একক
ব্যক্তি খাতে ব্যাংকঋণ পাওয়ার পরিমাণ বাড়াতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন
প্রভাবশালী খেলাপিরা। বড় কয়েক খেলাপির এ ধরনের প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছে
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।এ জন্য ব্যাংক
কোম্পানি আইন সংশোধনের জন্য মত চাওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। তবে
সম্মতি না দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলে ব্যাংকিং
খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। আইন সংশোধনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। সংশ্লিষ্ট
সূত্রে পাওয়া গেছে এ তথ্য। জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক
প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, একক ঋণসীমা
বাড়ানোর ব্যাপারে কয়েকটি কোম্পানি আবেদন করেছে।
সে পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক ও
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক হচ্ছে
ব্যাংকিং খাতের রেগুলেটরি বডি। এ ধরনের আইন পরিবর্তন তাদের মতামতসাপেক্ষে
হওয়া উচিত। যে কারণে মত চাওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। সর্বশেষ
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ ব্যাপারে মতামত পাঠানো হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক
প্রতিষ্ঠান বিভাগে। সেখানে বলা হয়, সরকারের গ্যারান্টি বা সিন্ডিকেট ঋণ
গ্রহণের মাধ্যমে একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি বড় অংকের ঋণ পাওয়ার
বিধান রয়েছে। এ জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা সংশোধনের প্রয়োজন নেই।
পাশাপাশি শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর যে সীমা আছে, তার চেয়ে বাড়ানোর
যৌক্তিকতা নেই। বর্তমান ব্যাংক কোম্পানি আইনে ব্যাংকগুলো তাদের মূলধনের
মোট ১৫ শতাংশের সমান অর্থ এককভাবে একজন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ
কোম্পানিকে ঋণ দিতে পারে। তবে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিশেষ করে সরকারের
কার্যাদেশের বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে
সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেয়ার বিধান রয়েছে। এ ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে
অবশ্যই বহুজাতিক বা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং সরকারের গ্যারান্টি ঋণ
গ্রহীতার পক্ষে থাকতে হবে। এ ছাড়া গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা মূলধনের
সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ শেয়ার ধারণ বা পুঁজিবাজারে ব্যাংকের
বিনিয়োগের বিধান রয়েছে। জানা গেছে, দেশে কয়েকটি বড় কোম্পানি বিদ্যুতের
প্রকল্পসহ বিশেষ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
এসব কোম্পানির পক্ষ থেকে ঋণ
নেয়ার বিদ্যমান সীমা বাড়ানোর জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে আবেদন
করা হয়েছে। সে প্রস্তাবের আলোকে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৬(ক) ও ২৬(খ) ধারা
সংশোধনের ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান
বিভাগ। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মত চেয়ে গত ৩ জানুয়ারি ব্যাংক ও
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ চিঠি দেয়। সেখানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কোনো
কোম্পানিকে ঋণ দেয়ার পাশাপাশি ওই কোম্পানির শেয়ার ধারণ করলে কোনো ধরনের
অসুবিধা হবে কিনা তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও
কোম্পানিকে বর্তমান ব্যাংকগুলোর দেয়া ঋণের সীমা বাড়ানোর কথাও বলা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের ব্যাপারে
মতামত সম্প্রতি পাঠানো হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে। সেখানে
বলা হয়, গ্রাহকের কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক আমানত গ্রহণ করে ব্যাংকগুলো। এরপর
লোকসান হলেও পূর্বনির্ধারিত হারেই সুদ পরিশোধ করতে হয়। ফলে ব্যাংকের
যেকোনো বিনিয়োগ চুক্তিভিত্তিক হওয়া উচিত। সেখানে আরও বলা হয়, ব্যাংকিং খাতে
একই সময়ে কোম্পানিকে ঋণ দেয়ার পাশাপাশি ওই কোম্পানি শেয়ার ধারণ করলে
ভবিষ্যতে কোম্পানির সব ধরনের ঝুঁকি ব্যাংকের ওপর বর্তাবে। কারণ ঋণ গ্রহীতা
যদি কোনো কারণে দেউলিয়া হয় তাহলে একদিকে ব্যাংক ঋণ আদায় অনিশ্চিত হবে;
পাশাপাশি অবশিষ্টাংশ মূলধন হিসেবে ব্যাংক ফেরত পাবে। এ ধরনের ঝুঁকি নেয়া
ব্যাংক গ্রাহকের স্বার্থানুকূল হবে না। আর কোনো কোম্পানির মালিকানায়
অংশগ্রহণ বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য নয়। ব্যাংকগুলো এ ধরনের কোম্পানির
ব্যবস্থাপনায় জড়িত হলে ব্যাংকিং সেবা পরিচালনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মতামতে
আরও বলা হয়,
পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব বিনিয়োগকারীদের ওপর
আসে। ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে অধিক হারে বিনিয়োগ করলে এর প্রভাবও
আমানতকারীদের ওপর আসবে, যা সমগ্র আর্থিক খাতে আস্থাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি
করবে। তাই পুঁজিবাজারে ব্যাংকের সামষ্টিক বিনিয়োগ সীমিত থাকা দরকার। এ ছাড়া
একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিকে বিদ্যমান ঋণ দেয়ার সীমা বাড়ানোর
বিপক্ষে মত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে বলা হয়, এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া
হলে ব্যাংকের সম্পদ ঋণ গ্রহীতার কাছে কেন্দ্রীভূত হবে। এতে ব্যাংকের ঝুঁকি
বাড়বে। কারণ বড় ঋণ গ্রহীতা কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাংকের ওপর বড়
ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়বে। একই যুক্তিতে কোনো একটি খাতে ব্যাংকের বিনিয়োগ
কেন্দ্রীভূত করা কাম্য নয়। এ ছাড়া কোনো প্রকল্পে বড় ঋণের প্রয়োজন হলে সে
ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক
প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এ ধরনের ঋণ দিতে পারে। আর জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্পে বড়
ঋণের সুযোগ করে দিতে বর্তমান ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৬খ(৩) ধারায় ব্যবস্থা
রয়েছে। ওই ধারা অনুযায়ী অগ্রাধিকার বিবেচনায় যে কোনো ঋণে সরকার গ্যারান্টি
দিলেই ঋণ পেতে পারে।

No comments:
Post a Comment