এবার
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত স্বর্ণের মান ও পরিমাণ যাচাইয়ের উদ্যোগ
নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে শুল্ক গোয়েন্দার পক্ষ থেকে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে
প্রায় এক মাস ধরে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে। আট সদস্যের অনুসন্ধান টিম
ইতিমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অধিকতর যাচাই
করতে আগামী সপ্তাহে নতুন পদ্ধতিতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে অনুসন্ধান
কার্যক্রম চালানো হবে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই এ মুহূর্তে মুখ
খুলতে রাজি নয়। অবশ্য অনুসন্ধানের প্রথম দিন থেকেই ভল্ট সংশ্লিষ্ট সবাইকে
নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের
দেশত্যাগের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। যুগান্তরের
অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রসঙ্গত, গত বছর ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ
ব্যাংকে আলোচিত রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর ভল্টে রক্ষিত বিপুল পরিমাণ
স্বর্ণের ব্যাপারে নড়চড়ে বসে শুল্ক গোয়েন্দা। সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ
দফতর ও সংস্থা নানা আশংকা মাথায় নিয়ে দ্রুত ভল্ট পরিদর্শন ও স্বর্ণ
যাচাইয়ের পক্ষে মতামত দেয়। এর ভিত্তিতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সম্মতি
সাপেক্ষে শুল্ক গোয়েন্দা দলের ভল্ট অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়।
এদিকে
ভল্টে অনুসন্ধান চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত
অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা ভল্টে অনুসন্ধান
শুরু করেছি। অনুসন্ধান শেষে এ বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সরকারের উচ্চ
পর্যায়কে জানানো হবে।’ তবে ভল্টে রক্ষিত স্বর্ণের বিষয়ে কোনো তথ্য কিংবা
বক্তব্য দেননি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভংকর সাহা। তিনি বলেন, ‘ভল্টে
কি পরিমাণ ও কোন মানের স্বর্ণ আছে তা বলা যাবে না। এটি অনেক গোপনীয় একটি
বিষয়।’ জানা গেছে, গত নভেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট যাচাইয়ে বাংলাদেশ
ব্যাংকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এ জন্য আট
সদস্যের একটি চৌকস তদন্ত দল গঠন করা হয়। ১ জন যুগ্ম পরিচালকের নেতৃত্বে
অনুসন্ধান দলে আছে উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক ও পরিদর্শক পদমর্যাদার
কর্মকর্তা। দলটি ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে কয়েক দফা অনুসন্ধান
কার্যক্রম পরিচালনা করে, যা এখনও অব্যাহত আছে। উল্লেখ করা যেতে পারে,
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের একটি বড় অংশ শুল্ক
গোয়েন্দা জমা দেয়। এসব স্বর্ণ স্থল ও বিমানবন্দর থেকে জব্দ করা হয়।
আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাকারবারিরা বিভিন্ন উপায়ে যাত্রী বেশে বিমানযোগে ও
স্থলপথে স্বর্ণের চালান এনে থাকে। অনেক সময় সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে শুল্ক
গোয়েন্দা টিম তা জব্দ করে। সূত্র জানায়, রিজার্ভ কেলেংকারির পর বাংলাদেশ
ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত স্বর্ণের নিরাপত্তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়।
অবশ্য এ
সংশয়ের আগুনে ঘি ঢালে শুল্ক গোয়েন্দার কাছে আসা একটি উড়ো চিঠি।
নাম-ঠিকানাবিহীন ওই চিঠির ভাষ্য ছিল, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত
স্বর্ণ যথাযথ অবস্থায় নেই...।’ এরপর নানা শংকা মাথায় নিয়ে প্রকৃত তথ্য
জানতে ভল্ট অনুসন্ধানে জোরালো অবস্থান নেয় দফতরটি। যুগান্তরের পক্ষ থেকে
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের জেনারেল ম্যানেজার বদরুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের
জন্য তার সরকারি টেলিফোনে কল করা হলে অফিস থেকে জানানো হয়, ‘জিএম স্যার
ছুটিতে আছেন।’ ভল্টে রক্ষিত স্বর্ণের বিষয়ে জিএম স্যার ছাড়া কেউ কোনো তথ্য
দিতে পারবেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে
বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বর্ণ যাচাই সংক্রান্ত প্রাথমিক একটি ধাপ এরই
মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনও
সরকারের উচ্চপর্যায়কে অবহিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভল্টে রক্ষিত
স্বর্ণ যাচাই একটি জটিল প্রক্রিয়া। কারণ সেখানে রক্ষিত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ
পৃথকভাবে পরিমাপ করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও দুরূহ একটি কাজ। এছাড়া
নিরাপত্তাজনিত কারণে ভল্টে ‘বহিরাগত উপস্থিতি’ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক
