দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে অনেক দিন ধরেই শীর্ষ সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে ঋণখেলাপি কালচার। আর্থিক লেনদেন, বিশেষ করে ঋণদানের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে গেলে খেলাপি হওয়ার আশংকাকে আমাদের মাথায় রাখতে হবে। আহার করতে গেলে কিছু খাবার যেমন প্লেটের বাইরে পড়ে যেতে পারে, তেমনি ঋণদান বা এ ধরনের কাজ করতে গেলে কিছু বিচ্যুতি ঘটতেই পারে। আর বিচ্যুতির পরিমাণ যদি মাত্রাতিরিক্ত হয় তাহলে তা উদ্বেগের কারণ বটে। কিছুদিন আগের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অবলোপনকৃত ঋণসহ ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে এটা নিশ্চয়ই আরও কিছু বেড়েছে। কোনো ব্যবস্থাতেই খেলাপি ঋণ কালচার বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত ঝুঁকির মুখে এসে দাঁড়ানোর আশংকা দেখা দিয়েছে। খেলাপি ঋণ কালচার বিশ্বের সব দেশেই রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো খুব কম দেশেই সমস্যাটি এতটা জটিল আকার ধারণ করেছে। ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণ কালচার নিয়ে প্রতিনিয়তই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এসব আলোচনা মূলত সৃষ্ট খেলাপি ঋণ আদায় সংক্রান্ত। অর্থাৎ যেসব ঋণ হিসাব খেলাপি হয়ে গেছে তা থেকে কীভাবে কিস্তি আদায় করা যায় এটাই আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কোনো সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার পর তা সমাধানের চেষ্টা করার চেয়ে সমস্যা যাতে তৈরি না হয় সে চেষ্টা করাই উত্তম। এজন্যই বলা হয়, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’।
খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হওয়ার পর তা আদায়ের ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়ার পরিবর্তে কোনো ঋণ হিসাব যাতে খেলাপি হতে না পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করাই অধিকতর জরুরি। উজানে পানি ঘোলা হলে সেই পানি ভাটিতে যাবে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কাজেই উজানে যাতে কেউ পানি ঘোলা করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। তাহলে খেলাপি ঋণ কালচার এমনিতেই সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রচলিত রীতি অনুযায়ী একজন উদ্যোক্তার বন্ধকী প্রদানের সামর্থ্যকে গুরুত্ব দেয়া হয় উদ্যোক্তার স্বভাব-চরিত্র, তার আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং তার ব্যক্তিগত আচরণকে ততটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। উদ্যোক্তার বন্ধকী প্রদানের সামর্থ্যকে প্রায়ই ঋণ আদায়ের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা মোটেও ঠিক নয়। কারণ উপযুক্ত বন্ধকী সম্পত্তি ঋণের নিরাপত্তা বিধান করলেও তা ঋণ আদায়ের নিশ্চয়তা প্রদান করে না। কারণ বন্ধকী সম্পত্তি ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে অধিগ্রহণ বা ভোগ করতে পারে না। ফলে বন্ধকী সম্পত্তি উদ্যোক্তার দখলেই থেকে যায়। ঋণ আদায়ের নিশ্চয়তা প্রদান করে ঋণ গ্রহণকারীর ব্যক্তিগত আচরণ ও তার মনমানসিকতা। একজন উদ্যোক্তা যদি মনের দিক থেকে ভালো ও সৎ হন তাহলে তাকে দেয়া ঋণ খেলাপি হওয়ার আশংকা খুবই কম। এছাড়া যে সম্পত্তি বন্ধকী নেয়া হচ্ছে তার সঠিক মূল্যায়নও খুবই জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংক ঋণদানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্নীতি সৃষ্টি হয় বন্ধকীযোগ্য সম্পদের মূল্যায়নের বেলায়। ঋণদানকালে ব্যাংক মোট প্রকল্প খরচের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের জোগান দেয়। যেমন ধরুন কোনো প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি টাকা। ব্যাংক যদি ৪০:৬০ রেশিওতে ঋণ প্রদান করে তাহলে উদ্যোক্তাকে ৬০ লাখ টাকার সম্পত্তি বা বিনিয়োগ দেখাতে হবে। অবশিষ্ট ৪০ লাখ টাকা ব্যাংক জোগান দেবে। অনেক উদ্যোক্তা এখানে প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করে। তারা নিজস্ব কন্ট্রিবিউশন অতিমূল্যায়িত করে দেখায়। যেমন, ব্যাংক কর্মকর্তা