Thursday, February 16, 2017

মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই নিয়ে কেন এই রঙ্গ-তামাশা?

মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ এইবার, গত ৪৬ বছরের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে, ৬ষ্ঠবারের মতো শুরু হয়েছে গত ২১ জানুয়ারি। কতদিন এই যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলবে, তা আমার সামনে এই কলামটি লেখার জন্য বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এ বিষয়ের ওপর প্রকাশিত পঞ্চাশ-ষাটটির মতো খবরের ক্লিপিংয়ের কোথাও চোখে পড়েনি। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল ‘জামুকা’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘যাচাই-বাছাই নির্দেশিকা’র ‘যাচাই-বাছাই পদ্ধতি’ শিরোনামের ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই কার্যক্রম একটানা চলবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গত ২৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত ৯:৩৫ মিনিটে চ্যানেল আইতে প্রচারিত বিবিসি প্রবাহ অনুষ্ঠানে এই যাচাই-বাছাই এক মাস চলবে, এমন একটি কথা বলেছেন বলে মনে পড়ে। তাহলে কী দাঁড়াল? যাচাই-বাছাই রোজ হাসর পর্যন্ত চলবে, নাকি ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ পর্যন্ত চলবে? এমন অসঙ্গতি এবং অস্পষ্টতা এই ‘যাচাই-বাছাই নির্দেশিকা’তে আরও আছে। যেমন- নির্দেশিকার শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘কারা যাচাই-বাছাইয়ের আওতাভুক্ত।’
এখানকার ৪টি ধারায় কয়েকটি নির্দিষ্ট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তাদের ব্যাপারে ‘যাচাই-বাছাই’-এর এই কার্যক্রম প্রযোজ্য হবে বলা হয়েছে। কিন্তু আমার অন্তর্ভুক্তিটাও কি যাচাই-বাছাই হবে? আমি নিশ্চিত নই। আমি লাল বই, মুক্তিবার্তা, ভারতীয় তালিকা- কোনোটিতেই নেই। কারণ আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য দরখাস্ত করি ২০১৫ সালের ৯ জুন, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের তখনকার সচিব বরাবর আমার দরখাস্তটি শক্ত সুপারিশসহ ১১ জুন পাঠিয়ে দেন আমাদের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। কয়েক মাসেও কোনো জবাব না পাওয়ায় শহীদুল হক তখন মক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একটি রিমাইন্ডার পাঠান, ২০১৫-এর ১২ আগস্ট। এই চিঠির জবাবে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব তার ১৯ আগস্ট ২০১৫ তারিখের চিঠিতে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হককে দেরির কারণ বর্ণনা করে আমার সম্পর্কে লেখেন, ‘আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে জনাব মহিউদ্দিন আহমেদের অবদান অনস্বীকার্য’। কিন্তু তার পরও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার নাম গেজেটে প্রকাশ করা হয় সাত মাস পর, ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ। আর আমার নামে সনদ ইস্যু করা হয় আরও চার মাস পর ২০১৬ সালের ১৪ জুলাই। তারপর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার প্রাপ্য সম্মানীর জন্য আবেদনটি তেজকুনীপাড়া সমাজসেবা অফিস, জেলা সমাজসেবা অফিস, জেলা প্রশাসক অফিস হয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট। তারপর থেকে গত ছয় মাস আমার আবেদনটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়েই পড়ে আছে। তো আমাকে যে সনদ দেয়া হয়েছে,
আমার নামে যে গেজেট, তা কি এখন আবার তারা যাচাই-বাছাই করছেন? তা না হলে গত ছয় মাস ধরে মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে কেন? এখানে রহস্য কী? এখানে কি নিন্মমানের তামাশা হচ্ছে না? তারা হাজার হাজার অভিযুক্ত মুক্তিযোদ্ধার যথার্থ যাচাই-বাছাই করবেন? এটা কি তামাশা নয়? তারপর, বিভিন্ন উপজেলায় যাচাই-বাছাই কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটিগুলোর ওপর গত ৩০ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম, ‘মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই নিয়ে জগাখিচুড়ি।’ এই খবরে বলা হয়েছে, ‘শতাধিক কমিটির সদস্যদের নিয়ে অভিযোগ, ৪৫টি উপজেলার কমিটি পুনর্গঠন, স্থগিত পাঁচটি।’