স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। সূত্র জানায়, চলমান প্রক্রিয়ায় ভল্টের অভ্যন্তরে
দ্রুত স্বর্ণমান যাচাইয়ের জন্য মান যাচাই যন্ত্র নিয়ে অনুসন্ধান চলছে।
এজন্য শুল্ক গোয়েন্দার অনুসন্ধান দলের সঙ্গে স্বর্ণমান বিশেষজ্ঞ বা গোল্ড
স্মিথ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মান যাচাইয়ে শুল্ক গোয়েন্দা বাংলাদেশ
জুয়েলারি সামিতির সহায়তা নিচ্ছে। জুয়েলারি সমিতির পক্ষ থেকে গত সপ্তাহে
শুল্ক গোয়েন্দার অনুসন্ধান দলে যোগ দেন স্বর্ণমান বিশেষজ্ঞ খালেদ আকন।
এ
প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খালেদ আকন মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘ভল্টে রক্ষিত
স্বর্ণের মান যাচাইয়ের জন্য শুল্ক গোয়েন্দা দলের সঙ্গে আমিসহ আরও কয়েকজন
মান বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আমরা মান যাচাই যন্ত্র দিয়ে স্বর্ণের বারগুলো পরীক্ষা
করছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাচাইকৃত স্বর্ণের মান নিয়ে বাইরের
কারও সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তাই এ নিয়ে
কিছু বলা যাবে না। এদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সাধারণ সম্পাদক
দিলীপ কুমার আগরওয়ালা মঙ্গলবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সমিতির
সহায়তা নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা টানা ১৫ দিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট যাচাই
করছে। সেখানে প্রতিদিন আমাদের ৩ জন করে স্বর্ণ বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন। তারা
প্রতি বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন।’ তিনি জানান, এটি খুব কঠিন
কাজ। এখন পর্যন্ত মাত্র ৩ হাজার ভরি স্বর্ণ পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। পুরো
কাজ শেষ করতে আরও অনেক সময় লাগবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ
ব্যাংক সর্বশেষ ২০১১ সালে নিলামে স্বর্ণ বিক্রি করেছিল। তবে উচিত হবে দ্রুত
নিলাম ডাকা। কারণ ভল্টে মজুদ স্বর্ণের দাম দিন দিন কমছে। সূত্র জানায়,
শুল্ক গোয়েন্দা দল অত্যন্ত নিখুঁত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পন্থায়
স্বর্ণের পরিমাণ ও মান যাচাই করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যাচাই পদ্ধতি নিয়ে
কেউ কেউ প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করলেও তা আমলে নিচ্ছে না শুল্ক গোয়েন্দা। তারা
জাতীয় স্বার্থে যাচাই কাজটি ভালোভাবে করতে চায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
যাচাই টিমের একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, রিজার্ভ চুরি যাওয়ার বিষয়টি মাথায়
রেখে তারা কাজ করছেন। তাই কোনো কিছুই সন্দেহের বাইরে রাখতে চান না। বিশেষ
করে যে মানের স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছিল সেটি অক্ষুণ্ন আছে কিনা। এছাড়া
পরিমাণের সঠিকতা যাচাইয়ে তারা আরও কঠোর। সূত্র জানায়, গত সাড়ে তিন বছরে
স্বর্ণ চোরাচালান রোধে দেশের সব বন্দরে বিশেষ অভিযান চালান শুল্ক
গোয়েন্দারা।
এর মধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযানে দেড় থেকে দুই মণ পর্যন্ত স্বর্ণ
জব্দ করা হয়। জব্দকৃত এসব স্বর্ণ নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা
রাখা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে
বলেন, চোরাইপথে বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের স্বর্ণ ধরা পড়ে। এর মধ্যে
পূর্ণাঙ্গ বার (বিস্কুট বার), কাটা বার বা ছোট বার ও স্বর্ণালংকার। ধরা পড়া
স্বর্ণের মালিক না থাকলে তা সরকারের ভল্টে (বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের
আলাদা ভল্ট আছে) জমা করা হয়। আর মালিকসহ ধরা পড়লে সে স্বর্ণ অস্থায়ী ভল্টে
রেখে মামলা করা হয়। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা, বাংলাদেশ
ব্যাংকের তিনজন কর্মকর্তা ও এনবিআরের একজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে কমিটি করে
দেয়া হয়। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে ভল্টের স্বর্ণ বিক্রির জন্য
দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে
সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে জব্দকৃত স্বর্ণ নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করে
বাংলাদেশ ব্যাংক। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বর্ণ বিক্রি ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক
নিজেও স্বর্ণ কেনে। শতভাগ খাঁটি বা ২৪ ক্যারেটের (যার গায়ে লেখা থাকে ৯৯৯)
স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ হিসাবে জমা রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র
জানায়, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে প্রায় ৩ হাজার ৫১৮ কোটি টাকার
খাঁটি স্বর্ণের মজুদ আছে।

No comments:
Post a Comment