ঢাকা
মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৪৯টি থানার মধ্যে ২০টির কার্যক্রমই চলে ভাড়া
বাড়িতে। জমি না পাওয়ায় এসব থানার কার্যক্রম চলছে কমিউনিটি সেন্টার বা
গণপূর্তের পরিত্যক্ত বাড়িতে। অপরদিকে থানাগুলোয় কর্মকর্তার পদসংখ্যা বাড়লেও
তাদের অনেকেরই বসার জায়গা নেই। গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও রাখতে হয় বাইরের
ড্রয়ারে। জরাজীর্ণ ভবনে অস্ত্রাগারগুলোও নিরাপদ নয়। এছাড়া লক্কড়-ঝক্কড় আর
রিকুইজিশন করা গাড়ি, মান্দাতার আমলের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে পরিচালানা করতে হয়
থানার কার্যক্রম। ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (স্টেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট)
সাইফুল আলম যুগান্তরকে জানান, ডিএমপির ৪৯টি থানার মধ্যে ২০টির কার্যক্রম
চলে ভাড়া বাড়িতে। এর মধ্যে কয়েকটি গণপূর্তের পরিত্যক্ত ভবনও আছে। গুলশানসহ
কয়েকটি থানা ভবন নির্মাণাধীন আছে। তাই এখন ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম চালাতে
হয়।
নির্মাণ সম্পন্ন হলে এসব থানা নিজস্ব ভবনে চলে যাবে। পুলিশ সদর দফতর
সূত্র জানায়, টাইপ প্লানে ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি থানার জন্য ০.৫০ একর জমি
প্রয়োজন। জমি না পাওয়ায় অনেক থানার ভবন প্লান মোতাবেক নির্মাণ করা যায়নি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লালবাগ জোনের চকবাজার থানার (সাবেক লালবাগ)
কার্যক্রম চলছে উর্দুরোডে সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দক্ষিণ-পশ্চিম
কোণে ০.৩২ একর জমিতে। প্লান অনুযায়ী থানাটি নির্মাণের জন্য কারা অধিদফতরের
কাছে ০.৫০ একর ও লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের জন্য ০.২০
একর জমি চাওয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের আগস্টে পুলিশ সদর দফতর স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কারা অধিফতরকে চিঠি দিলেও এখন পর্যন্ত সেই চিঠির জবাব
মেলেনি। কলাবাগান থানাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জরাজীর্ণ ভবনে। দেয়াল ও ছাদে
বড় বড় ফাটল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘১০-১৫
বছর আগে ভূতের গলিতে সিটি কর্পোরেশনের পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারে
অস্থায়ীভাবে থানার কার্যক্রম শুরু হয়। আজও সেভাবেই কাজ চলছে। আমরা যারা
মানুষের বিপদে সবার আগে ছুটে যাই, উদ্ধার করি, এখন থানা ভবনে আমাদের জীবনই
হুমকির মুখে।’ ডিএমপি সূত্র জানায়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের
পরিত্যক্ত ভবনে কার্যক্রম চলে মতিঝিল,
গুলশান, ধানমণ্ডিসহ ৪টি থানার।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের জমিতে চলে শাহজাহানপুর ও
বিমানবন্দর থানার কার্যক্রম। ৬টি থানা চালানো হয় ভাড়া কমিউনিটি সেন্টারে।
শহীদনগর কমিউনিটি সেন্টারে লালবাগ থানা, ভূতের গলিতে সিটি কর্পোরেশনের
পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারে কলাবাগান থানা, মুগদাপাড়ার আফিলউদ্দিন
কমিউনিটি সেন্টারে মুগদা থানা, ইংলিশ রোডের ফজলুল করিম কমিউনিটি সেন্টারে
বংশাল থানা এবং আবদুর রহমান কমিউনিটি সেন্টারে চলছে ওয়ারী থানার কার্যক্রম।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে সরকারি হারে ডিএমপি এসব কমিউনিটি সেন্টারের
ভাড়া পরিশোধ করে। এছাড়া লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, আদাবর, শাহ আলী, পল্লবী,
কাফরুল, হাজারীবাগ, দক্ষিণখান, উত্তরখান, দারুস সালাম, কদমতলী ও বংশাল
থানার কার্যক্রম চলছে স্বল্প পরিসরের ব্যক্তিমালিকানাধীন ভাড়া বাড়িতে।
জায়গা না থাকায় কর্মকর্তারা এসব বাড়িতে বসতে পারেন না। অনেকের চেয়ার-টেবিল
ফেলার জায়গাও নেই। থানার ভেতর মোটরসাইকেল ও টহল গাড়ি পার্কিং করা যায় না।
এক টেবিল ভাগাভাগি করে চার্জশিট, অগ্রগতি প্রতিবেদন, জিডি ও ঘটনার তদন্ত
প্রতিবেদন লেখাসহ বিভিন্ন দাফতরিক কার্যক্রম সারতে হয়। কর্মক্লান্ত পুলিশ
কর্মকর্তাদের বিশ্রাম নেয়ারও কোনো জায়গা নেই থানাগুলোয়। এতে সবচেয়ে বেশি
দুর্ভোগে পড়েন নারী পুলিশ সদস্য ও কনস্টেবলরা। আটককৃত যানবাহন মাসের পর
মাস পড়ে থাকে থানার আশপাশে রাস্তায়।
ফলে সেগুলো চুরি হয়ে যায়। এছাড়া কিছু
থানার মধ্যে সহকারী পুলিশ কমিশনারের অফিসও আছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা
জানান, যেসব থানার নিজস্ব ভবন আছে তারও কয়েকটি বেহাল। স্বল্প পরিসরে
প্রতিষ্ঠিত পোস্তগোলা পুলিশ ফাঁড়িতে অস্থায়ীভাবে শ্যামপুর থানা, তেজগাঁও
পুলিশ ফাঁড়িতে অস্থায়ীভাবে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা, খিলক্ষেত পুলিশ
ফাঁড়িতে অস্থায়ীভাবে খিলক্ষেত থানা, দিয়াবাড়ী পুলিশ ফাঁড়িতে অস্থায়ীভাবে
তুরাগ থানা এবং খিলগাঁও পুলিশ ফাঁড়িতে অস্থায়ীভাবে খিলগাঁও থানার কার্যক্রম
শুরু হয়ে এক যুগ ধরে চলছে। ডেমরা থানার কার্যক্রম চলে বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের
মালিকানাধীন আহম্মেদ বাওয়ানী টেক্সটাইল মিলের জমিতে। জানা যায়, পল্লবীতে
পাঁচতলা বাড়ির নিচতলা ও দ্বিতীয়তলায় থানার কার্যক্রম চলে। মাত্র ১৫টি কক্ষে
একশ’র বেশি পুলিশ সদস্যকে গাদাগাদি করে বসতে হয়। উত্তরখান ও দক্ষিণখান
থানায় কনস্টেবলদের ব্যারাক নেই। বিভিন্ন থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যরা জানান,
থানার ভেতরে পুলিশ সদস্যদের আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় কর্মস্থল থেকে অনেক
দূরে কম টাকায় বাসা বা মেস ভাড়া করে থাকতে হয় তাদের। একাধিক থানার ওসি
জানান, স্বল্প পরিসরের ভাড়া বাড়িতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় অস্ত্রাগার নিয়ে।
জায়গার স্বল্পতার কারণে থানার হাজতখানার নিরাপত্তা নিয়েও শংকিত তারা।

No comments:
Post a Comment