আমেরিকার
৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নিয়েছেন গত ২০ জানুয়ারি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প,
যার বয়স ৭০ বছর। গত ৪৪ জন দায়িত্ব পালন করা প্রেসিডেন্টের গড় বয়স ছিল ৫৫
বছর। এ পর্যন্ত মার্কিন ইতিহাসে দায়িত্ব পালনকারী সবচেয়ে কম বয়সী
প্রেসিডেন্ট ছিলেন রুজভেল্ট। নির্বাচিত কংগ্রেসম্যান অথবা গভর্নরের দায়িত্ব
পালন না করেই সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা গত ৬০ বছরের
মার্কিন ইতিহাসে প্রথম। তার ও তার মন্ত্রিসভার কোনো রাষ্ট্রীয় প্রশাসন
চালানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। আড়াইশ’ বছরের ইতিহাসে আমেরিকায় যা ঘটেনি,
ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তা-ই ঘটেছে। সবচেয়ে বড় কথা, শপথ
নেয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৬০টি দেশে ট্রাম্পবিরোধী
প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয়েছে। এ পর্যন্ত ছয়শ’র বেশি বিক্ষোভ হয়েছে, যা এখনও চলছে
অনেক জায়গায়। এর শেষ কোথায় তা কেউ বলতে পারে না। শুধু নারী বিক্ষোভকারীর
সংখ্যাই ৩৫ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে সংবাদমাধ্যমে।
৫০ লাখেরও অধিক মানুষ
বিক্ষোভ করেছে। এই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ দানা বেঁধেছে আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে।
ট্রাম্প তার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বক্তব্যেই বিষোদ্গার করেছেন
সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে। তিনি তার মনের মাধুরী মিশিয়ে সাংবাদিকদের
‘পৃথিবীর সবচেয়ে অসৎ মানুষদের শ্রেণীভুক্ত’ বলেছেন। এভাবে তিনি তার মতো করে
ক্ষমতার যাত্রা শুরু করলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরদিন তিনি সিআইএ’র সঙ্গে
প্রথম সভা করেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ নিয়ে তিনি
সমালোচনায় মুখর ছিলেন। অথচ তাদের সঙ্গে প্রথম বৈঠকে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে
ওঠেন ট্রাম্প। সংবাদপত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক বলা যায় সাপে-নেউলে। বিদায়ী
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শপথ অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানের চেয়ে
বেশিসংখ্যক লোক উপস্থিত ছিল, ইতিহাস তা-ই বলে। ট্রাম্প ক্যাসিনো ব্যবসায়ী
হয়ে শুরু করেন তার ব্যবসায়ী জীবন। এখন তিনি বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের একজন।
তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ৩৭২ কোটি ডলারের মতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে
অনেক ধনী ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও তার মতো ধনী কেউ ছিলেন না।
জর্জ ওয়াশিংটন ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদের মালিক ছিলেন। ট্রাম্প
ইতিমধ্যেই মুসলিমবিরোধী, নারীবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। বিভিন্ন
সময়ে নারীদের নিয়ে তিনি অবমাননাকর বক্তব্য প্রদান করেছেন। এরই প্রতিক্রিয়ায়
নারীদের প্রচণ্ড বিক্ষোভ বিশ্বব্যাপী। তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করে প্রথমেই
ওবামার করা স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির অনেক অংশ বাতিল করে দেন। ইতিমধ্যে
যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থা নেয়া শুরু
করেছেন। এর ফলে বিশেষ করে মুসলিম বৈধ-অবৈধ নাগরিকদের বসবাস করা এবং তাদের
কাজকর্ম করে খাওয়া কঠিন হবে বলেই মনে হয়।
এর আলামত শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই।
নির্বাচনকালীন বক্তব্যে তিনি মুসলিমবিরোধী কথা বলেছেন, অনেকবার মসজিদে তালা
লাগিয়ে দেয়ার কথাও বলেছেন। আমি তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান
করছিলাম। তার সব বক্তব্যই মিডিয়ার কল্যাণে সারা বিশ্বের মানুষ অবগত হয়েছে।
তিনি চীনের বাণিজ্যনীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। চীন থেকে পণ্য আমদানিতে
শাস্তিমূলক ট্যারিফ আরোপের হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প তার জামাতাকে তার
জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন। তার নাম জ্যারেড কুশনার। তিনি বর্তমানে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর জামাই। ট্রাম্পের মেয়ের নাম
ইভাঙ্কা। ট্রাম্পের তৃতীয় স্ত্রী স্নোভেনিয়ান বংশোদ্ভূত মেলানিয়া এখন
ক্ষমতাধর ফার্স্ট লেডি। ট্রাম্প মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাসী নন। তার
মন্ত্রিসভার প্রায় সবাই ধনী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী, রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ- যাকে
কর্পোরেট মন্ত্রিসভা বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্র সংলগ্ন মেক্সিকোর সীমানা
