ভাষা
আন্দোলনের পথ ধরেই আমরা পাকিস্তান সম্পর্কে মোহমুক্ত হয়েছিলাম। দ্বিজাতি
তত্ত্ব ত্যাগ করে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ গঠনে আমরা প্রয়াস পেয়েছিলাম।
ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ যে প্রকৃত পক্ষে জাতীয়তাবাদের বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই
নয় ক্রমেই আমাদের ভেতরে এ সত্যি উপলব্ধি সঞ্চারিত হচ্ছিল এবং আমাদের
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করার জন্য যে পূর্বসূরিরা জীবনদান করেছিলেন সেই
আত্মোৎসর্গের মর্যাদা রক্ষা করার জন্যই আমরা ধীরে ধীরে স্বাধিকারের পথ ধরে
স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম।
বাংলা ভাষাকে অর্থাৎ আমাদের মাতৃভাষাকে
বিকৃত করার জন্য, মাতৃভাষার শেকড় থেকে আমাদেরকে বিচ্যুত করার জন্য যেসব
অপপ্রয়াস পাকিস্তানি শাসক এবং তার দোসরেরা করেছিল তার বিরুদ্ধে যথার্থত
রুখে দাঁড়িয়েই আমরা বাংলা বর্ণমালার সংস্কারের নামে সংহার প্রচেষ্টাকে
নিবৃত করেছিলাম, রবীন্দ্রনাথকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, নজরুলের খণ্ডিকরণ
প্রতিহত করেছিলাম। এই ভাবে আমরা যে স্বাধীন দেশটার পত্তন করলাম সেই স্বাধীন
দেশে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করার জন্য আমাদের সংবিধানে পরিষ্কারভাবে লিখে
দিলাম যে,
বাংলা হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রভাষা, জীবনের সর্বস্তরে মাতৃভাষা
বাংলা ভাষার ব্যবহার করব। এই প্রত্যয় আমাদের স্বাধীনতার প্রত্যয়ের সঙ্গে
সংযুক্ত ছিল। কিন্তু যদি আত্মবিশ্লেষণের দৃষ্টিতে তাকাই তাহলে দেখব যে,
আমরা সেই প্রত্যয় থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে এসেছি। একটি নতুন লুটপাটতন্ত্রী
শ্রেণী আমাদের দেশে জন্ম নিয়েছে এবং সেই লুটপাটতন্ত্রীরাই সর্বত্র কর্তৃত্ব
প্রতিষ্ঠা করেছে। আর তাদের লুটপাট দেখে যারা লুটপাটে অংশীদার নয় তাদের
মধ্যেও ওই কর্তৃত্বশীল শ্রেণীর চেতনা সঞ্চারিত হয়ে যাচ্ছে। ওই কর্তৃত্বশীল
লুটেরা শ্রেণী বাংলা ভাষাকে এমন ভাবে বিপর্যস্ত করে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল,
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে আমাদের শিক্ষাকে সম্পূর্ণ বিজাতীয় ধারায়
প্রবাহিত করছে। সত্যিকার অর্থে জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা
করা তো দূরের কথা তারা বাংলা ভাষাকে আমাদের জীবন থেকে অনেক দূরে সরিয়ে
নিয়েছে। আমরা বাংলায় কথা বলতে গিয়েও প্রতিনিয়ত ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করি।
‘সো’ ‘বাট’ এসবকে বাংলা ভাষার অন্তর্গত করে নিয়েছি। টেলিভিশনের টকশোতে যখন
কথাবার্তা শুনি তখন তা টক বলেই বোধ হয়। সর্বত্র বাংলা ভাষার সঙ্গে ইংরেজি
এবং ভুল ইংরেজির মিশেল আমাদের যারপরনাই বিব্রত করে। নিজের ভাষা নিয়ে এমন
অবিমৃষ্যকারিতার,
হীনমন্যতার উদাহরণ আর কোনো জাতির আছে বলে আমার জানা নেই।
স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর পেরিয়ে এসে আজ পর্যন্ত আমরা মাতৃভাষায়
জ্ঞানচর্চার উপযোগী পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে পারিনি। উপরন্তু বাংলা মাধ্যমে
যারা আজ শিক্ষা গ্রহণ করছে তারা নোট গাইড মুখস্ত করে পড়াশোনার বৈতরণী পার
হচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নাই। এই শিক্ষা এতই
নিন্মমানের যে, এই শিক্ষায় শিক্ষিতরা বিশ্বমানের শিক্ষার সঙ্গে প্রতিযোগিতা
করা তো দূরে থাক, তার পাশে দাঁড়াতেও পারবে না। ফলে আমাদের এই
প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকাই দিন দিন দুরূহ হয়ে উঠছে। এই রূঢ়
বাস্তবতা থেকে আমরা যদি বেরিয়ে আসতে না পারি তবে ভূলুণ্ঠিত হবে আমাদের সব
অর্জন ও গৌরব। আর এ থেকে বেরিয়ে আসার একটাই পথ আমি মনে করি তা হচ্ছে-
সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা। আর তা বাস্তবায়নের
জন্য সর্বোচ্চ সদিচ্ছা দিয়ে বাঙালি জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে
প্রাধান্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ এই একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে নিতে হবে।
আমি মনে করি, একুশ শতকের বাঙালি তরুণ প্রজন্মের জন্য এটাই মহত্তম সংগ্রাম।
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

No comments:
Post a Comment