আমাদের
বাঙালি জাতিসত্তায় যে জাগরণ তার সূচনা ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে। ভাষা আন্দোলন
থেকে আমরা উপলব্ধি করলাম যে ভাষার দাবি এবং বাঁচার দাবি এর মধ্যে কোনো
তফাৎ নেই। যখন পাকিস্তান হয়েছিল তখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলাদেশকে তাদের
উপনিবেশ বা কলোনি বলে ভাবতে শুরু করেছিল। সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত
করল তারা পশ্চিম পাকিস্তানকে কিন্তু ব্যয়ভার জোগাল পূর্ববাংলা। সব উন্নয়ন
কর্মকাণ্ড পশ্চিম পাকিস্তানে আর দেশের গরিষ্ঠ অঞ্চল পূর্ববাংলাকে তারা
শোষণের ক্ষেত্রভূমি বিবেচনা করতে আরম্ভ করল। সশস্ত্র বাহিনীর তিনটি
কেন্দ্রই প্রতিষ্ঠা হল পশ্চিম পাকিস্তানে, গরিষ্ঠ ব্যয় কে বহন করল?
-পূর্ববাংলা। সশস্ত্র বাহিনীতে তাদের অংশ ৯৬ শতাংশ আর পূর্ববাংলার ৪ শতাংশ।
প্রশাসনে পূর্ববাংলার ৬ শতাংশ আর ৯৪ শতাংশ পশ্চিম পাকিস্তানের।
বৈষম্য
আকাশচুম্বী, ভাবো পার্থক্যটা! ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা প্রথম বুঝতে
শুরু করলাম যে, এই পাকিস্তান তো আমাদের জন্য হয়নি, বাঙালির জন্য হয়নি।
রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক উন্নয়ন সর্বক্ষেত্রে আমাদেরকে নিষ্পেষিত করার
ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। তাদের
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ছিল স্ববিরোধী, মারাত্মক একটা প্রতারণা। আমরা
প্রতারণাটা ধরতে পারলাম। আর সে জন্যই পাকিস্তানের শাসক শ্রেণীর প্রতিনিধি
জিন্নাহ যখন ঢাকায় এসে ঘোষণা করলেন যে, ‘উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র
রাষ্ট্র ভাষা’ তখন ছাত্ররা একাট্টা হয়ে প্রতিবাদ জানাল ‘না’ ধ্বনিতে।
বাঙালি জাতি এই প্রথম সঠিক আবেগে, সঠিক সময়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিল। আমি
তো মনে করি, ছাত্রদের এই যে ‘না’ ধ্বনি, এটাই বাঙালির বিদ্রোহের প্রতীক।
যে বাঙালি কোনো অন্যায়কেই মেনে নেবে না। এই ‘না’ ধ্বনি থেকেই শুরু হল
পাকিস্তানিদের রচিত সীমাহীন বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রামের
পটভূমি। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এমন আত্মোৎসর্গের উদাহরণ
পৃথিবীতে বিরল। জাতিসংঘে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
রূপে স্বীকৃতি দেয়া হল এজন্য যে, মাতৃভাষার জন্য আর কোনো জাতি এমন ত্যাগ
স্বীকার করেনি। আমরা দেখতে পাই যে,
’৫২ থেকে উঠে এসেছে ’৬২-র ছাত্র
আন্দোলন; ’৬২-র পর ’৬৬-তে এসে আমরা পরিপূর্ণভাবে বুঝলাম যে, বাঙালি
সম্পূর্ণ একটা আলাদা জাতি। আমাদের স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। কেন্দ্রীয়
সরকারের হাতে পররাষ্ট্র, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার দায়িত্ব রেখে করারোপসহ
অন্যান্য বিষয়ে পূর্ববাংলার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সিদ্ধান্ত নেবেন এমন
শিথিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানালাম। আমরা পাকিস্তানের প্রদেশগুলোর
স্বায়ত্তশাসন, সকল ভাষার সমান মর্যাদার দাবি করলাম কিন্তু পাকিস্তানি শাসক
শ্রেণী সেই সামান্য অধিকার দিতেও রাজি হয়নি। এটা উল্লেখ করা দরকার যে,
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ’৬৬-র স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের
নেতৃত্ব দিয়ে দেশের একমাত্র নেতায় পরিণত হন। পরবর্তীতে ৬ দফা দাবিতে
বঙ্গবন্ধু পরিণত হলেন দেশের অবিসংবাদী নেতায়। জনসাধারণ ‘এক নেতা এক
দেশ/বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ এই মন্ত্রে, এই ধ্বনিতে উচ্চকিত হয়ে উঠলেন। এই
সবকিছুর মূলে কিন্তু একুশের চেতনা। বাঙালির অন্যায় প্রতিরোধী বিদ্রোহী
চেতনার জন্ম দিয়েছিল উনিশ শ’ বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। অনুলিখন : শুচি
সৈয়দ

No comments:
Post a Comment