বা ভ্যালুয়েশন ফার্মের সঙ্গে যোগসাজশ করে ২০ লাখ বা ৩০ লাখ টাকার সম্পদকে ৬০ লাখ টাকা দেখানো। ব্যাংক কর্মকর্তারা সাধারণত অনুমানের ওপর নির্ভর করে জমি বা অন্যান্য সম্পদের মূল্যায়ন করে থাকেন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের কোনোভাবে প্রভাবিত করা গেলে ৩০ লাখ টাকার সম্পত্তির মূল্য ৬০ লাখ টাকা দেখানো কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু যারা এভাবে প্রকল্প সম্পদ অতিমূল্যায়িত করে দেখান তাদের প্রায়ই কোনো শাস্তি হয় না। এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রায় ২ বছর আগে বগুড়া জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এক নতুন কর্মকর্তাকে দিয়ে বন্ধকীযোগ্য একখণ্ড জমির মূল্যায়ন করা হয়।
এ ধরনের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্রাঞ্চের ম্যানেজারের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হলেও ম্যানেজার একজন নতুন কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে তার দায়িত্ব শেষ করেন। উল্লেখিত জমি, যা প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় অবস্থিত তার প্রতি শতাংশের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ টাকা। ব্যাংক মনোনীত ভ্যালুয়েশন ফার্ম কর্তৃক একই জমির মূল্যায়ন করা হয় প্রতি শতাংশ সোয়া লাখ টাকা। ঋণ প্রস্তাবটি ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটিতে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হলে কমিটি একই জমির মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এ তারতম্যের বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে। একইসঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের দুজন কর্মকর্তাকে দিয়ে জমিটি পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেয়। উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদ্বয় নিজেরা সরেজমিন গিয়ে জমির মূল্যায়ন করেন। এতে দেখা যায়, ভ্যালুয়েশন ফার্মের মূল্যায়নই সঠিক। তারা রিপোর্ট দিয়ে দেন। প্রস্তাবিত ঋণটি বাতিল করা হলেও অতিমূল্যায়নকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রকল্প সম্পদের অতিমূল্যায়ন, সঠিকভাবে জমির মালিকানা যাচাই না করা, ভুয়া জমি বন্ধক রাখা ইত্যাদি নানা কারণে প্রদত্ত ঋণ পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়ে পড়ে। ব্যাংক কর্মকর্তা এবং সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতা অবৈধ সমঝোতায় উপনীত হলে রাতকে দিন করে ফেলা সম্ভব। ব্যাংকিং সেক্টরে আলোড়ন সৃষ্টিকারী দুর্নীতির ঘটনা হলমার্ক কেলেংকারি, বিসমিল্লাহ্ গ্রুপের ঋণ কেলেংকারি একদিনে বা হঠাৎ করে ঘটেনি।
ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট যদি সতর্কতা অবলম্বন করত, তাহলে এসব দুর্নীতির ঘটনা কোনোভাবেই ঘটত না। ব্যাংকিং সেক্টরে যেসব নিয়ম-কানুন চালু আছে তা খেলাপি ঋণ ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এসব আইনের কার্যকর ও পক্ষপাতহীন বাস্তবায়নের অভাব পরিলক্ষিত হয়। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা যদি প্রচলিত আইনের সঠিক বাস্তবায়ন করে উপযুক্ত উদ্যোক্তাকে পক্ষপাতহীনভাবে ঋণ প্রদান করেন, তাহলে সেই ঋণ হিসাব পরবর্তী সময়ে খেলাপি হওয়ার আশংকা খুবই কম থাকবে। কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা আছেন যারা ঋণ নীতিমালার বিভিন্ন শর্তের অজুহাত তুলে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের হয়রানি করেন। তারা এটা করেন মূলত অবৈধ অর্থ আদায়ের স্বার্থে। এদের ‘ম্যানেজ’ করতে পারলে ভুয়া কাগজপত্র দিয়েও ঋণ নেয়া সম্ভব। একশ্রেণীর ব্যাংক কর্মকর্তা আছেন যারা নিজেদের অত্যন্ত ক্ষমতাবান বলে মনে করেন; কিন্তু তারা একবারও বুঝতে চান না, মূল ক্ষমতা তো উদ্যোক্তাদের হাতে। উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে সেই ঋণের বিপরীতে যে সুদ প্রদান করেন তার মাধ্যমে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। কাজেই তারা উদ্যোক্তাদের প্রভু নন বরং তারা উদ্যোক্তাদের সেবক মাত্র। উদ্যোক্তাদের মধ্যেও মন্দ লোক