Wednesday, February 8, 2017

সুদবিহীন ঋণের ৭৭ প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বহীন

সরকারের ইকুইটি অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ ফান্ড (ইইএফ) থেকে সুদবিহীন ঋণ নেয়া ৭৭টি প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বহীন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে দেয়া শত কোটি টাকার কোনো হদিস নেই। নামে-বেনামে অর্থ নিয়ে কেউ পালিয়েছেন। আবার কেউ চলে গেছেন অন্য ব্যবসায়। ফলে এসব ঋণ গ্রহীতা এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর মধ্যে সব প্রকল্পই কৃষিভিত্তিক ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের। এ ছাড়া ইইএফের আরও ৩০০ কোটি টাকা আদায়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, কৃষিভিত্তিক প্রায় ৬৪টি প্রকল্পই অস্তিত্বহীন। এ ছাড়া আইসিটি প্রকল্পের ১৩টিই অস্তিত্বহীন। এর মধ্যে ছয়টি প্রকল্পে অস্তিত্বহীনতার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) যৌথ পরিদর্শক দল। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- ড্রিমস সফট লিমিটেড, আইটি ম্যাট্রিকস বাংলাদেশ লিমিটেড, ইন্টারস্যাট সফটওয়্যার অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড, জুপিটার আইটি লিমিটেড, মারফি ম্যাককান কনসাল্টিং লিমিটেড ও রিসোর্স টেকনোলজি লিমিটেড। এসব প্রকল্পে ঋণ দেয়া হয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা। যার কোনো হদিস নেই। এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। তবে ভুল উদ্যোক্তাকে ঋণ দেয়া হয়েছে।
তা না হলে ঋণ গ্রহীতাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না কেন? তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ থাকতে পারে। অপরাধী শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেন তিনি। সূত্র জানায়, নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ২০০১ সালে সরকার ইইএফ ফান্ড গঠন করে। এই বিশেষ তহবিলের উদ্দেশ্য ছিল, উল্লিখিত খাতের উদ্যোক্তাকে ঋণের পরিবর্তে মূলধন দেয়া। প্রকল্পে সরকারের ৪৯ শতাংশ এবং ৫১ শতাংশ মালিকানা উদ্যোক্তার। সুদবিহীন এসব ঋণ গ্রহণের আট বছর পর সরকারের বিনিয়োগ ফেরত দেয়ার কথা। কিন্তু অনেক উদ্যোক্তাই মেয়াদ শেষে সরকারকে টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০টি প্রকল্পের অর্থ ফেরত দেয়ার সময় হয়েছে। এর মধ্যে আট বছর আগে অর্থ ফেরত দেয়ার কথা ছিল এমন অনেক প্রকল্প রয়েছে। উদ্যোক্তাদের অনেককেই এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বারবার নোটিশ দিলেও সাড়া দিচ্ছেন না প্রকল্পের উদ্যোক্তারা। ফলে আরও প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ফেরত আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই বিশেষ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত চালু রাখা যাবে কিনা তা পর্যালোচনা করছে সরকার। চলতি মাসের পর নতুন করে আর বিনিয়োগ না করার আপাতত সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব প্রকল্প থেকে অর্থ ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং বেশ কিছু প্রকল্পের শেয়ার তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিবি। আইসিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইইএফে দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এ সময় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ছাড় করে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে কৃষি খাতে এক হাজার ৩১৩ কোটি ও আইসিটি খাতে ৫১২ কোটি টাকা রয়েছে। ব্যাপক অনিয়মের কারণে এক বছর যাবৎ ঋণ দেয়া বন্ধ রয়েছে। এখন পর্যন্ত এক হাজার ৩০০টি প্রকল্পে প্রায় এক হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। যেসব প্রকল্প থেকে এখনও বিনিয়োগ ফেরত আসেনি, তাদের চিহ্নিত করে সরকারি অংশের শেয়ার বিক্রি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তৃতীয় পক্ষের কাছে শেয়ার বিক্রির জন্য প্রাথমিকভাবে মৎস্য ও ডেইরি খাতের ৫৫টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। আর নির্ধারিত সময়ে অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ কিছু প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা শুরু হয়েছে। ইইএফে অনিয়ম নিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষিভিত্তিক প্রকল্পগুলোর ঢাকার প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা ঘুরে ৪২ শতাংশের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
আর ঢাকার বাইরের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানায় গিয়ে খোঁজ মেলেনি ১৫ দশমিক ৮ শতাংশের। বিআইডিএসের নমুনা জরিপের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষিভিত্তিক প্রকল্পের ২৫ শতাংশের কার্যালয় হয় খুঁজে পাওয়া যায়নি, না হয় সেসব অফিস সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর বা বন্ধ। আইসিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ঠিকানা পাওয়া যায়নি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশের। আবার জরিপে সাড়া দিয়েছে এমন প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্তত ৪৪ শতাংশই নানা ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছে। এদের বেশির ভাগই লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ইইএফ সহায়তা পাওয়ার বেশ কয়েক বছর পর চালু হয়েছে কয়েকটি ফার্ম। ইইএফ প্রকল্পের এ অবস্থার কারণ হিসেবে বিআইডিএস রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দুর্নীতিকে দায়ী করে। আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতিখার-উজ-জামান বলেন, গত ১৫ বছরে ইইএফে ১০ হাজার আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রায় এক হাজার ৩০০টি প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দেয়া হয়েছে। ঋণ অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বিআইডিএসকে দিয়ে একটি তদন্ত করেছে। তাতে ৫ থেকে ৬টি প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাকিগুলোর সন্ধ্যান পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে ইইএফের প্রকল্প পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক নির্মল চন্দ্র ভক্ত যুগান্তরকে বলেন, এসব ঘটনা পুরনো। বর্তমানে এমন কিছুই নেই বরং নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভিডিও করা হয়। এর বাইরে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

No comments:

Post a Comment