আগামী
সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন সাবেক
রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী কমপক্ষে এক ডজন
রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে সম্ভাব্য এ জোট গঠনের প্রস্তুতি চলছে। সবকিছুু
ঠিকঠাক থাকলে মার্চের শেষদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করবে নতুন এই
নির্বাচনী জোট।
এছাড়া দলকে নির্বাচনের জন্য পুরোদমে প্রস্তুত করতে প্রার্থী
বাছাইসহ একগুচ্ছ পরিকল্পনা হাতে নিয়ে এগোচ্ছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান।
দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান,
আগামী জাতীয় নির্বাচনে যারা মনোনয়ন পেতে আগ্রহী তাদের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে
তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ ৩৭টি সাংগঠনিক জেলার
সম্মেলন এপ্রিলের মধ্যে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আগামী ১৮ মার্চ
রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হবে।
মহানগর, উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড সম্মেলন আয়োজনের জন্য কেন্দ্র থেকে
ইতিমধ্যে তৃণমূলকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অপরদিকে দল গোছাতে
বৃহত্তর জেলাগুলোয় সাংগঠনিক সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন হুসেইন মুহম্মদ
এরশাদ। নতুন জোট গঠনের বিষয়টি স্বীকার করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন
মুহম্মদ এরশাদ রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘বেশকিছু রাজনৈতিক দল অনেক দিন ধরে
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। অনেকে আমার সঙ্গে নানা দফায় বৈঠক করেছেন। এদের
মধ্যে বেশ কয়েকটি নিবন্ধিত দল রয়েছে। কিছু দলের নিবন্ধন নেই। কিন্তু তাদের
সমাজে পরিচিতি আছে। এরা সবাই জাতীয় পার্টিকে সামনে রেখে একটি নতুন জোট
গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। আমরাও নানাদিক বিবেচনায় নিয়ে জোট গঠনের
বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি জানান, ‘এই জোট হবে মুক্তিযুদ্ধের
চেতনা এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে।’ তিনি আরও
বলেন, ‘এটি হবে মূলত একটি নির্বাচনী জোট।
শরিক দলগুলোর মধ্যে ভালো প্রার্থী
থাকলে এবং সেই প্রার্থীর জয়ী হয়ে আসার সম্ভাবনা থাকলে আমরা তাদের আসনে ছাড়
দেব।’ কোন কোন দল জাতীয় পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, কাদের নিয়ে জোট
হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, কৌশলগত কারণেই এখন
নাম বলব না। এজন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। সময় এলে আমরা সবকিছু
জানান দিয়েই করব।’ জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও সাবেক
মন্ত্রী এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘বেশ
কয়েকটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সবাই স্যারকে সামনে রেখে একটা জোট গঠনের আগ্রহ
প্রকাশ করেছেন। আমরাও ভেবে দেখলাম- আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট আছে।
বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট রয়েছে। জাতীয় পার্টিও দেশের একটি বড়
রাজনৈতিক দল। সেক্ষেত্রে কেউ যদি আমাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে চায়, তবে তাদের
আমরা সঙ্গে নিয়ে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি জোট গঠন করতেই পারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব ভাবনা থেকেই আমাদের পার্টি চেয়ারম্যান জোট গঠনের
সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী মার্চের শেষদিকে জাতীয়
পার্টির নেতৃত্বে নতুন জোটের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটবে। এই জোট হবে
নির্বাচনী জোট।’
কোন কোন দল জাতীয় পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, কাদের নিয়ে
জোট গঠিত হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন,
‘অনেকেই যোগাযোগ করেছে। পার্টি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আরও অনেকে
বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এটুকু বলা যায়, ১০ থেকে ১২টি দল নিয়ে জোট হবে।
তবে কৌশলগত কারণেই এই মুহূর্তে কারও নাম প্রকাশ করা ঠিক হবে না।’ খোঁজ
নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের কয়েকটি শরিক দলও ভেতরে
ভেতরে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট গঠনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দলগুলোর শীর্ষ
নেতারা ইতিমধ্যে এ ইস্যুতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ
এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারা কেন বিএনপি জোটে থাকতে চান না সে বিষয়ে
তাদের বেশ কিছু যুক্তিও তুলে ধরেন। সূত্র জানায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০
দলীয় জোট থেকে বিভিন্ন সময় বেরিয়ে যাওয়া কয়েকটি দলও জাতীয় পার্টির সঙ্গে
জোটভুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিএনপির সাবেক নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল
হুদার নেতৃত্বাধীন জোট বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট অ্যালায়েন্সের (বিএনএ) শরিক
