Thursday, February 9, 2017

সাম্য ও সম্প্রীতির চেতনায়

একুশের চেতনা একুশ শতকে এখন আর শুধু মাতৃভাষা কেন্দ্রিক নেই। এটা আমাদের অধিকারের নানা বিষয়ের প্রশ্নটাকে বড় করে তোলে। একুশের চেতনাকে দেখতে হবে বহুমাত্রিক বিস্তারে। যে বিস্তারে জীবনের নানা দিকের সফলতা জড়িয়ে আছে। আজকে আমরা যদি বলি, একুশের চেতনার মানে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ তাহলে এ সত্যও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে, আজকের বাংলাদেশে আমাদের জন্য সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ অত্যন্ত জরুরি। কিছুদিন আগে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের নিয়ে যে ঘটনাটি ঘটল সেটা কিন্তু একুশের চেতনাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করায় না। সুতরাং আবার যদি প্রতিরোধ গড়তে হয় তাহলে একুশের মূল চেতনাবোধকে শ্রদ্ধার জায়গা থেকে নতুন করে তুলে ধরতে হবে।
একুশের চেতনা আমাদের বাঙালিত্বের চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা। বাঙালির অধিকার আদায়ের চেতনা- একথা সত্যি কিন্তু সেই বাঙালিত্ব কিংবা বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিংবা বাঙালির অধিকার- অন্য ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতি গোষ্ঠির অধিকার পদদলিত করবার চেতনা নয়- অর্থাৎ, আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ নয়। একইভাবে আমরা নাসিরনগরের ঘটনাটির কথা বলতে পারি- যে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশে যেন আর এই ধরনের সাম্প্রদায়িক অধঃপতনের ঘটনা না ঘটে। আমাদের যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, যে ঐতিহ্য সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির, সমন্বয়ের সেই ঐতিহ্য আমাদের একুশের চেতনার প্রাণ। আমরা যেন সেই প্রাণ শক্তিকে না হারাই। একুশ আমাদের জীবনে হাজার বছরের সেই ঐতিহ্যের অনিবার্য উপস্থিতি। আমরা চাই অধিকারের জায়গা থেকে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে, মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে একুশ যেন আমাদের সাংস্কৃতিক বোধকে সমুন্নত রাখে। আমরা যেন মারতে মারতে একটি শিশুকে একদম মেরেই না ফেলি। যে শিশুটিকে গাছের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে মেরে ফেলা হল- সেটা একুশের চেতনাকে সমুন্নত করে না। যে মেয়েটি গণধর্ষণের শিকার হয়, সেই মেয়েটির লজ্জা একুশের চেতনাকে পরিহাস করে। সমাজে নারী ও শিশুর প্রতি যে অমানবিক আচরণ আমরা এখনো লক্ষ্য করি তা প্রতিনিয়ত একুশের অর্জনকে ম্লান করে। তাই একুশের চেতনাকে জীবনের সবক্ষেত্রে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় পরিণত করতে হবে। একুশের চেতনা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন দেশ অর্জনের মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায়নি। একুশের সংগ্রাম আজও অব্যাহত রয়েছে- নারীর অধিকার, শিশুর অধিকার, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার, সর্বোপরি বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পরিণতি লাভ করবে একুশের সংগ্রাম।
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

No comments:

Post a Comment