দুই. আমি বলছিলাম, উপজেলা পর্যায়ে তো কমিটি হল; কিন্তু শহর-নগর-মহানগরে কীভাবে, কাদের দিয়ে যাচাই-বাছাই কমিটি গঠিত হয়েছে তা তো কোথাও দেখলাম না। আমাদের এই ঢাকা শহরে তো উপজেলা বলে কোনো প্রশাসনিক এলাকা নেই। তাহলে আমি যে উত্তরায় থাকি, আমার যাচাই-বাছাই কমিটিতে কারা আছেন, কোথায় বসছেন, শুনানি করছেন, আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কেউ করেছেন কিনা, তা তো আমি জানি না। আমি জানব কী করে? কেউ কি আমাকে জানাবেন? যাচাই-বাছাই কমিটির ‘নির্দেশিকা’তেও তো নগর, মহানগর যাচাই-বাছাই কমিটির কথা কিছু উল্লেখ নেই। এই ‘নির্দেশিকাটি’র যাচাই-বাছাই পদ্ধতি সেকশনের ২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে : ‘যাচাই-বাছাই-এর তারিখ জাতীয় পত্রিকায় পরপর ২ দিন প্রকাশ, ইলেকট্রুনিক মিডিয়া ও ওয়েবসাইটে প্রচার করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উপজেলায় মাইকিং করা হবে।’ তো ঢাকার উত্তরায় বসবাসরত মুক্তিযোদ্ধাদের যথার্থতা যাচাই-বাছাই করার জন্য তারিখ কোন জাতীয় পত্রিকায়, কোন ইলেকট্রুনিক মিডিয়ায়, পরপর কোন দু’দিন প্রচার করা হয়েছে, কোন কোন দিন মাইকিং করা হয়েছে, আমার তো জানার অধিকার আছে। আমি মনে করি, এই অধিকার লাখ লাখ গেজেটভুক্ত, গেজেটবহির্ভূত বিভিন্ন ধরনের তালিকাভুক্ত, তালিকাবহির্ভূত মুক্তিযোদ্ধাদের তো আছেই; আছে প্রত্যেক মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারীরও। যাচাই-বাছাইতে আমি আমার অবস্থানটি জানতে তো চাই-ই, আমি গত তিন-চার সপ্তাহ ধরে আরও জানতে চাই বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা, এখন সচিব হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত, মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা, পরে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রদূত এবং ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবস্থানও। তাদেরও কি যাচাই-বাছাই কমিটির সম্মুখীন হতে হবে? তারা কেউ নিশ্চিত নন। তাদের একজন আমার প্রশ্নের জবাবে বরং বলেছেন, মন্ত্রণালয় মশকরা করছে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। এই পর্যায়ে মন্ত্রী মহোদয়কে একটি প্রশ্ন করি। প্রশ্নটি প্রায় সবার কাছে আমোদজনক এবং একই সঙ্গে উদ্বেগজনকও মনে হতে পারে। আচ্ছা আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত কি একজন মুক্তিযোদ্ধা? ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় ওয়াশিংটনে পাকিস্তান অ্যাম্বাসিতে ইকোনমিক কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার অসাধারণ ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে গত বছর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সিভিলিয়ান পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয় জনাব মুহিতকে। তার নাম কি গেজেটে আছে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার কি কোনো সনদ আছে? কিন্তু তিনি যে স্বাধীনতা পুরস্কারটি পেয়েছেন! তার পরও কি তার গেজেট দরকার, সনদ দরকার? তাকেও কি কোনো যাচাই-বাছাই কমিটির সামনে পরীক্ষা দিতে হবে? জনাব মুহিতের মতোই ওয়াশিংটনের এই একই অ্যাম্বাসিতে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন, তখন অ্যাম্ব্যাসির ‘ডেপুটি চিফ অব মিশন’ মরহুম এনায়েত করীম এবং পলিটিক্যাল কাউন্সিলর এসএএমএস কিবরিয়া। এনায়েত করীম সাহেব পরে আমাদের ফরেন সেক্রেটারি এবং কিবরিয়া সাহেব অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৭১-এর ১৮ এপ্রিল আমাদের কূটনৈতিক ফ্রন্টের আরেক যোদ্ধা মরহুম হোসেন আলী সাহেব, কলকাতায় পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে মোট ১০৫ জন সদস্যের মধ্যে ৬৫ জন বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে তার উপ-দূতাবাসটিই দখল করে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং সৃষ্টি করেছিলেন একটি ভূমিকম্প। পরে তিনি জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই তিনজনই- জনাব এনায়েত করীম, জনাব কিবরিয়া এবং জনাব হোসেন আলী পরে মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তো তাদের নামে কি কোনো গেজেট আছে? আছে কোনো সনদ? আমাদের কূটনৈতিক ফ্রন্টের প্রথম সৈনিক কেএম শিহাবউদ্দিন ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার আগে, ’৭১-এর ৬ এপ্রিল প্রথম বাঙালি কূটনীতিবিদ, পাকিস্তানের নতুন দিল্লি হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারির পক্ষ থেকে পদত্যাগ করে দুনিয়াতে ইতিহাস ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। কারণ এমন উদাহরণ আগে কোনোদিন দুনিয়ার কোথাও ঘটেনি। দু’বছর আগে তার মৃত্যুর পর তার চট্টগ্রামের গ্রামের বাড়িতে দাফনের সময় আপত্তি উঠল, তাকে তো গার্ড অব অনার দেয়া যাবে না, কারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম তো কোনো গেজেটে নেই, তার নামে তো কোনো সনদও নেই!! স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের চাপে এবং প্রতিবাদে শিহাবউদ্দিন ভাইকে অবশ্য শেষ পর্যন্ত ‘গার্ড অব অনার’ দেয়া হয়েছিল। পরের বছর তিনি অবশ্য মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।