একাধিক দলও জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট করায় আগ্রহ জানিয়েছে। এছাড়া ১৪ দলীয়
জোট এবং ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা কমপক্ষে এক ডজন রাজনৈতিক দল নানা সময়ে
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে নয়া জোট গঠনের আগ্রহ জানিয়ে কথা বলেছেন। এর
বাইরে কয়েকটি ইসলামী ঘরানার ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গেও জোট গঠন ইস্যুতে জাতীয়
পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।
জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, ‘জাতীয় পার্টির প্রতি
সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। অনেকেই জাতীয় পার্টির মধ্যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা
দেখতে পাচ্ছেন।
এ কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা যোগাযোগ শুরু
করেছেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে নেতাকর্মীদের নিয়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয়ার
আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাদের অনেকে ইতিমধ্যে যোগ দিয়েছেন। অনেকে আবার
জোটভুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আমিও ভেবে দেখলাম, বিএনপির জোটে ২০ দল
আছে। আওয়ামী লীগের আছে ১৪ দল। আমরাও একটি জোট করলে খারাপ হবে না। তাই দুই
জোটের বাইরে আলাদা একটি জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ সংশ্লিষ্টরা জানান,
নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের এ উদ্যোগের পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে ভালো ফলাফলের
আশায় একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন
মুহম্মদ এরশাদ। পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে সঙ্গে নিয়ে দল
গোছানোর ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে- প্রার্থী
বাছাই, তৃণমূল পর্যায়ে পার্টিকে শক্তিশালী করা, যেসব জায়গায় কমিটির মেয়াদ
উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, সেখানে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন, সাংগঠনিক সফর
প্রভৃতি। আগামী তিন মাসের মধ্যে কাজগুলো সম্পন্ন করতে চান জাতীয় পার্টির
চেয়ারম্যান। দলের শীর্ষ নেতাদেরও মাঠ পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াতে এবং পার্টিকে
শক্তিশালী করতে আরও তৎপর হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যে
কেন্দ্র থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলাগুলোতে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।
১৮ মার্চ রংপুর জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির সম্মেলন শুরু হবে। হুসেইন
মুহম্মদ এরশাদ এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া ২৫ মার্চ
পঞ্চগড়, ১৫ এপ্রিল কুড়িগ্রাম, ২৮ মার্চ গাজীপুর, ২৯ মার্চ গোপালগঞ্জ,
৩০
মার্চ শরীয়তপুর, ১ এপ্রিল ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগর, ২ এপ্রিল নেত্রকোনা, ১০
এপ্রিল নরসিংদী, ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর, ১০ মার্চ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ২১ মার্চ নোয়াখালী, ২২ মার্চ ফেনী, ২৩ মার্চ চাঁদপুর, ১৫
এপ্রিল খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান, ১৬ এপ্রিল রাঙ্গামাটি, ২৫ মার্চ রাজশাহী
মহানগর ও নওগাঁ, ২৭ মে রাজশাহী জেলা, ১৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ, ১৪
এপ্রিল যশোর ও মাগুরা, ১১ মার্চ ভোলা, ৫ এপ্রিল বরিশাল জেলা, ৬ এপ্রিল
ঝালকাঠি, ৭ এপ্রিল পিরোজপুর, ৪ এপ্রিল সুনামগঞ্জ, ২১ এপ্রিল সিলেট মহানগর,
২৩ এপ্রিল হবিগঞ্জ, ২৪ এপ্রিল মৌলভীবাজার, ২৫ এপ্রিল সিলেট জেলা জাতীয়
পার্টির সম্মেলনের তারিখ কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত করে দেয়া হয়েছে। পার্টির
কেন্দ্রীয় নেতারা এসব সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন। জেলার পাশাপাশি মহানগর,
উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডগুলোতেও সম্মেলনের আয়োজন করতে কেন্দ্র থেকে
তৃণমূলকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম
রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘আমরা আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সর্বাত্মক
প্রস্তুতি শুরু করেছি। আমরা মনে করি দল গোছানোর কাজ আগে শেষ করতে হবে। তাই এ
কাজটিই সবার আগে শেষ করব। দল গোছানোর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে যেসব জেলা ও
উপজেলায় কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে সেসব জেলা ও উপজেলায় সম্মেলন শেষ করতে
নির্দেশনা দিয়েছি। আগামী এপ্রিলের মধ্যে সম্মেলন শেষ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা জাতীয় পার্টির টিকিটে প্রার্থী হতে চান
তাদের জেলা কমিটির মাধ্যমে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পার্টি চেয়ারম্যান
বরাবর নাম পাঠাতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক জেলা নাম পাঠিয়েছে। বাকিরাও আশা
করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নাম পাঠাবে।’

No comments:
Post a Comment