মিয়ানমার
বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন প্রতিবেশী দেশ। এ উপমহাদেশের মতো মিয়ানমারও
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। ১৯৪৮ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে।
বিগত প্রায় ৫০ বছর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশটি সামরিক শাসনের অধীনে ছিল।
২০১৫ সালের নির্বাচনে অং সান সু চির ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)
বিশাল বিজয় অর্জন করে। নির্বাচনে জয়লাভ এবং এনএলডির ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশে
ও বিশ্বে আশার সঞ্চার হয়েছিল, সরকার রোহিঙ্গাসহ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর
সমাধান করে দেশকে গণতন্ত্রের পথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে নেবে।
কিন্তু
সাম্প্রতিককালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা ব্যাপক নিপীড়নের
শিকার হওয়ায় বিশ্ববাসী স্বভাবতই ক্ষুব্ধ হয়েছে এবং নিন্দা জানাচ্ছে। মুসলিম
জনগোষ্ঠী রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে বসতি স্থাপন শুরু করে পঞ্চদশ শতাব্দী
থেকে। ১৮২৬ সালে প্রথম অ্যাঙ্গলো বার্মিজ যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা আরাকানকে
তাদের প্রশাসনভুক্ত করে নেয় এবং অন্য এলাকার অধিবাসীদের খামারে শ্রমিক
হিসেবে নিয়োগ দিতে থাকে। ফলে ওই এলাকায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে
থাকে। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের (বার্মা) স্বাধীনতার পর বৌদ্ধ অধ্যুষিত
প্রশাসনের বৈষম্য নিরসনের জন্য মুজাহিদীন বিদ্রোহীরা বিচ্ছিন্নতাবাদী
আন্দোলন শুরু করে, যা ষাটের দশক পর্যন্ত চলতে থাকে; পাশাপাশি রাখাইন
বৌদ্ধদেরও আরাকানি স্বাধীনতা আন্দোলন চলেছিল। ১৯৮২ সালে জেনারেল নে উইনের
সরকার নতুন বার্মিজ জাতীয়তা আইন জারি করে, যেখানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব
অস্বীকার করা হয় এবং সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রবিহীন গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।
২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যে দাঙ্গা, ২০১৫ সালে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা এবং
২০১৬ সালে সামরিক বাহিনীর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়টির প্রতি
আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যে প্রায় ১০ লাখ
মুসলিম রোহিঙ্গা বাস করে। বাংলাদেশে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এর
মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে অত্যাচারিত হয়ে ৬৮ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে
ঢুকেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও সৌদি আরব, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভারত,
ইন্দোনেশিয়া ও নেপালে ৬ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। সম্প্রতি রাখাইন
সীমান্তে ৯ নিরাপত্তারক্ষীকে জঙ্গি গ্রুপ হত্যা করার পর মিয়ানমারের
সেনাবাহিনী আক্রমণ চালায়। এ হামলা চলাকালে হাজার হাজার বসতবাড়ি, বাণিজ্যিক
প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে ফেলা হয়। নির্যাতন-নিপীড়নের পাশাপাশি ধর্ষণ ও হতাহতের
ঘটনা ঘটে। এলাকা ছেড়ে বাধ্য হয়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ
করে। জাতিসংঘের হিসাবেও এ সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার।
মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের
বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ইয়াংঘিলি রাখাইন রাজ্যে তিন দিনের সফর করেছেন। তিনি
ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সঙ্গে আলাপ করেছেন এবং প্রশাসনের লোকদের সঙ্গেও কথা
বলেছেন। তবে তাকে রাখাইন রাজ্যের বেশক’টি জায়গায় যেতে দেয়া হয়নি। মিয়ানমার
সরকার সেদেশের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন চালানের মতো
অপরাধ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে কয়েকটি মানবাধিকার
সংস্থা। সরকার গঠিত তদন্ত কমিশন রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া
যায়নি বলে প্রতিবেদন দেয়ার পর এ অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারী সংস্থাগুলো হল-
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) এবং দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ফোরটি-ফাইভ রাইটস। এইচআরডাব্লিউ বলছে,
মিয়ানমার সরকারের অপরাধ লুকানোর কৌশলের মতোই তদন্ত প্যানেল কাজ করেছে,
যেমনটা ধারণা করা হয়েছিল। ফোরটি-ফাইভ রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথিউ স্মিথ
বলেছেন, মিয়ানমারের সেনারা নৃশংস অপরাধ করেছে। কমিশন তা লুকানোর চেষ্টা
করছে। অস্ত্রধারীদের হামলায় দেশটির ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হয়। এরপর সেখানে
সেনাবাহিনীর অভিযানে অন্তত শতাধিক ব্যক্তি নিহত এবং ৫০ হাজারের বেশি লোক
বাংলাদেশ সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশে নিযুক্ত নরডিক
রাষ্ট্রদূতদের মতে, মিয়ানমারে হিংসা বন্ধ না হলে রোহিঙ্গা সমস্যার
দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান নেই।
সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রাণভয়ে
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সবাই দ্রুত রাখাইনে ফিরে গিয়ে জীবন ও জীবিকা শুরু
করতে আগ্রহী। মিয়ানমার থেকে নতুন করে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে
জানতে সরেজমিন কক্সবাজার সফরের পর এমন মত দিয়েছেন নরডিক রাষ্ট্র সুইডেন,
নরওয়ে ও ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতও এলাকা
সফর করেছেন। ভারতের প্রচারমাধ্যম ও নাগরিক সমাজও রোহিঙ্গা নির্যাতনের
প্রতিবাদ করেছে। রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের প্রতি সহিংসতা ও
বঞ্চনা বন্ধে মিয়ানমারকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে বলেছে ইসলামী সহযোগিতা
