সিভিল
ওয়ার না ক্রুসেড, ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বসে কোনটি শুরু করতে চান?
নাকি উপকথার এ ডন কুইটজোট প্রেসিডেন্ট দুটিই শুরু করতে চান? প্রশ্নটি
তুলেছেন মার্কিন মুল্লুকের এক সাংবাদিক। ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন নীতি, বিশেষ
করে সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মুসলমান নাগরিকদের মাথায় ঢালাওভাবে
টেরোরিজমের ছাপ মেরে তাদের আমেরিকায় আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি আমেরিকাসহ
সারা বিশ্বেই বিক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। হোয়াইট হাউসের সামনেই চলছে বিশাল
গণবিক্ষোভ। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ১০ লাখ নারীর বিক্ষোভ মিছিল সারা বিশ্বকে
আলোড়িত করেছে। আমেরিকা মূলত অভিবাসীদের দেশ। এদেশে তাদের বিরুদ্ধে আইন করা
হলে তাতে গৃহযুদ্ধের সূচনা হতে পারে। ওই মার্কিন সাংবাদিক তাই আশংকা প্রকাশ
করেছেন, দেড়শ’ বছর আগে আমেরিকায় উত্তর-দক্ষিণের মধ্যে যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ
হয়েছিল, বর্তমানে অভিবাসী বিতাড়ন ও ঠেকানোর প্রশ্নে সেই ধরনের গৃহযুদ্ধ
শুরু হতে পারে। যার আলামত এখনই দেখা যাচ্ছে। আমার বর্ণিত এই মার্কিন
সাংবাদিকের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন জাতিকে শুধু দ্বিধাবিভক্ত করে
ফেলেননি, তাদের এক ভয়ানক গৃহযুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে চলেছেন। ট্রাম্প ইরান
সম্পর্কে অভিযোগ তুলেছেন, ইরান আগুন নিয়ে খেলছে।
কিন্তু তার নগ্ন
মুসলিমবিদ্বেষী নীতি যে বিশ্বে আরও ভয়ানক আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে তা বোঝার
ক্ষমতা সম্ভবত এই অনভিজ্ঞ প্রেসিডেন্টের নেই। নিজ দেশে তিনি যদি গৃহযুদ্ধের
সূচনা করে থাকেন, তাহলে বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তিনি যে বহু শতক
আগের মুসলমান বনাম খ্রিস্টানদের ক্রুসেড আবার শুরু করতে চান এমন কথা অবশ্যই
ভাবা চলে। বহু শতবর্ষ আগে মিসরের মুসলমান রাজা সালাহুদ্দীনের নেতৃত্বে
গঠিত মুসলিম শক্তিশিবির এবং ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ডের নেতৃত্বে গঠিত
খ্রিস্টান শক্তির মধ্যে সিরিজ অব ক্রুসেডে সালাহুদ্দীনের কাছে কিং রিচার্ড
শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন, তার ইতিহাস বিখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক স্যার
ওয়াল্টার স্পটের ‘টলিসম্যান’ উপন্যাসে আছে। এ যুদ্ধের একটি মানবিক দিকও
স্কট দেখিয়েছেন। যুদ্ধ চলাকালে কিং রিচার্ড গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
তখন রাজা সালাহুদ্দীন নিজের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতি ঘটান এবং চিকিৎসকের
ছদ্মবেশে খ্রিস্টান শিবিরে এসে চিকিৎসার দ্বারা কিং রিচার্ডকে সুস্থ করে
তোলেন। রিচার্ডের সুস্থতার পর তিনি আবার যুদ্ধ শুরু করেন। ইংল্যান্ডের রাজা
শত্রুপক্ষের উদারতার কথা জেনে আর যুদ্ধ করতে চাননি, পরাজয় মেনে স্বদেশে
ফিরে যান। এ পরাজয়ের গ্লানি খ্রিস্টান পশ্চিমা শক্তি বহুকাল ভুলতে পারেনি।
প্রথম মহাযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) সময় মুসলিম অটোম্যান এম্পায়ার (ওসমানিয়া
