Thursday, February 16, 2017

মায়ের কোলে বসে মাকে খুঁজছে শিশু ফারাবী

মঙ্গলবার রাত সোয়া ১২টা। শয়নকক্ষে মায়ের পাশে শুয়ে আছে শিশু ফারাবী। প্রায় মাঝ রাত হলেও ঘুম নেই তার চোখে। শত চেষ্টা করেও তার মুখ দিয়ে একটি কথাও বের করা গেল না। কয়েক ঘণ্টা আগের ছটফটে শিশুটি যেন নির্বাক হয়ে গেছে। আপন মায়ের কোলে ফিরেও নিশ্চুপ আড়াই বছরের ফারাবী। বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। আদালতের রায়ে আপন মায়ের কোলে ফিরে শিশু ফারাবী কেমন আছে মঙ্গলবার মাঝ রাতে খোঁজ নিতে গিয়ে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। কুষ্টিয়া শহরের কাস্টমস মোড়ে বাবার ভাড়া করা বাসায় শিশুসন্তান ফারাবীকে নিয়ে উঠেছেন মা সানজিদা। সরেজমিন দেখা যায়, কান্নাভেজা চোখ খুঁজে ফিরছে অন্য কাউকে। বাবা-মায়ের নাম জিজ্ঞাসা করতেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। পরে আধো আধো বুলিতে বলে সোম্মা (পালক ফুফু), বাবার নাম হাসান (পালক ফুফা)। এরপর আবার নিশ্চুপ। কথা না বলায় ফোনে ধরিয়ে দেয়া হয় তার পালক বাবাকে। মুহূর্তে প্রাণ ফিরে পায় ফারাবী। তার কান্না আর আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। কান্নাভেজা কণ্ঠে নাবালক শিশুটির আকুতি, বাবা বাসায় যাব, আমাকে নিয়ে যাও। এমন আকুতিতে ফোনের ওপাশ থেকে কেঁদে ফেলেন পালক বাবাও। নাবালক ছেলে আর বাবার এমন কথোপকথনে চোখে পানি আসে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদেরও। কিন্তু কিছুই যে করার নেই। বাবা-ছেলের দেখা-সাক্ষাৎ যে অসম্ভব। কারণ আইন তাদের আলাদা করে দিয়েছে, ফিরতে চাইলেও পারবে না নাবালক ফারাবী। অবশ্য মা সানজিদা খাতুনের দাবি, জন্মের পরদিন থেকেই ফুফুর (পালক মা) কাছে মানুষ। সে জন্য এ রকম করছে। কিছুদিন থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। রাতেই যাওয়া হয় ফারাবীর ফুফা (পালক বাবা) হাসান ও ফুফু (পালক মা) সোমার বাসায়। তাদের একটাই চাওয়া- ফিরে পেতে চান ফারাবীকে। সোমা-হাসান দম্পতি জানান, ফারাবীর টিকা কার্ড ও জন্মনিবন্ধনে বাবা-মা হিসেবে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা রয়েছে। অথচ আইন সম্পর্ক বদলে দিয়েছে। রাত দেড়টার দিকে আলামপুর ইউনিয়নের ভাদালিয়া গ্রামে ফারাবীর বাবার বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, মধ্যরাতেও ঘুমাননি কেউ। ফারাবীকে নিয়ে চলছে আলোচনা আর হা-হুতাশ।
ফারাবী খেয়েছে কিনা, ঘুমিয়েছে কিনা, এসব চিন্তা সবার। কথা হয় ফারাবীর বোন সোহা ও ভাই তাহশীদের সঙ্গে। এ সময় সোহা বলে, ‘মা কোনোদিনই আমাদের মানুষ করতে পারবেন না।’ তাহশীদ বলে, ‘মা আমাকে ফেলে রেখে চলে গেছেন। আমরা ফিরতে চাই না।বাবা আমাদের মা, আমাদের বাবা।’ মঙ্গলবার কুষ্টিয়ার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এক আদেশে তিন সন্তানকে বাবার হেফাজত থেকে মায়ের হেফাজতে দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। বিচারকের এমন আদেশের পর তিন শিশুর কান্নায় আদালতের পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যায়। বড় সন্তান সোহা চিৎকার করে তাদের বাবার কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানায়। তা না হলে আত্মহত্যারও হুমকি দেয় সোহা। তাদের আহাজারিতে শেষ বিকালে পুনরায় আদালত বসানো হয়। মা-বাবা আর সন্তানদের উপস্থিতিতে আরেক দফা রায় ঘোষণা করেন আদালত। বাদী-বিবাদীর সম্মতিতে রায়ে দুই বছর ৭ মাসের সন্তান ফারাবীকে তার মায়ের হেফাজতে দিয়ে বাকি দুই সন্তান ১২ বছরের সোহা আর সাত বছরের তাহশীদকে বাবার হেফাজতে থাকার আদেশ দেয়া হয়। আদালতের ওই আদেশ তিন ভাইবোনকে আলাদা করে দেয়। ওই রায় শোনার পর আবারও আদালত কক্ষে শুরু হয় তিন ভাইবোনের আহাজারি। পরে পুলিশের সহযোগিতায় মা ছোট সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন আর অন্য দুই সন্তান তাদের বাবার সঙ্গে বাড়িতে ফিরে যায়।

No comments:

Post a Comment