প্রাচীর মেক্সিকোর অর্থে নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। মেক্সিকোর
প্রেসিডেন্ট তার নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেছেন। মেক্সিকোর অবৈধ অভিবাসীদের
ওপর ট্রাম্প খুবই ক্ষুব্ধ।
তাদেরও আমেরিকা থেকে বের করার ইচ্ছা প্রকাশ
করেছেন তিনি। লাখ লাখ মেক্সিকান নাগরিক পার্শ^বর্তী দেশ আমেরিকায় বসবাস
করে। তারা সেখানে নানা কর্মে নিয়োজিত। তারা থাকতে না পারলে আমেরিকায় অনেক
কাজের কর্মী পাওয়া কঠিন হবে। ট্রাম্প জাতিসংঘকে অথর্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে
তিরস্কার করেছেন। তিনি জঙ্গিবাদীদের কোনোভাবে বরদাশত করবেন না বলেছেন, এটি
প্রশংসার দাবিদার। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখবেন ঘোষণা
দিয়েছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে খুবই যোগ্য মনে করেন তিনি। ট্রাম্পের
সঙ্গে পুতিনের সম্পর্ক আপাতত ভালো বলে মনে হয়। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে
সাইবার হ্যাকিংয়ের অভিযোগ তুলেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা
প্রেসিডেন্ট থাকাবস্থায়। পুতিন তার অভিযোগের প্রতিবাদ করেছেন। সাইবার
অ্যাটাক প্রতিরোধ করতে না পারার ব্যর্থতা আমেরিকার। এটা তাদের পরাজয়। সাবেক
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার জন্য তৎকালীন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট গরবাচেভকে
দায়ী করা হয়। ট্রাম্প ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ
জানিয়েছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে ইতিমধ্যেই সাক্ষাৎ করে এসেছেন
ট্রাম্পের সঙ্গে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের অভিষেকের প্রতিবাদ জানিয়ে
যখন বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ নারী ট্রাম্পবিরোধী সমাবেশে শরিক হচ্ছেন, তখন
ব্রিটিশ নারী প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটনে গিয়ে হোয়াইট হাউসে বৈঠকে মিলিত হলেন
ক্ষ্যাপা স্বভাবের ট্রাম্পের সঙ্গে। বিশ্ববাসী বিশ্বমোড়ল আমেরিকার দিকে
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে। সাত মুসলিম দেশের নাগরিকদের আমেরিকায় প্রবেশের ওপর
নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর নিজের পক্ষে সাফাই গাইলেন ট্রাম্প। তিনি বললেন,
গণমাধ্যম এটা মিথ্যা প্রচার করেছে, এটা মুসলিমদের ওপর নিষেধাজ্ঞা নয়, একটি
নিরাপদ নীতি গ্রহণ করে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সব দেশের নগরিকদের
ভিসা দেয়া হবে। তিনি আরও বলেছেন,
এটা ধর্মসংক্রান্ত বিষয় নয়, বরং সন্ত্রাস
প্রতিরোধ এবং আমেরিকাকে নিরাপদ রাখার বিষয়। ‘একস্ট্রিম ভেটিং অর্ডারের’
মাধ্যমে ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইরান, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকদের
আগামী চার মাস আমেরিকায় প্রবেশের ভিসা প্রদান বন্ধ থাকবে। সিরীয় নাগরিকদের
ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত।
প্রেসিডেন্টের নির্বাহী এই আদেশের প্রতিবাদের ঝড় বইছে বিশ্বজুড়ে। সিয়াটলের
আদালতে ৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্টের আদেশ স্থগিত করে দেন বিচারপতি জেমস
রবার্ট। ট্রাম্প বিচারককে ‘তথাকথিত বিচারক’ বলে তিরস্কার করেছেন। আদালতের
আদেশ উল্টে দেবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র শন স্পাইসর
ট্রাম্পের আদেশকে যথার্থ বলেছেন এবং উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। ট্রাম্প
ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্টের অভিবাসন নীতির বিরোধিতা করায় অ্যাটর্নি জেনারেলকে
বরখাস্ত করেছেন। ট্রাম্পের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাবার্তা ও কাজকর্মে আদালত
অবমাননা হয়েছে বলে মনে হয়। তার কর্মকাণ্ডে আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে ব্যাপক
প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। চীন,
ইরান, উত্তর কোরিয়াকে তিনি যা ইচ্ছা তা-ই বলছেন। অস্ট্রেলিয়ার
প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলের সঙ্গে ফোনালাপের সময় তাকে ধমক দিয়ে ফোন
রেখে দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ঘটনা শিষ্টাচারবহির্ভূত, অবিবেচনাপ্রসূত এবং
তার বিকৃত মানসিকতার পরিচয় বহন করে। এভাবে চলতে থাকলে আমেরিকা ও সেদেশের
প্রেসিডেন্টের মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে এবং সারা বিশ্বে
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে
নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মেয়াদকাল পূরণ করতে
পারবেন কিনা তা বলা যায় না। তবে আমেরিকাকে রক্ষা করতে পারে তাদের সংবিধান,
সিনেট ও বিচার ব্যবস্থা।
কাজী শওকত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
কাজী শওকত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

No comments:
Post a Comment