যুগান্তরের
চতুর্দশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সময় আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় বরেণ্য সাংবাদিক ও
কবি, একুশের মহান সঙ্গীতের স্রষ্টা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘সময়ের
যথেষ্ট চড়াই-উতরাই যুগান্তর পেরিয়েছে। রাজরোষ, ক্ষমতাসীন দলের রোষ,
সন্ত্রাসের হুমকি এবং বহু কিছু তাকে পেরোতে হয়েছে। অন্য আরও দু-একটি বড়
কাগজের মতো সম্পূর্ণ চরিত্রভ্রষ্টতা, সুবিধাবাদিতা তাকে পেয়ে বসতে পারত।
বাজারি সাংবাদিকতায় ডুবে যেতে পারত কাগজটি। কিন্তু নানা প্রতিকূলতা
সত্ত্বেও যুগান্তর ক্ষমতার কাছে নতজানু না হয়ে তার সাধ্যমতো স্বাধীনতা,
অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বহন করেছে- এটাই আমার কাছে বিরাট
আনন্দ।’ এরপর দীর্ঘ তিন বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এবারও যখন আমরা আমাদের
অগ্রগতির সপ্তদশ বর্ষ পেরিয়ে তার আশীর্বাণীর জন্য বায়না ধরলাম- তিনি আবারও
লিখলেন, ‘যুগান্তর শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পাঠকের যেমন কাগজ, তেমনি
স্বল্পশিক্ষিত, নিম্নবিত্ত মানুষেরও কাগজ। সুবিধাবাদী উচ্চবিত্ত সুশীল
সমাজের মুখপত্র এটি নয়। বাংলাদেশে যে দু-চারটি দৈনিক সাংবাদিকতায়
শ্রেণীস্বার্থের মুখপত্র হয়ে ওঠেনি, যুগান্তর তার একটি।’ বিদগ্ধ সাংবাদিক
শ্রদ্ধেয় গাফ্ফার ভাই আমাদের নাড়ির স্পন্দনটি যথার্থই ধরতে পেরেছেন। তাই
তিনি লেখেন, যুগান্তর সংবাদ পরিবেশনে বস্তুনিষ্ঠ, মন্তব্য প্রকাশে
দলনিরপেক্ষ। বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে সব শ্রেণীর মানুষের দলনিরপেক্ষ পত্রিকা
হিসেবে। তবে মতনিরপেক্ষ নয়- এর মতবাদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ও
গণতন্ত্রের আদর্শ রক্ষার। আমাদের অগণিত পাঠক তার এ অভিমতের যথার্থতা
উপলব্ধি করেন প্রতিদিনের যুগান্তরের পাতায় পাতায়। সে কারণেই তারা আমাদের
সঙ্গে আছেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও একইভাবে বলেছেন, ‘স্বার্থের
ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো একটি সংবাদপত্রের চরিতার্থতার চূড়ান্ত
পরীক্ষা। সংবাদপত্রকে প্রতিদিন এই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। যুগান্তরকেও
হতে হচ্ছে। এর যতটা গ্রহণযোগ্যতা, তার আসল কারণ- জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে
নিরপেক্ষতা নয়, পক্ষ অবলম্বন।’ সতের বছর আগে আমাদের যুগান্তরের
প্রতিষ্ঠালগ্নের কথা আজ বড় বেশি মনে পড়ছে। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আমরা কতিপয়
নবীন-প্রবীণ সাংবাদিক একত্রিত হয়েছিলাম। আমাদের স্বপ্ন ছিল এমন একটি
সংবাদপত্র সংগঠিত করা, যার প্রাণশক্তি হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণমানুষের
আশা-আকাঙ্ক্ষা, আইনের শাসন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও
অগ্রগতি। দেড় যুগ খুব অল্প সময় নয়- এ দীর্ঘ সময়ে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে
লক্ষ্যে আজও আমরা নির্ভীক সৈনিক।
সে স্বপ্ন বুকে নিয়েই আমরা আমাদের মূল
স্লোগানটি নির্বাচন করি। যেটি আমাদের কাগজের প্রথম পাতায় ‘যুগান্তর’ নামটির
মাথার মুকুট হয়ে শোভা পায়, ‘সত্যের সন্ধানে নির্ভীক’। বাংলাদেশ আমাদের
চেতনায়। তাই ২০০০ সালে কর্তৃপক্ষের আগ্রহে আমরা সবাই মিলে ভাষার মাস
ফেব্রুয়ারির পহেলা তারিখকে পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশের দিন হিসেবে বেছে নিতে
পেরেছিলাম। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা ও দেশবাসীর সামনে যুগান্তর আত্মপ্রকাশের পর
সতেরটি ভাষার মাস পেছনে ফেলে এসেছে- আজও আমরা, সাংবাদিক কর্মীরা
লক্ষ্যচ্যুত হইনি। নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা, সংঘাত-সংশয়ে পরিপূর্ণ ২০১৬ সাল অতীত
হয়ে গেছে- অব্যাহত আছে আমাদের সাহসী পদক্ষেপ। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো
বলার স্পর্ধা আমরা দেখিয়ে চলেছি দিনের পর দিন। যুগান্তর তার নীতি ও আদর্শের
পথ থেকে কখনও বিচ্যুত হয়নি। যে কারণে অসংখ্য সংবাদপত্রের ভিড়ে যুগান্তর
তার স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে
একীভূত হয়ে আছে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভলগ্নে আজ আবার নতুন করে
আমাদের সংকল্প, দেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে,
সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে চলতে আমরা কখনও কুণ্ঠিত হব না। প্রিয় পাঠকরা
আমাদের সঙ্গে আছেন। দেশ ও জাতির কল্যাণকামী সাধারণ মানুষ আমাদের সঙ্গে
আছেন। ন্যায়বিচারের প্রত্যাশী সব শ্রেণী-পেশার বঞ্চিত ও অসহায় মানুষ আমাদের
সঙ্গে আছেন। তাদের সঙ্গে নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এগিয়ে যাব। ‘আমরা করব
জয়, আমরা করব জয়- নিশ্চয়!’ আজ ১৮ বছরে পদার্পণ করে নতুন আশায় বুক বেঁধে,
নতুন প্রেরণা নিয়ে নবতর পরিচয়ে পথচলা শুরু হল আবার। ১৮ বছর তারুণ্যের, ১৮
বছর নবযৌবনের। মানুষের জীবনে ১৮ বছর হার না মানার বয়স- জয়ের স্পৃহায় অদম্য
সাহস নিয়ে পা বাড়ানোর শুভলগ্ন। এ শুভলগ্নে আমাদের সব পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষী,
সুহৃদ ও পৃষ্ঠপোষককে জানাই অকুণ্ঠ ভালোবাসা। আপনারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন,
সঙ্গে আছেন, সামনের দিনগুলোতেও থাকবেন- এমনটাই আজকের প্রত্যাশা। সবার মঙ্গল
হোক!

No comments:
Post a Comment