বিসিএসের
২৭টি ক্যাডারের পরীক্ষা দু’ভাগে নেয়ার সুপারিশ করছে সরকারি কর্মকমিশন
(পিএসসি)। এই সাংবিধানিক সংস্থাটি বর্তমানে অভিন্ন তিন পরীক্ষার মাধ্যমে
সরকারি ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগের সুপারিশ করে থাকে। কিন্তু সব ধরনের
ক্যাডারের জন্য অভিন্ন এই পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। এ কারণে ক্যাডার সার্ভিসকে
‘মূলধারা’ এবং ‘পেশাগত ও কারিগরি’ দু’ভাগে ভাগ করে আলাদা পরীক্ষা নেয়া
প্রয়োজন বলে মনে করছে সংস্থাটি।
২১ ডিসেম্বর পিএসসিতে ‘উন্নয়ন ভাবনা :
জনপ্রশাসনে দ্রুত নিয়োগ’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এটিসহ ১৭টি সুপারিশ উঠে
এসেছে। পিএসসি চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিকের সভাপতিত্বে ওই অনুষ্ঠানে
প্রধান অতিথি ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল
হক খান। এতে উঠে আসা সুপারিশগুলো পিএসসি বার্ষিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত
করে তা শিগগিরই রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করবে। এছাড়া রীতি অনুযায়ী প্রতিবেদনটি
পরবর্তী সংসদ অধিবেশনেও উপস্থাপন করা হবে। পিএসসি চেয়ারম্যান যুগান্তরকে এ
তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সূত্র জানায়, ওই কর্মশালায় পিএসসির সদস্য অধ্যাপক এম
আবুল কাশেম বলেন, ২৭টি ক্যাডারের মধ্যে শিক্ষায় ৭৭টি সাব-ক্যাডার আছে।
বিদ্যমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে সব ক্যাডারের জন্য একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেয়া
হচ্ছে। সিভিল সার্ভিসে ‘মেইন স্ট্রিম’ (মূলধারা) ক্যাডারের প্রার্থীর
ক্ষেত্রে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কিন্তু প্রভাষকের (রসায়ন) সবকিছু ঠিক
থাকলে তার এত কিছু পর্যবেক্ষণের কিছু নেই। তাই মূলধারার ক্যাডার সার্ভিসের
জন্য যেভাবে পরীক্ষা নেয়া হয়, তা অন্য ক্যাডার এবং পেশাগত ও কারিগরি
ক্যাডারের জন্য পৃথকভাবে নেয়া প্রয়োজন। বক্তব্যে তিনি দৃষ্টান্ত হিসেবে মূল
ক্যাডার সার্ভিস বলতে প্রশাসন, পুলিশ, ট্যাক্স, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস
এবং অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিস বলতে শিক্ষা, পোস্টাল ও আনসারের উল্লেখ
করেছেন। তার এই মতামতটি সুপারিশ আকারে গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মশালায় সবচেয়ে
বেশি কথা এসেছে কোটা পদ্ধতি নিয়ে। বেশির ভাগ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা কোটার
পুনঃপর্যালোচনার সুপারিশ করে তা কমানোর পরামর্শ দেন। এ প্রসঙ্গে সদস্য আবুল
কালাম আজাদ বলেন, সম্প্রতি ৯ হাজার ৬০৯ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স মাত্র ৫ মাস
৭ দিনে নিয়োগ করা হয়।
এসব পদের মধ্যে ২ হাজার ৮৮২টি পদ মুক্তিযোদ্ধার
কোটাভুক্ত ছিল। কিন্তু এর জন্য প্রার্থী পাওয়া গেছে মাত্র ১০১ জন। এর মধ্যে
৮৭ জনই মেধায় সুপারিশপ্রাপ্ত হন। বাকি ১৪ জন কোটায় সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
বিসিএসসহ নন-ক্যাডার পদে কোটার বিপরীতে প্রার্থী না পাওয়ায় অনেক পদ শূন্য
থাকে। এসব পদ শূন্য না রেখে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সাধারণ নির্দেশনা থাকলে
অধিকসংখ্যক পদে নিয়োগ সম্ভব হবে। একই প্রসঙ্গে সদস্য কামালউদ্দিন আহমেদ
বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা কমিয়ে প্রয়োজনে আলাদা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা
দরকার। বর্তমানে ২০০১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে কোটা বিন্যাস করে সুপারিশ
করা হচ্ছে। এটি ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন। বিসিএসে মেধা
তালিকা থেকে ৪৫ শতাংশ নিয়োগ হয়। বাকি ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণ হয়ে থাকে। এর
মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য (ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনি) ৩০, মহিলা ১০, জেলা ১০ ও