সংস্থা (ওআইসি)। ৫৭টি মুসলিম অধ্যুষিত দেশের এ জোট মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের
নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তন এনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে
দেশটির কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি
নিয়ে ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বিশেষ বৈঠক শেষে ঘোষিত ১০ দফা ইশতেহারে এ
আহ্বান জানানো হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেদেশের সেনাবাহিনী ও
পুলিশের দমন-পীড়নের মুখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা
রোহিঙ্গাদের দুটি শিবির পরিদর্শন করেছে কফি আনান কমিশনের প্রতিনিধি দল।
প্রতিনিধি দলের সদস্যদের কাছে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা নির্যাতনের করুণ চিত্র
তুলে ধরেন। রাখাইন রাজ্যের জনগণের কল্যাণে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণে
সুপারিশ তৈরির জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তি অং সান সু চি
গত বছর জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানকে প্রধান করে একটি পরামর্শক
কমিটি গঠন করেন। রাখাইন রাজ্যের সব নাগরিকের নাগরিকত্ব, মৌলিক অধিকার ও
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপাদানগুলো নিয়ে কমিশন সুপারিশ তৈরি করবে। ইতিমধ্যে
জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক মানবাধিকার সংস্থা রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের
ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ প্রতিবেদনে
নির্যাতন-নিপীড়নের ব্যাপক চিত্র তুলে ধরে একে জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ (এথনিক
ক্লিনজিং) হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট
সবাইকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশী
কূটনীতিকদের রোহিঙ্গা বিষয়ে অবহিত করেছেন। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা
রোহিঙ্গাদের উন্নত মানবিক সেবা দিতে নোয়াখালীর ঠেংগার চরে সরানোর বিষয়
উল্লেখ করা হয়। মূলত এসব লোকজনকে উন্নত মানবিক সেবা দেয়া এবং রোহিঙ্গাদের
স্থানীয় লোকদের সঙ্গে মিশে যাওয়া বন্ধ করতেই ওই চরে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
কূটনীতিকরা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের উন্নত মানবিক সেবা দিতে
ঠেংগারচরে সরানোর প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়ার
প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রোহিঙ্গা সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান যেহেতু মিয়ানমারের
হাতে, তাই তাদের জন্মভূমিতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায়ও আন্তর্জাতিক
সম্প্রদায় বাংলাদেশকে সাহায্য করবে। সম্প্রতি মিয়ানমার সরকারের এক
প্রতিনিধি বাংলাদেশ সফর করেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেন। তিনি
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু আগের মতোই এসব আলোচনায় কোনো
ইতিবাচক দিক লক্ষ করা যায়নি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম
সম্প্রদায় দমন-পীড়নের শিকার ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং প্রশাসনের
উদ্যোগ ও সহযোগিতায় ব্যাপক নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে দলে দলে দেশ ত্যাগ
করতে বাধ্য হচ্ছে।
এ বিষয়টি আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। জাতিসংঘ, বিভিন্ন
মানবাধিকার সংস্থা, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও ওআইসি এর প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং এ
সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। মিয়ানমারের জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এর
মধ্যে ৮৯ শতাংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, ৫ শতাংশ মুসলিম, ৪ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ২
শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সেদেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ
বর্মি জনগোষ্ঠী জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ। আর ১৩৫টি নৃগোষ্ঠী রয়েছে, যারা
জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ। এর মধ্যে শান, কারেন, চিনমন, রাখাইন, কাহিম ও তাইহা
জনগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। মিয়ানমারের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী
আন্দোলন ও সশস্ত্র যুদ্ধ করছে। বর্তমান সরকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে
সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনা করছে। এসব বন্ধে ৮টি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি
হয়েছে, ৭টির সঙ্গে আলোচনা চলছে। অং সান সু চির এনএলডি বিগত নির্বাচনে জাতীয়
ও আঞ্চলিক পরিষদের ৭৭ শতাংশ আসন লাভ করে। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ও
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরস্পরের পরিপূরক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে
সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধান করতে হবে। বিশেষ
করে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা
আশা করব, রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের দেশে
ফিরিয়ে নিতে হবে। আন্তঃধর্ম ও আন্তঃসম্প্রদায় বন্ধন জোরদারের মাধ্যমে সবার
অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং
মিয়ানমার পরিণত হতে পারে একটি সমৃদ্ধ দেশে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ও
বিমসটেকের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে এটাই আমরা প্রত্যাশা করি।
ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক রাষ্ট্রদূত
ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক রাষ্ট্রদূত

No comments:
Post a Comment