আছে; কিন্তু তারাও একা মন্দ কাজ করতে পারেন না। ব্যাংকারদের সহায়তা না পেলে বাইরে থেকে এসে একজন উদ্যোক্তার পক্ষে সব কিছু করা সম্ভব নয়। তাই আমরা যদি খেলাপি ঋণ কালচার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চাই তাহলে প্রথমেই অসৎ ও দুর্নীতিবাজ ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের দেশের প্রচলিত ব্যবস্থাও খেলাপি ঋণ কালচারকে প্রভাবিত করছে। যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন, তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে তেমন কোনো অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা লাভ করেন না; কিন্তু যারা ঋণখেলাপি তারা নানাভাবে আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। ঋণখেলাপিরা ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধা পাচ্ছেন। তাদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ এবং দণ্ড সুদ মওকুফের ব্যবস্থা রয়েছে। একজন উদ্যোক্তা বছরের পর বছর ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করার পরও যদি কোনো বিশেষ আর্থিক সুবিধা না পান, অন্যদিকে বছরের পর বছর ব্যাংক ঋণের টাকা আটকে রেখে অপর একজন উদ্যোক্তা যদি কোটি কোটি টাকা সুদ ও দণ্ড সুদ মাফ পান তাহলে ঋণখেলাপি কালচার কি কোনোদিন বন্ধ হবে? খেলাপি ঋণ কালচার দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য মোটেও সুখকর বিষয় নয়। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাচ্ছে। তারা খেলাপি ঋণের বিপরীতে শত শত কোটি টাকা প্রভিশন রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এতে ব্যাংকের ঋণদান ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। ব্যাংক ইচ্ছা করলেই সম্ভাবনাময় নতুন ও পরীক্ষিত ভালো উদ্যোক্তাদের তুলনামূলক স্বল্প সুদে ঋণ দিতে পারছে না। ঋণখেলাপিদের অপরাধের দায়ভার কার্যত বহন করছে ভালো উদ্যোক্তারা। ঋণখেলাপিদের মধ্যে আবার দুটি শ্রেণী আছে। এদের মধ্যে একশ্রেণীর ঋণখেলাপি আছেন যারা নানা বিরূপ পরিস্থিতির কারণে ইচ্ছা বা আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না।
আর কিছু উদ্যোক্তা আছেন যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছা করেই ঋণের কিস্তি ফেরত দিচ্ছেন না। এরা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। এরাই ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য ভয়ংকর। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি আর প্রকৃত ঋণ খেলাপির সঙ্গে ব্যাংকের ট্রিটমেন্ট একই হওয়া উচিত নয়। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে ক্রিমিনাল অফেন্স হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যারা নানা বিরূপ পরিস্থিতির কারণে ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে ফেরত দিতে পারছেন না, তাদের নানাভাবে সহায়তা করে ঋণ পরিশোধে সমার্থ্যবান করে তোলা যেতে পারে। গরমের দিনে টিউবওয়েলে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেলে আমরা পানি ঢেলে নতুনভাবে পানি তোলার ব্যবস্থা করে থাকি। প্রকৃত ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রেও এ ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাদের প্রয়োজনে নতুন করে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে আগেকার ঋণ পরিশোধে সামর্থ্যবান করে তোলা যেতে পারে। ব্যাংকিং সেক্টরের ঋণখেলাপি কালচার বন্ধ করতে হলে গোড়া থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে হবে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। আর এটা করতে হবে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। কারণ, দুর্নীতি নিন্মমুখী একটি প্রবণতা। ওপরের ব্যক্তিটি যদি সৎ ও আন্তরিক হন তাহলে তার প্রভাব নিচের দিকে পড়তে বাধ্য। ব্যাংকিং সেক্টরের ঋণখেলাপি কালচার নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। গতানুগতিকভাবে এ সমস্যার কোনো সমাধান করা কখনোই সম্ভব হবে না।
এম এ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
এম এ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
No comments:
Post a Comment