পৃথিবীর
প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলোর একটির মূল ভাষা যদি বাংলা হতো তাহলে বাংলা একটি
পবিত্র ভাষা হিসেবে সমাদৃত হতো। পৃথিবীর সবচেয়ে দাপুটে ভাষা ইংরেজিতে কোনো
ধর্মগ্রন্থের আত্মপ্রকাশ ঘটেনি। সুতরাং ইংরেজিও পবিত্র ভাষা নয়। ইংরেজিতে
লিখিত যে কোনো বই হাতে তুলে একবার বুকে চেপে মাথা নুইয়ে চুমো খাওয়ার কোনো
মানে নেই। অবশ্য ইংরেজিতে অনূদিত ধর্মগ্রন্থ হলে যথাযোগ্য সম্মান অবশ্যই
পাবে। দুর্ভাগ্যবশত, ধর্মবাহক প্রধান তিনটি ভাষা ল্যাটিন, হিব্রু ও সংস্কৃত
সাধারণ ব্যবহার্য ভাষা হিসেবে মৃত। যে ভাষা মানুষের নিত্যদিনের কাজে লাগে
না ধীরে ধীরে সে ভাষার বিলুপ্তি ঘটে। আরবি ভাষার ভবিষ্যৎ পেট্রোডলারের
প্রভাবে একসময় বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, বেশ কিছু আরবি শব্দ অল্প সময়ের
ব্যবধানে ইংরেজিতে আত্মীকৃত হয়।
কিন্তু ইদানীং সে সম্ভাবনা ম্লান মনে
হচ্ছে। ভাষা গবেষকরা মনে করেন, ধনী আরবি পরিবারের তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে
যারা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী, তারা ইংরেজি ভাষা আঁকড়ে ধরেছেন। যে প্রজন্ম ইউরোপ
ও আমেরিকায় পড়াশোনা করেছে তারা নিজেরাই সন্তানদের ইংরেজিমুখী করে তুলেছেন।
ভাষা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যত পবিত্রই হোক, এর টিকে থাকার গ্যারান্টি
নেই। তাহলে কি শিল্প সাহিত্যে সমৃদ্ধ ভাষার ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল? পৃথিবীর
শ্রেষ্ঠ কিছু সাহিত্যকর্ম সংস্কৃত ভাষা উপহার দিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে
ইংলিশ সাহিত্য দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছে। ১৯৭৮-এ ইডিশ কথাসাহিত্যিক আইজাক
বাসেসিভ সিঙ্গার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন। কিন্তু সংস্কৃত একটি
মৃত ভাষা; ইডিশও মৃত। সিঙ্গার যখন নোবেল পুরস্কার পান তখন পৃথিবীতে সচল
ইডিশ টাইপরাইটারের সংখ্যা এক ডজনও নয়। সিঙ্গারের দৌহিত্রকে পিতামহের গল্প
পড়তে হয়েছে ইংরেজি অনুবাদে। কেউ আর ইডিশ শিখছে না। কারণ ইডিশ অর্থকরী ভাষা
নয়। প্রিন্স বোভো ও ড্রজিয়ানের প্রেমকাহিনী ও বীরগাথা নিয়ে ইডিশ ভাষায়
লিখিত এলিয়া লেভিটার রোমাঞ্চ ১৫৪১-এ প্রকাশিত হয় এবং শতাব্দী না ফুরাতে
অন্তত চল্লিশটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৫৪২-এ প্রকাশিত হয়
ইডিশ-হিব্রু-ল্যাট্রিন-জার্মান চার ভাষার অভিধান। হিব্রু ভাষা দু’হাতে তুলে
নিয়েছে ইডিশ শব্দ। জার্মান, ফরাসি, ইংরেজি ও আরবি অনেক ইউরোপীয় ভাষাকে
ইডিশ অকাতরে দান করেছে শব্দ ও ভাষা ব্যঞ্জনা। তবুও টিকতে পারেনি ইডিশ।
হিটলারকে ইডিশ ভাষাভাষীদের ঘাতক হিসেবে যত গালই দিই না কেন, বিলুপ্তির মূল
কারণটি অর্থনৈতিক।
ইডিশ অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে ক্রমাগত মার খেয়ে যাচ্ছিল
অন্য ভাষার কাছে। যে উর্দু নিয়ে এতসব কাণ্ড ঘটে গেল, উর্দু চাপিয়ে দেবার
চেষ্টা সেখানে ভাষা আন্দোলন সৃষ্টি করল, সেই উর্দুও অর্থকরী ভাষা হয়ে উঠতে
পারেনি। ১৯৪৭-এ ভারত ও পাকিস্তানে যে ক’টা কেবল উর্দু স্কুল ছিল ২০১৭-তে
তার অর্ধেকও টিকে নেই। বাংলা নিয়ে আতঙ্ক একটিই- এ ভাষার বৃহৎ বাজার সৃষ্টি
হয়নি। ইংরেজি জানা প্রার্থী চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবেন এত হামেশাই চাকরির
বিজ্ঞাপনে ছাপা হয়। কিন্তু বাংলা জানা প্রার্থী অগ্রাধিকার পাবে- এমন
বিজ্ঞাপন কারো চোখে পড়েছে কি? প্রতিকার কী? বাংলাকে অর্থকরী ভাষায় পরিণত
করা। কেমন করে? নীতিনির্ধারক ও ভাষা গবেষকরা ভাবুন। বাংলা ভাষার বাজার
সংকটের কথা মাথায় রেখেই লিখে চলেছি। কারণ অন্য কোনো ভাষাকে আমাকে স্বস্তি
দেবে না, মাইকেল মধুসূদন দত্তকেও দেয়নি। এবারের একুশের বইমেলায় আমার নতুন
বই নয়টি বেরুচ্ছে। উপন্যাস সোনালি (প্রথমা), তাতিয়ানা (আলোঘর); ছোটগল্প
পতিদাহ (অন্বেষা), মুক্তিযুদ্ধ একাত্তরের দলিল (আলোঘর); অনুবাদ গল্প
সুরাটের কফি হাউস ও অন্যান্য গল্প (আলোঘর), অনুবাদ নন-ফিকশন খুশবন্ত সিং
(কথাপ্রকাশ), প্রবন্ধ কালাশনিকভ ও অন্যান্য প্রবন্ধ (অন্বেষা), কৃত্রিম
জাগরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ (জয়তী) অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

No comments:
Post a Comment