জাতীয়
সংসদে প্রকৃত অর্থে বিরোধী দল না থাকায় সংসদীয় আলোচনা প্রাণবন্ত হচ্ছে না।
২২ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন শুরু হয়। ওইদিন মহামান্য
রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেন। ২৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ
প্রস্তাব উত্থাপিত ও সমর্থিত হওয়ার পর শুরু হয় রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর
আলোচনা। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতির ভাষণে দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতার ওপর জোর
দিয়ে যেভাবে সার্বিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়, একইভাবে উন্নয়নের ওপর
আরও বেশি জোর দিয়ে সংসদের সরকারদলীয় এমপিরা তাদের বক্তব্য রাখেন। এসব এমপির
বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, দেশে এখন কোনো সমস্যা নেই। দেশ যেন
উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নের
মহাসড়কে উঠে পড়েছে।
তারা বলেন, দেশ যেভাবে এগোচ্ছে তাতে ২০৪১ সালের আগেই এ
দেশ সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশে পরিণত হবে। দেশে যে কোনো উন্নয়ন হয়নি তা নয়।
উন্নয়ন হয়েছে, তবে দেশে সমস্যাও রয়েছে। এমপিরা ওইসব সমস্যার ওপর আলোকপাত
করছেন না। তাদের বক্তব্য শুনলে মনে হয় দেশ যেন তরতর করে উন্নয়নের সিঁড়িতে
উঠে পড়েছে। উন্নয়নের উদাহরণ দিতে গিয়ে তারা বলছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে
বিশ্বের সম্ভাবনাময় ৫টি দেশের তালিকায় নিজের নাম উঠাতে পেরেছে। আট বছর ধরে
এদেশে প্রবৃদ্ধির হার ৬ ভাগের বেশি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে
প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৭-এর ওপর। মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। এছাড়া এ সরকারের আমলে, এসব এমপির বক্তব্য
অনুযায়ী, কৃষি, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ অবকাঠামো, আইসিটি,
বিদ্যুৎ এবং নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত
হয়েছে। তারা আরও বলেন, এ সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করা
সম্ভব হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী
এককভাবে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করছেন। তারা আরও
বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের সময় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও আজ প্রায়
১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এ ধারা চলমান থাকলে নাকি ২০২১
সালে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। তবে তারা দেশের রাজনীতি,
গণতন্ত্র, আইনশৃংখলা পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওপর খুব একটা
আলোকপাত করছেন না। এ উন্নয়নের ধারার ওপর কথা বলার পাশাপাশি সরকারদলীয়
এমপিরা সংসদের বাইরের বিরোধী দল বিএনপিরও সমালোচনা করেন। যেমন, সরকারদলীয়
এমপি আবদুল মান্নান রাষ্ট্রপতির দেয়া ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের
ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদে বিএনপির সমালোচনা করতে গিয়ে উন্নয়নের ধারা থেকে
বেরিয়ে কিছুটা রাজনৈতিক ধারায় বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন
গঠনে রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী সার্চ কমিটি গঠন করেছেন। এর আগে তিনি
দেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। অথচ বিএনপির তা পছন্দ হয়নি।
তারা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, সার্চ কমিটির সদস্যরা নাকি আওয়ামী পরিবারের
লোক।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে বিএনপি যেভাবেই হোক অংশ নেবে। কারণ
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেয়া যে বিএনপির ভুল ছিল, তা
তারা এখন হাড়ে হাড়ে অনুধাবন করছেন। আগামী নির্বাচনে তারা অংশ না নিলে দলটি