এমন আরও আছে। আমাদের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী কি একজন মুক্তিযোদ্ধা? তার নাম কি গেজেটে আছে? তার নামে কি কোনো সনদ আছে? কিন্তু তিনিও তো ’৭১-এর ২৫ এপ্রিল নিউইয়র্কে পাকিস্তানি কনস্যুলেট জেনারেলে ভাইস কনসাল হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। এই ভদ্রলোক মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ফ্রন্টের একজন সাহসী যোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও এই ফ্রন্টের মোট কতজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন, তারা কে কোথায় আছেন, কে কেমন আছেন, তা জানার বা খোঁজ নেয়ার কোনো আগ্রহ নেই তার। চিঠি লিখলে তার জবাবও দেন না তিনি। যেখানে তার উদ্যোগী হওয়ার কথা, স্বজাতি বলেই হয়তো তার এমন উদাসীনতা! আর একটি অতুলনীয় উদাহরণ দেয়া যায়। দৈনিক যুগান্তরে ‘ষষ্ঠ তালিকার কাজ ৫ বছর চলার পর আদালতের নির্দেশে স্থগিত, আর কতকাল অপেক্ষা’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি খবরে আমাদের এক সাবেক সেনাপ্রধান এবং বাংলাদেশ সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সাবেক মহাসচিব জেনারেল হারুন অর রশীদের এই মন্তব্যটি দেখুন : ‘আমি নিজেও মুক্তিযোদ্ধা কিনা তা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য উপজেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। কবে নাগাদ স্বীকৃতি পাব বলতে পারছি না। কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, যারা সেনাবাহিনীর চাকরিতে থাকাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাদের সনদের প্রয়োজন হয়নি। এখন আমরা যারা অবসরে আছি এবং সুযোগ-সুবিধার প্রশ্ন আসছে তখন বলা হচ্ছে সেনাবাহিনীর সার্টিফিকেটে হবে না, জাতীয় সার্টিফিকেট লাগবে। আমাদের কাছে জাতীয় সার্টিফিকেট নেই, তাই দরখাস্ত করেছি। তিনি বলেন, সরকারের দ্বারে দ্বারে ঘুরে পরীক্ষা দিয়ে সনদ নেবেন এমন বয়স প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের আর নেই। প্রতিদিন গড়ে ১০-১২ জন মারা যাচ্ছেন। মারা যাওয়ার পর সনদ দিয়ে কী হবে?’ তাই বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিন. যাচাই-বাছাই কমিটি সম্পর্কে এখন আর একবার মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল জাফর ইমাম বীরবিক্রমের এই মন্তব্যটিও পড়–ন। গত ২৫ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এ ‘একতরফাভাবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা করা মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থী’ শিরোনামে তার ছবিসহ প্রকাশিত এক খবরে তিনি বলেন- মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) প্রতিনিধি, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রতিনিধি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধা প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত। এরা সবাই একই উৎসের প্রতিনিধিত্ব করেন। যেমন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, তিনি আবার জামুকারও চেয়ারম্যান। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একযোগে কাজ করেন। আর যিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা নেতা, তিনিও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কিনা তারও নিশ্চয়তা নেই। তাই বলব এ কমিটির সদস্যদের আগে যাচাই-বাছাই করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে এই যাচাই-বাছাই করার উদ্যোগ গ্রহণ না করলে সঠিক তালিকা কখনও প্রণয়ন করা সম্ভব হবে না। মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল জাফর ইমামের ক্ষোভ খুবই সঙ্গত। আমাদের দু’জনের বাড়িই ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। তার গ্রামের নাম নোয়াপুর, আমারটির নূরপুর। ’৭১-এ ফেনী বিলোনিয়া মুক্তিযুদ্ধের বড় এক রণাঙ্গন ছিল। