একুশ
একটি সংখ্যা তবে সংখ্যা মাত্র নয়। একুশ একটি প্রতীক তবে প্রতীকের চেয়ে বড়
কথা একুশ বাঙালি অস্তিত্বের, বাঙালির সম্প্রসারণমানতার এবং বাঙালির মঙ্গলময়
অগ্রসরময়তার দ্যোতক। একুশের সূচনা হয়েছিল বাঙালির ভাষাভিত্তিক বোধ, ঐক্য ও
বিপ্লব থেকে। ভাষা মানে মাতৃভাষা, যে ভাষায় মানুষ নিজেকে উপলব্ধি করতে
পারে, নিজের উপলব্ধ সত্য অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারে। একুশের মাধ্যমেই
বাঙালি নিজেকে শনাক্ত করতে পেরেছে। কারণ মাতৃভাষার চেতনাতেই মানুষ নিজেকে,
নিজের মূল অস্তিত্বকে উপলব্ধি করার প্রথম স্বাদ উপলব্ধি করে। ভাষার ওপর
আঘাত আসার মানে তাই একজন ব্যক্তির অস্তিত্বের ওপর আঘাত আসা, একটা পরিবারের
এবং একটা গোষ্ঠীর, একটা জাতির সামষ্টিক অস্তিত্বের ওপর আঘাত আসা। বাঙালি
এটাকে মেনে নেয়নি।
মেনে নেয়নি বলে পরাধীন বাঙালি স্বাধীন হওয়ার পথ পেয়ে
যায়। বাঙালি বারবার প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, আঘাতে এবং বিদ্রোহে জেগে উঠেছে।
বায়ান্ন সালের যে একুশ- এরপর প্রতিবছর তেপ্পান্ন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত
প্রতিবছর তার পরিপ্রেক্ষিত পাল্টেছে। বায়ান্নর একুশ ছিল শুধুমাত্র ভাষার
অধিকারের এবং বায়ান্নের পরবর্তী প্রতিটি একুশ ভাষার অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে
নিজের অস্তিত্বের অধিকারের দাবিটি তুলে নিয়ে এসেছে। এভাবে ভাষা থেকে এসেছে
সাংস্কৃতিক অধিকারের কথা, সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে রাজনৈতিক অধিকারের কথা,
সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের কথা এবং পরিপূর্ণভাবে বাঙালির সার্বিক
স্বাধীনতার কথা। তাই ভাষার জন্য যারা প্রথম বিদ্রোহ করেছে এবং প্রাণ দিয়েছে
তারাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ। আমি বলি- ‘মায়ের ভাষার মান রাখতে
জীবন দিল যারা/বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম শহীদ তারা।’ সেই শহীদদের পথ
ধরে, সেই আত্মত্যাগের পথ ধরে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম, স্বাধিকারের
সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়েছে। বারবার একুশ
তার পরিপ্রেক্ষিত পাল্টে এভাবেই দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে। বিংশ শতাব্দীর
দ্বিতীয়ার্ধে এসে বাঙালি যখন পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করল- স্বাধীনতা অর্জনের
পর বাঙালির নতুন যুদ্ধ হল, বাঙালির সার্বিক মুক্তির চেতনা। সেই মুক্তির
চেতনার প্রণোদনাও দিচ্ছে একুশ- সে মুক্তি হল অর্থনৈতিক মুক্তি। সে মুক্তি
হল,
মানুষের মঙ্গলময়তার মুক্তি। সে মুক্তি হল, সদাচারের মুক্তি। সে মুক্তি
হল, নান্দনিক ও মানবিক মুক্তি। এভাবেই একুশ দীপ্ত থেকে দীপ্তিময় হয়ে ওঠে।
একুশ শতকে এসে আমরা যে সংকটের মুখে পড়েছি সে সংকট হল মূলত, মানবিক
সম্পর্কের সংকট এবং বিশ্বব্যাপী মানবিক ঐক্যের সংকট। এই সংকট মোকাবেলায়ও
একুশ আমাদের পথ প্রদর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করতে সক্ষম। পৃথিবীব্যাপী যে ভাষিক
বৈচিত্র্য ও সমতা আছে, মাতৃভাষার সমতা এবং প্রতিটি আলাদা আলাদা মাতৃভাষার
যে বৈচিত্র্য- ভাষিক বৈচিত্র্যের মধ্যে যে ঐক্য, তাকে ধারণ করে; সারা
পৃথিবীতে ঐক্যসূত্র রচনা করতে হবে। প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষাকে সমান
মর্যাদায় মালা গেঁথে তুলতে হবে। সহযোগিতার সমন্বয় করতে হবে। এটা যদি করা
যায়, ধর্ম-বর্ণ অন্য সব কিছু প্রভেদের ঊর্ধ্বে শুধু মাতৃভাষার স্বীকৃতি ও
তার বৈচিত্র্য ও ঐক্যের মধ্য দিয়ে পৃথিবীব্যাপী আমরা নতুন মানব-ঐক্যের
সূচনা করতে পারি। এবারের একুশ তার পরিপ্রেক্ষিতকে সেই মানব বৈচিত্র্য ও
মানব-ঐক্যের রচনার প্রণোদনাকেই আমাদের সম্মুখে হাজির করেছে- ভাষিক ঐক্য ও
বৈচিত্র্যের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী মানবিক ঐক্যের কথা বলে। তাই একথা
নির্দ্বিধায় বলতে পারি একুশ এখন বিশ্বজনীন, একুশ সার্বজনীন।
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

No comments:
Post a Comment