বিলীন হয়ে যাবে।’ এমপি মহোদয়ের বক্তব্য সবটা ঠিক নয়। রাষ্ট্রপতি সংবিধান
অনুযায়ী সার্চ কমিটি গঠন করেননি। তিনি নিজ সদিচ্ছা থেকে সার্চ কমিটি গঠন
করা প্রয়োজন মনে করায় এ কমিটি গঠন করেছেন।
সংবিধানে সার্চ কমিটি গঠন করার
কথা লেখা নেই। রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন না করেও নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ
দিলে সে নিয়োগ সংবিধানসম্মত হতো। যা হোক, সার্চ কমিটি নিয়ে মিডিয়া যে হৈচৈ
করল তা ঠিক হয়নি। এটা নিয়ে এত বাড়াবাড়ি না করলেই ভালো হতো। তবে এসব
ব্যাপারে স্বচ্ছতা থাকা উচিত ছিল। কোন দল কার নাম দিল এবং কমিটি কোন দশজনকে
বেছে নিল এ সম্পর্কে জনগণকে স্বচ্ছ ধারণা দেয়া প্রয়োজন ছিল। সবশেষে যে
পাঁচজনকে নিয়ে ইসি গঠিত হল, কাজ দেখেই অনুধাবন করা যাবে তাদের যোগ্যতা
কতটা। এখন সময় এসেছে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কথা বলার। মিডিয়ার উচিত হবে এ
ব্যাপারটিতে অধিক গুরুত্ব দেয়া। কারণ, ইসি যত ভালোই হোক না কেন,
নির্বাচনকালীন সরকার যদি দলীয় হয়, তাহলে বর্তমান নির্বাচনী সংস্কৃতিতে
নির্বাচন ভালো হবে না। দশম সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার
নির্বাচনগুলোতেও এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে এমপি আবদুল মান্নানের
বক্তব্য অনুযায়ী একটি সংসদ নির্বাচনে কোনো দল অংশগ্রহণ না করলে সে দলটি
বিলীন হয়ে যাবে, এমনটা ভাবাও ঠিক নয়। আওয়ামী লীগ ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে
অংশগ্রহণ করেনি। সে কারণে আওয়ামী লীগ বিলীন হয়ে যায়নি।
রাজনৈতিক কৌশলগত
কারণে কোনো দল দু-একটি নির্বাচনে অংশ না নিলেই যে সে দল বিলীন হয়ে যাবে
এমনটি ভাবার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি
ভুল করেছে নাকি রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে তা সময়ই বলে দেবে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিএনপির নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে রাখার জন্য সব সময়
বলা হয়, দলটি দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ভুল করেছে। এখন দলটিকে সে
ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে। আসলে কি ব্যাপারটি সে রকম? জনপ্রিয় রাজনৈতিক
দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয় ভোটারদের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন
করে দেশ পরিচালনা করার জন্য। অধিকাংশ ভোটারের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও
কারচুপির কারণে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার আশংকা থাকলে কোনো দল কেন নির্বাচনে
অংশগ্রহণ করবে? বিএনপি ওই সময় জানত, দলীয় সরকারের অধীনে দশম সংসদ
নির্বাচনের যে পরিকল্পনা সরকার করেছিল, তাতে অংশগ্রহণ করলে তারা
সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের সমর্থন পেলেও কিছুতেই নির্বাচনে জিততে পারবে না। সে
কারণে তারা নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিল।
কাজেই সে দৃষ্টিকোণ থেকে দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিএনপি
রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিল। সরকারদলীয় নেতারা মামলা-অস্ত্র
প্রয়োগের পাশাপাশি বিএনপিকে কাবু করতে ওই একই কথা ২০১৪ সালের পর থেকে
বারবার বলে আসছে। বিএনপিকে সহিংস আন্দোলনের অভিযোগে অভিযুক্ত করে আরেকটি
ইনক্লুসিভ নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে দলটির মধ্যবর্তী
নির্বাচনের দাবিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
কিন্তু এতসব করেও
সরকারি দলের জনপ্রিয়তা খুব একটা বেড়েছে বলে মনে হয় না। এ কারণেই দশম সংসদ
নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে সরকারি দলের
প্রার্থীদের দুর্নীতি-কারচুপির আশ্রয় নিয়ে জিততে হয়েছে। এখন আরেকটি সংসদ
নির্বাচন এগিয়ে আসায় কীভাবে ওই নির্বাচনে জেতা যায় সে বিষয়ে সরকারি দল নতুন