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের অধীনে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে কর্নেল জাফর ইমাম (হুমায়ুন) বলিষ্ঠ এবং সাহসী নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনিই তো সবার চেয়ে বেশি জানবেন, তার সঙ্গে কারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু ফুলগাজী, পরশুরাম, ফেনী, ছাগলনাইয়া- এই উপজেলাগুলোর জন্য যে যাচাই-বাছাই কমিটি করা হয়েছে তার কোথাও তিনি নেই!! কিন্তু ‘জামুকা’ যাকে ফেনীর তিনটি উপজেলা কমিটির প্রধান বানিয়েছিল, বলা যায় মন্ত্রীর নির্দেশেই, তাকে ফুলগাজী কমিটির অন্য সদস্যরা গ্রহণই করেননি, তারা তার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করলে কমিটি বাতিল ঘোষণা করা হয়। বিবিসি বাংলার প্রবাহ অনুষ্ঠানের সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী দু’বার ‘সৌন্দর্য’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তার এই নতুন যাচাই-বাছাইতে ‘সৌন্দর্য’ আছে, দক্ষতা, সততা এবং দ্রুততার সঙ্গে এই কাজ সম্পন্ন হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এখানেও তিনি তামাশা করলেন। তারই ‘জামুকা’র এক সহকারী পরিচালক শাহ আলম তার বাবা মোসলেহ উদ্দিন এবং শ্বশুর মোসলেহ উদ্দিন, এই দুই বেয়াইকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে সনদ দিয়ে দিল। প্রতিক্রিয়ায় গত ১৭ অক্টোবর ‘জামুকা’ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, শাহ আলমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে, তারপর তো চার মাস হল, কী হয়েছে শাহ আলমের? আর মন্ত্রীর সইয়েই তো সনদ ইস্যু করা হয়েছিল, গেজেটও হয়েছিল। তো মন্ত্রী যখন এই কাগজগুলো সই করেন, তখন তিনি নিশ্চয় বুঝে-শুনেই তা করেছিলেন। এই তার মন্ত্রণালয়ের সততার উদাহরণ?
চার. বিশ্বাস করতে পারছি না, মন্ত্রণালয় সঠিক এবং প্রত্যাশিত পথে রয়েছে। আমার অবস্থানটা কোথায়, আমাকেও যাচাই-বাছাই কমিটির সামনে হাজির হতে হবে কিনা, জানতে ‘জামুকা’র মহাপরিচালক পূর্ণব্রত চৌধুরীকে গত ২৮.১.২০১৭ একটি এসএমএস পাঠিয়েছিলাম। তিনি জবাব দেননি, জবাব আর আশাও করি না। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তার অধীনস্থ সংস্থাগুলোর আইন-কানুন, বিধি-বিধান সব ইন্টারনেটেও দেখি না। নিউমার্কেটের আলীগড় বুক হাউস এবং পাশের আর একটি বুক স্টোরেও খোঁজ করলাম। নাহ্, তাদের কাছেও এই মন্ত্রণালয় বা ‘জামুকা’র প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত কোনো আইন-কানুন, বিধি-বিধান, কিছুই নেই। কিন্তু এই দুটি স্টোরেই সরকারি প্রকাশনাগুলো পাওয়া যায়। আমি শুনেছি, বিএনপি-জামায়াত জমানায় ‘জামুকা’র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু আমার জানার আগ্রহ কোন আইনে এর প্রতিষ্ঠা, এর ক’জন সদস্য থাকবেন, কী যোগ্যতায় তাদের নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে, জামুকার কার্যাবলী কী ইত্যাদি। মাননীয় মন্ত্রী মোজাম্মেল হককে মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি কাজ করতে অনুরোধ করি। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে না বলে অনেক মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বন্ধ। শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি এবং সম্মানে এত কিছু করছেন, কিন্তু আপনার মন্ত্রণালয়ে এর অনেকগুলো যেন ‘স্যাবোটাজ’ ফ্রাস্ট্রেট করা হচ্ছে, তা বন্ধ করুন। আর একই কারণে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আপনার মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে চাকরির কোটায় দরখাস্ত করার সুযোগ পাচ্ছে না। এক সম্পাদকের মতে এই সংখ্যা ৫ হাজার। আর সবশেষে আপনার মন্ত্রণালয় এবং তার অধীনস্থ সব সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার জন্য প্রযোজ্য আইন-কানুন, বিধি-বিধানের একটি সংকলন প্রকাশ করুন। যদি সম্ভব হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের যত রকমের তালিকা আছে সব বাজারে বিক্রির ব্যবস্থাও করুন।
শনিবার ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭
শিউলীতলা, উত্তরা, ঢাকা
মহিউদ্দিন আহমদ : সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কলাম লেখক

No comments:

Post a Comment