সাম্রাজ্য) ভেঙে ফেলার পর এক ব্রিটিশ নেতা নাকি গর্ব করে বলেছিলেন,
‘ক্রুসেডের পরাজয়ের প্রতিশোধ এতদিনে নেয়া গেল। পশ্চিমা খ্রিস্টান দেশগুলো
এখন সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার বড়াই করে। কিন্তু তাদের মন থেকে যে
পুরনো ইসলাম ফোবিয়া ও মুসলিম ফোবিয়া এখনও মুছে যায়নি তার প্রমাণ,
নাইন-ইলেভেনের পর যখন বুশ-ব্লেয়ার মিথ্যা অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করেন, তখন
প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ (জুনিয়র) উৎসাহের আতিশয্যে মনের কথাটা প্রকাশ করে
ফেলেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা আবার ক্রুসেড শুরু করেছি।’ তখনকার ব্রিটিশ
প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বুশের মতো নির্বোধ রাজনীতিক ছিলেন না। তিনি
সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলেছিলেন, বুশের নির্বুদ্ধিতায় শুধু মিত্র মুসলিম
দেশগুলো নয়, বিশ্বের এমনকি ব্রিটেনের মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হবে। তাতে তাদের
যুদ্ধের উদ্দেশ্য পূরণ বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বুশকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে কথাটা
প্রত্যাহার করান এবং নিজে ব্রিটেনের মসজিদগুলোতে ঘুরে ঘুরে ব্রিটিশ
মুসলিমদের এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো ক্রুসেড নয়। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্প জর্জ বুশের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। তিনি সাতটি মুসলিম
সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাকে ক্রুসেড আখ্যা দেননি;
কিন্তু কার্যত বুশ-নীতি আরও ব্যাপকভাবে অনুসরণ করতে চলেছেন। তার টার্গেট
সাধারণ বহিরাগতের হলেও আসল টার্গেট মুসলমানরা। তিনি সাতটি দেশের মুসলমানকেই
টেরোরিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
আমেরিকায় অভিবাসী মুসলমানরাও তাতে শংকিত। এই যুগটা কিং রিচার্ডের যুগ নয়,
আর বর্তমান আমেরিকাও অতীতের ইংল্যান্ডের মতো নয়। এ যুগে যে ক্রুসেড শুরু
করা যায় না, করলে তা বুমেরাং হয়,
এই সত্যটা টনি ব্লেয়ার বুঝেছিলেন। এখন
আমেরিকার এস্টাবলিশমেন্ট এবং জুডিশিয়ারির কেউ কেউ বুঝতে পেরে ট্রাম্পের
হঠকারিতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহসী হয়েছেন। একজন ফেডারেল জজ ইতিমধ্যেই
প্রেসিডেন্টের বহিরাগত সম্পর্কিত এক্সিকিউটিভ অর্ডারটি অবৈধ ঘোষণা করে তা
কার্যকর না করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই জজ জেমস রবার্ট ২০০৩ সালে জর্জ বুশ
কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ফেডারেল জজের এই রুলিংয়ে প্রেসিডেন্ট
ট্রাম্প বেজায় ক্ষিপ্ত হয়েছেন। তিনি তার টুইটারে বিচারকের বিরুদ্ধে হুমকি
দেয়া শুরু করেছেন। এ সম্পর্কে লন্ডনের সানডে টাইমস (৫ ফেব্রুয়ারি) মন্তব্য
করেছে : The ruling put the white house on a collision course with the
federal courts and set the stage for an epic political battle over a key
TrumpÕs compaign promise. বিচারকের এই রুলিং হোয়াইট হাউসকে ফেডারেল
কোর্টের সঙ্গে সংঘর্ষের মুখোমুখি করেছে। যার ফলে ট্রাম্পের একটি প্রধান