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫। এছাড়া এসব কোটা পূরণ না হলে সেখানে ১ শতাংশ বরাদ্দ
রাখা হয়েছে প্রতিবন্ধীর জন্য। আর যদি সংশ্লিষ্ট চাকরির ক্ষেত্রে এসব
প্রাধিকার কোটা পূরণ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে মেধা তালিকা থেকে প্রতিবন্ধীর
কোটা পূরণ করা হয়। এ প্রসঙ্গে পিএসসির চেয়ারম্যান যুগান্তরকে বলেন, ‘৩৫তম
বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রার্থী না পাওয়ায় তাতে মেধা থেকে নিয়োগের
ব্যাপারে আমরা সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠাই। সরকার এতে অনুমোদন দিয়েছে। তাই
যেহেতু এভাবে বিসিএসভিত্তিক আলাদা সুপারিশ পাওয়া সম্ভব, তাই আমি মনে করি এই
স্পর্শকাতর বিষয়ে সাধারণ সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই। তারপরও আমরা
সুপারিশগুলো রাষ্ট্রপতি বরাবর পেশ করব।’ প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সুপারিশে
বলা হয়েছে, বিজি প্রেসে প্রশ্নপত্র একাধিক সেটের পরিবর্তে পিএসসির নিজস্ব
ব্যবস্থাপনায় একটি বা দুটি সেট মুদ্রণ করলে গোপনীয়তা নিশ্চিত করা সম্ভব
হবে। প্রশ্নপত্র প্রণয়নে আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। নিজস্ব
ব্যবস্থাপনায় পিএসসির প্রশ্নপত্র প্রণয়ন জরুরি। যদিও এখন কিছু প্রশ্নপত্র
নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রণয়ন ও মুদ্রিত হচ্ছে, কিন্তু এর পরিসর ও
সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রশ্নব্যাংক তৈরি জরুরি।
নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজের জন্য সুপারিশে বলা হয়েছে, বিসিএস
(ক্যাডার) শূন্য পদের রিকুইজিশনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য মন্ত্রণালয়/বিভাগের
নন-ক্যাডার শূন্য পদের তালিকা পাঠালে নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর
পদে দ্রুত ও সহজে সুুপারিশ সম্ভব হবে। এ প্রসঙ্গে অনুষ্ঠানে পরীক্ষা
নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) আইম নেছারউদ্দিন বলেন, সব মন্ত্রণালয় প্রথম ও দ্বিতীয়
শ্রেণীর নন-ক্যাডার পদের একটি ডাটাবেজ করতে পারে। পাশাপাশি প্রত্যেক
বিসিএসের সার্কুলারের পর ক্যাডার পদের সঙ্গে নন-ক্যাডার পদের চাহিদা দিলে
নির্বাচিতদের উভয় তালিকা একসঙ্গে প্রকাশ করা সম্ভব।
পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা
গতিশীল করতে এতে বলা হয়, পিএসসির আর্থিক স্বাধীনতা প্রয়োজন। পিএসসির বাজেট
প্রদান করার পর তারকা চিহ্ন অবলোপন করা প্রয়োজন। পিএসসিকে থোক বরাদ্দ দিয়ে
বাজেট বিভাজনের ক্ষমতা দেয়া জরুরি। এতে পরীক্ষা সংক্রান্ত ব্যয় বাস্তবতার
নিরিখে সমন্বয় করা সম্ভব হবে। পিএসসির নিজস্ব ভবনে আধুনিক পরীক্ষা কক্ষ
নির্মাণে উচ্চমুখী যুগোপযোগী এবং অধিকসংখ্যক পরীক্ষার্থীর বসার মতো কক্ষ
তৈরির সুপারিশও করা হয়েছে। দ্রুত নিয়োগ সম্পন্নে সুপারিশের পর জনপ্রশাসন
মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ কার্যক্রমের সময় কমিয়ে আনতে বলা হয়। বলা হয়, পিএসসি
কেবল ক্যাডার সুপারিশ করে। কিন্তু ‘সিভিল সার্ভিস কোয়ালিটি ক্রাইসিস’
সমাধানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয়
পরিকল্পনা গ্রহণ আবশ্যক। এতে সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে
গানম্যান এবং প্রিভিলেজ স্টাফ দেয়ার সুপারিশও আছে। পাশাপাশি বলা হয়,
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিএসসি মর্যাদা অক্ষুণœ রাখতে এসএসবিতে
(সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড) পিএসসির প্রতিনিধিত্ব রাখা প্রয়োজন। ১৮ দফায়
পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের
পদ তৃতীয় গ্রেডে সৃষ্টিসহ দ্বিতীয় গ্রেডে উন্নীত, কার্যক্রম দ্রুত ও গতিশীল
করতে তথ্যপ্রযুক্তি শাখায় জনবল বাড়ানো ও প্রশিক্ষণ, আঞ্চলিক কার্যালয়ের
সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশও আছে।

No comments:
Post a Comment