়। অবশ্য এর আগে তিনি এ ব্যাপারে মামলা করে তার পক্ষে আদালতের রায়
পান। তবে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে কাগজে কেএম নুরুল হুদা অতিরিক্ত সচিব ও
সচিব হলেও বাস্তবে এই দুই পদের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। কারণ
ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি পাওয়ার আগেই ২০০৫ সালের ২৮ এপ্রিল তার চাকরির বয়স
শেষ হয়ে যায়। চাকরি হারানোর ওই বঞ্চনার প্রভাব সিইসি হিসেবে দায়িত্ব
পালনকালে পড়বে কিনা- এমন প্রশ্নে দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দেন নতুন সিইসি। তিনি
বলেন, ‘মোটেই প্রভাব পড়বে না। সিইসির দায়িত্ব পালনকালে কোনোদিনই কোনো কাজেই
ওই প্রভাব পড়বে না। ইট ইজ ফরগোটেন, পাস্ট। টোটালি ফরগোটেন পাস্ট। ওটা যেন
কিছুই হয়নি, কোনোদিন হয়নি- এমনটাই মনে করছি।’ বিএনপি ও সমমনাদের বর্জন আর
ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের
অভিজ্ঞতার পর সব দলকে নিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচন করার জন্য কী পদক্ষেপ
নেবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে নতুন সিইসি কেএম নুরুল হুদা বলেন, ‘আমি ছাড়া আরও
চারজন নির্বাচন কমিশনার রয়েছেন। তাদের সঙ্গে বসে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা
অর্জনে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায়, সেই বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা- এমন প্রশ্নের
উত্তরে নবনিযুক্ত সিইসি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি রাজনৈতিক দলগুলোর
সঙ্গে সংলাপে বসা উচিত।
এটা নির্ভর করবে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর, রাজনৈতিক
দলগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর, আমাদের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর কতখানি আস্থা
আছে-তা জেনে শুনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ দলীয় নির্দেশনা বা চাপ এলে
কমিশনের অবস্থান কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশন
কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। আইনের বাইরে কোনো ব্যক্তি, দল বা
গোষ্ঠীর কাছে নির্বাচন কমিশন নত হবে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশন যে ধারায়
কাজ করেছে নতুন কমিশন সে ধারায় এগোবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধারা
কোনো দিন এক থাকে না। ধারা পরিবর্তন হয় পরিস্থিতির ওপর। আমাদের সামনে যে
পরিস্থিতি হবে তার ওপর নির্ভর করে আমাদের কৌশল ঠিক করতে হবে। তাদের (কাজী
রকিবউদ্দীন আহমদ কমিশন) একটা অবস্থান ছিল, আমাদের হয়তো অবস্থা ভিন্ন হতে
পারে। একই ধারা অনুসরণ করা সম্ভব নয়। টানা দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়
থাকায় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের অনেক কর্মকর্তাই সরকারের অনুগত হয়ে পড়েছেন
বলে অভিযোগ সরকার বিরোধীদের। এমন ‘দলবাজ কর্মকর্তাদের’ দিয়ে নিরপেক্ষ
নির্বাচন করা সম্ভব কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এ ব্যাপারে
মন্তব্য করার সময় এখনও হয়নি।
তবে নির্বাচন কমিশন ইন্ডিপেনডেন্ট (স্বাধীন),
সরকার থাকবে সরকারের জায়গায়। নির্বাচন কমিশনের যেই ইন্ডিপেনডেন্ট
ক্যারেক্টার, সেই ক্যারেক্টার দিয়েই নির্বাচন করবে। সংবিধানে ১২৬ অনুচ্ছেদে
বলা হয়েছে, নির্বাচনের সময়ে নির্বাহী বিভাগ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে বাধ্য
থাকবে। নির্বাচনের সময়ে নির্বাহী বিভাগ কমিশনের অধীনে থাকবে। কেউ পক্ষপাত ও
ভুলভ্রান্তি করলে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা আইনেই আছে। কেউ যদি এমন কাজ করে,
তাহলে শাস্তি পেতে হবে। রাজনৈতিক সরকারের সময় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করা
দুরূহ- এমন অভিযোগের বিষয়ে কেএম নুরুল হুদা বলেন, আমার বক্তব্য অত্যন্ত
পরিষ্কার। আমার কাজ নিরপেক্ষতা রক্ষা করা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংবিধানের
ধারা সম্মুনত রাখা। এর বাইরে আর কিছু নেই। আমার কাছে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক
দলের গুরুত্ব নেই। বিশেষ কোনো ব্যক্তির গুরুত্ব নেই। বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর
গুরুত্ব নেই। আমার কাছে গুরুত্ব হলো লিগ্যাল ইন্সটুমেন্ট (আইনি হাতিয়ার)।
কোনো লোক অন্যায় সুবিধা আমার কাছ থেকে পাবে না, আশা করি আমার কমিশনের কাছ
থেকেও পাবে না। সিইসি আরও জানান, দীর্ঘদিন সিভিল সার্ভিসে থাকার অভিজ্ঞতা
কাজে লাগিয়ে ‘নিরপেক্ষভাবে’ তিনি দায়িত্ব পালন করতে চান। সরকারি চাকরিতে
থাকার সময় অনিয়মের সঙ্গে ‘আপস করেননি’ এবং ইসির দায়িত্বেও তা ‘করবেন না’
বলে প্রতিশ্রুতি দেন নতুন সিইসি। নির্বাচন কমিশনের অধীনে ছবিসহ ভোটার
তালিকা প্রণয়ন প্রকল্পের এক সময়ের পরিচালক ছিলেন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী। মঙ্গলবার
তিনি বলেন, আমি খুবই খুশি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কমিশনার
হিসেবে এককভাবে কাজ করার সুযোগ কম।
টিম হিসেবে সব কাজ করব, সিদ্ধান্ত নেব।
রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজ ও সাংবাদিকসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার সবার
সহযোগিতা পেলে ইনশাআল্লাহ আমরা সবার আশা পূরণ করতে পারব, সুন্দর নির্বাচন
করতে সক্ষম হব। আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে করতে চেষ্টা করব। ইসির সঙ্গে
রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব ঘুচাতে নতুন ইসি কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, এমন
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কার্যক্রম শুরু করিনি। তবে ব্যক্তিগত মনে
করি, ইনশাআল্লাহ সবার আস্থা ফিরে আসবে। আমরা সেই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেব। অপর
নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, এত
প্রক্রিয়ার মধ্যে রাষ্ট্রপতি আমাকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেয়ায় আমি
গর্বিত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি কাজই চ্যালেঞ্জ। তবে সাধারণ
মানুষের মতো বলতে পারি, সবার আস্থা অর্জন করাই আমাদের বড় কাজ হবে। কমিশনার
বেগম কবিতা খানম বলেন, আমি মনে করি এটি অবশ্যই শক্তিশালী কমিশন। প্রধান
নির্বাচন কমিশনারসহ এ কমিশনের সদস্যরা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে বলে
বিশ্বাস করি।

No comments:
Post a Comment