নির্বাচন প্রতিশ্রুতি পালন নিয়ে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার
ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই এই রাজনৈতিক যুদ্ধের সূচনা
করেছেন। এ যুদ্ধে একদিকে তিনি এবং তার নিযুক্ত উপদেষ্টারা এবং অন্যদিকে
অভিবাসীসহ মার্কিন জনগণের এক বিরাট অংশ এবং মার্কিন এস্টাবলিশমেন্ট ও
জুডিশিয়ারির একটা অংশ। এই যুদ্ধ বিস্তৃত হলে এটাকে গৃহযুদ্ধই বলা চলবে। এই
যুদ্ধে ট্রাম্প কি জয়ী হবেন? আমেরিকা কি রক্ষা পাবে? এটা গেল গৃহযুদ্ধের
কথা। বহির্বিশ্বেও ট্রাম্প অতীতের ক্রুসেড শুরু করার অভিযোগ কি এড়াতে
পারবেন? সাতটি মুসলিম দেশের মুসলিম অধিবাসীদের সঙ্গে একযোগে বিবাদকে অতীতের
ক্রুসেডের পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কি আখ্যা দেয়া যেতে পারে? এক্ষেত্রে
ট্রাম্পের প্রধান টার্গেট ইরান। ইরান একটি সুপার পাওয়ার না হলেও বর্তমানে
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম দেশ। আমেরিকার রক্তচক্ষুর সে
তোয়াক্কা করে না। কিন্তু ইরানের অসুবিধার কারণ হল, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম
দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য নেই। বরং কয়েকটি দেশ আছে যাদের ভূমিকা বিভীষণের।
রাজতন্ত্রী সৌদি আরব আমেরিকার ক্লায়েন্ট স্টেট। ইসরাইলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে
যে ইরানকে ধ্বংস করতে চায়। এ জন্য ওবামার আমলে সৌদি আরব ও ইসরাইল
সম্মিলিতভাবে আমেরিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।
যাতে ওবামা ইরানকে বোমাবর্ষণ
দ্বারা ধ্বংস করেন। ওবামা তা করেননি। বরং ইরানের সঙ্গে পরমাণু সংক্রান্ত
চুক্তি করেছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানকে শায়েস্তা
করতে চান। সৌদি আরব ও ইসরাইলকে খুশি করতে চায়। গোটা বিশ্বের মুসলিম
দেশগুলোর মধ্যে অনৈক্যই ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী নীতিকে উৎসাহ জোগাচ্ছে।
তার মুসলিমবিদ্বেষী নীতিকে উপেক্ষা করে বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশ তার
নির্বাচন জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার গর্হিত কাজগুলোর
প্রতিবাদ জানাতে পারেনি। তবু এ পরিস্থিতিতেও ক্ষীণ আশার আলো আছে। ‘সানডে
টাইমস’ পত্রিকার কলামিস্ট নিয়াল ফার্গুসন ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘প্রথমে
ইরান, তারপর ট্রাম্প নয়াচীনের দিকে চক্ষু ফেরাতে পারেন।’ তা যদি হয়, তাহলে
ট্রাম্প নিজেই নিজের পতনের রাস্তাটি তৈরি করবেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলার
ফ্রান্স দখল করার পর ইংলিশ চ্যানেলের তীরে পৌঁছেও ইংল্যান্ড আক্রমণ না করে
রাশিয়ার বিরুদ্ধে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে যে ভুল করেছিলেন, সে ভুলের
পুনরাবৃত্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প করতে পারেন। তার পরিণতি ভিন্ন হওয়ার কথা নয়।
গল্পের ডন কুইটজোটের মতো তিনি যদি অলীক শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন,
তাহলে তার পরিণতি ভালো হওয়ার কথা নয়।
লন্ডন ৫ ফেব্রুয়ারি, রোববার, ২০১৭
লন্ডন ৫ ফেব্রুয়ারি, রোববার, ২০১৭

No comments:
Post a Comment