পরিকল্পনা আঁটছে। সাধারণ মানুষ এবং অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্দলীয় সরকারের
অধীনে সংসদ নির্বাচন চাইলেও সরকারি দল সে দাবিতে সাড়া দিতে চাইছে না।
ক্ষমতাসীন দল দলীয় সরকারের অধীনে আরেকটি সংসদ নির্বাচন করে যে কোনো উপায়ে
আবারও ক্ষমতায় আসতে চাইছে। কারণ তারা জানে, দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ
নির্বাচন হলে সে নির্বাচনে জিততে তাদের খুব একটা বেগ পেতে হবে না। এ কারণে
সরকারি দলের মন্ত্রী ও নেতারা বারবার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর জোর
দিয়ে বক্তব্য রেখে জনগণের মাঝে সমর্থন বাড়াতে চাইছেন। কিন্তু যতই রাস্তাঘাট
ও ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হোক না কেন, তাতে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে না।
কারণ সরকার গণতন্ত্র চর্চার জায়গাটিতে স্বাভাবিকতা সৃষ্টি করতে পারেনি।
নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন হলে সরকার যে ভালো করতে পারবে না, সে
বিষয়টি সরকার দশম সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেই
বুঝতে পেরেছে। এ কারণে অন্য কোনো উপায়ে নির্বাচনে জেতা যায় কিনা সে
চিন্তাভাবনাও হয়তো তারা করছে। সম্প্রতি সরকারি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে
নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে তার কাছে সংসদ
নির্বাচনে ই-ভোটিংয়ের প্রস্তাব দিয়ে এসেছে। তবে এই ই-ভোটিং কি ইভিএমে, নাকি
অন্য কোনো মেশিনে হবে, নাকি স্মার্টকার্ড ব্যবহার করে সরকারের অন্য
কোনোরকম ভোটিং পরিকল্পনা রয়েছে, এ ব্যাপারটি খোলাসা করা হয়নি। কিন্তু
সরকারি দলের প্রস্তাবের মাত্র আট দিন পর ২০ জানুয়ারি বিদায়ী সিইসি
কুমিল্লায় সার্ভার স্টেশন উদ্বোধন করতে গিয়ে নতুন ডিজিটাল ভোটিং মেশিন
তৈরির কথা বলে এসেছেন। ইভিএম বিশেষজ্ঞ বা প্রযুক্তি বিশারদ না হয়েও তিনি ওই
মেশিনের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।
এসব লক্ষণ দেখে মনে হয়, আগামী সংসদ নির্বাচন
জেতার জন্য সরকারি দলের নানা রকম পরিকল্পনা থাকতে পারে। উল্লেখ্য, এর আগে
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই অনুষ্ঠিত ইভিএমে করা বিভিন্ন নির্বাচনে সমস্যা ও
ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়লেও নির্বাচন কমিশন তা দূর করতে পারেনি। একাদশ সংসদ
নির্বাচনে জেতার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রীরা দলের
জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে বেশি বেশি করে উন্নয়ন
কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরছেন। বাড়িয়ে দিয়েছেন সাংগঠনিক সফর। অথচ এসব
নেতা-এমপি গণতন্ত্রের উন্নয়নে সরকারের ভূমিকার বিষয়ে কিছুই বলছেন না।
বিরোধী দলকে কোণঠাসা করে রেখে সবল হতে না দেয়া, অন্য সাংবিধানিক
প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল অবস্থা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে
গণতন্ত্রের জায়গাটি যে মোটেও ভালো নেই, সে কারণেই হয়তো তারা এ ব্যাপারে
নীরবতা পালন করছেন। সরকারি দলের নেতাদের মনে রাখতে হবে, ফ্লাইওভার বানিয়ে
দেশকে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়কে উঠানোর দাবি করে জনগণের সমর্থন
পাওয়া যাবে না। জনগণের মন পেতে হলে দেশকে গণতন্ত্র-উন্নয়নের মহাসড়কে উঠাতে
হবে। আর দেশকে গণতন্ত্রের মহাসড়কে উঠাতে হলে ভেঙে পড়া নির্বাচনী ব্যবস্থায়
জনগণের আস্থা ফেরাতে হবে। কেবল নির্বাচন কমিশন গঠন করলেই এ কাজ সম্পন্ন হবে
না। একই সঙ্গে সবাই মিলে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রকৃতি নিয়ে ভাবতে হবে। এ
ভাবনা দ্রুত শুরু করতে পারলে তা সবার জন্য ভালো হবে।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
akhtermy@gmail.com
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
akhtermy@gmail.com

No comments:
Post a Comment